প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৪ ১২:৩৩ পিএম
আপডেট : ২৩ মে ২০২৪ ১২:৩৪ পিএম
চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনার খুন হয়েছেন। কলকাতার নিউটাউনের সঞ্জিভা গার্ডেন্সের ৫৬বিইউ ফ্ল্যাট থেকে তার রক্তমাখা জামা উদ্ধার করা গেলেও পাওয়া যায়নি মরদেহ। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, আনারের মরদেহ কয়েক খণ্ড করে ট্রলিব্যাগে ঢুকিয়ে গুম করা হয়েছে। টুকরাগুলো বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ায় তা উদ্ধার করতে সময় লাগছে।
স্বাধীনতার পর এই প্রথম বাংলাদেশি কোনো সংসদ সদস্য প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে খুন হলেন। এর আগে ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল ভারতের রাজধানী দিল্লির দেরাদুন শহরে রহস্যজনকভাবে মারা গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান।
এদিকে আনার খুনের নেপথ্যে সোনা চোরাচালান ও হুন্ডি ব্যবসার বিরোধসহ নানা কারণ খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। তারা বলছেন, মাত্র ২০ মিনিটের কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নিয়েছিল এক নারীসহ পাঁচজন। তাদের মধ্যে সৈয়দ আমানুল্লাহ সাঈদ, কথিত মডেল সেলে নিস্কি রহমান ওরফে সেলেস্থিয়া রহমান ও ফয়সাল নামে তিনজন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-এর হাতে আটক হয়েছে। কলকাতা পুলিশের হাতে আটক হয়েছে আরও দুজন। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পরিকল্পনাকারী হিসেবেও পাওয়া গেছে নানান বক্তব্য। কেউ বলছেন, ঢাকার গুলশানের একজন হীরা ব্যবসায়ী ও একজন ডেভেলপার ব্যবসায়ী এবং ঝিনাইদহের স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি এই খুনের পরিকল্পনা এবং নির্দেশদাতা। তাদের প্রায় সবার বাড়ি ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা এলাকায়। হত্যাকাণ্ডের নির্দেশাতাদের শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ। সূত্র বলছে, আনার খুনের চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয়েছে ঢাকার ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে। কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করতে এক নারী মডেলকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। মিশন বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশে ফিরেও হত্যাকারীরা বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে অবস্থান নিয়েছিল।
এদিকে এমপি আনারের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন বলেছেন, পরিকল্পিতভাবে এমপি আনারকে খুন করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ বলেছেন, খুনের মূল হোতা পুলিশের হেফাজতে আছেন।
এমপি আনার খুনের খবর পাওয়ার পর গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি অপহরণ ও হত্যা মামলা করেছেন তার ছোট মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মো. আহাদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বুধবার সন্ধ্যায় থানায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়েছে। এখন তদন্ত করে আসামিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। মামলা নম্বর ৩৪। তারিখ ২২ মে।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এইচএম আজিমুল হক জানান, এমপি আনার সংসদ ভবন এলাকায় থাকতেন। সেখান থেকে তিনি ভারতে গেছেন। তাই ডিবি পুলিশের প্রধান হারুন-অর-রশীদের পরামর্শে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা দায়ের করেন তার মেয়ে ডরিন।
গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান এমপি আনার। সেখানে অবস্থানকালে ১৪ মে থেকে তার সঙ্গে পরিবার বা অন্য কেউ যোগাযোগ করতে পারেনি। ২১ মে তিনি খুন হয়েছেন খবর পাওয়া গেলেও নিশ্চত হওয়া যায়নি। গতকাল কলকাতার পুলিশ জানায়, এমপি আনার নিউটাউন থানা এলাকার একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে খুন হয়েছেন। সেই ফ্ল্যাটে রক্তের দাগ মিলেছে। সেখান থেকে ফিঙ্গার প্রিন্টসহ ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বাংলাদেশি এক ব্যক্তির ফ্ল্যাটটিতে পুলিশ অস্থায়ী ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রেখেছে। বাড়িতে প্রবেশ ও বেরোনোর ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
কলকাতা সিআইডি পুলিশের আইজি অখিলেশ চতুর্বেদী বলেন, নিউটাউন এলাকার ফ্ল্যাটে রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। সেটা এমপির কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তার লাশ উদ্ধার হয়নি।
যেভাবে খুন হন আনার
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আনার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় মাত্র ২০ মিনিটে। নিউটাউনের ওই ফ্ল্যাটের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এমনটাই দাবি করেছেন গোয়েন্দারা। কিলিং মিশনের মূল নেতৃত্বে ছিলেন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌরসভার মেয়র মো. সহিদুজ্জামানের ভাই মো. আকতারুজ্জামান শাহীন। তার নেতৃত্বে বেয়াই সৈয়দ আমানুল্লাহ আসাদসহ পাজন হত্যাকাণ্ড অংশ নেয়। এই শাহীন আনারের বাল্যবন্ধু। হত্যার পর আনারের মরদেহ টুকরা করে শরীরের বিভিন্ন অংশ চারটি ট্রাভেল ট্রলিতে ঢুকিয়ে নেওয়া হয়। ডিবির হাতে আটক হওয়া আমানুল্লাসহ সম্পৃক্তদের স্বীকারোক্তি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
আনার নিখোঁজ হওয়ার পর তদন্তের দায়িত্ব পায় ডিবি পুলিশের ওয়ারী বিভাগ। ডিবির ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) সহিদুজ্জামান সাহেদের নেতৃত্বাধীন একটি টিম এ নিয়ে কাজ করে। তারা আনার হত্যায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা জানায়, গত ১২ মে এমপি আনার শেরেবাংলা নগর থানাধীন এমপি হোস্টেল থেকে রওনা হয়ে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার গেদে সীমান্ত হয়ে ভারতে যান। প্রবেশের পর এমপি আনারকে একটি সাদা মাইক্রোবাস নিয়ে রিসিভ করেন একজন বাংলাদেশি। ওই মাইক্রোবাসের চালক ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। সাদা মাইক্রোবাসে করে এমপি আনার কলকাতার নিউটাউনে পৌঁছান দুপুরে। ১২টা ৪১ মিনিটে সেখানে পৌঁছানোর পর একটি লাল মাইক্রোবাস নিউটাউনে আসে। সাদা গাড়ি থেকে এমপি আনার নেমে ১০ মিনিটের মতো রাস্তায় ছিলেন। পরে দুজন বাংলাদেশি এমপি আনারকে লাল মাইক্রোবাসে তোলেন। ওই মাইক্রোবাসে আগে থেকে বসা ছিলেন আকতারুজ্জামান শাহীনের বেয়াই সৈয়দ আমানুল্লাহ আসাদ। তারা এমপি আনারকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান আনারের পুরোনো বন্ধু ও জুয়েলারি ব্যবসায়ী গোপাল বিশ্বাসের বাড়িতে। বাড়িতে আগ থেকে আকতারুজ্জামান শাহীন, তার বান্ধবী সেলে নিস্কি রহমান ও আরও দুজন বাংলাদেশি অবস্থান করছিলেন।
পরদিন আনারকে নিউটাউন এলাকার একজন বাংলাদেশির ডুপ্লেক্স বাড়ির নিচতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। শাহীনের নির্দেশ অনুযায়ী আমানুল্লাহসহ পাঁচজন মিলে গত ১৩ মে যেকোনো সময় আনারকে ধারালো ছুরি দিয়ে হত্যা করে। হত্যার পর তারা মরদেহ কয়েক টুকরা করে চারটি ট্রাভেল ব্যাগে ভর্তি করে। পরে রক্তসহ বিভিন্ন আলামত পরিষ্কার করে। আমানের শরীরের অংশভর্তি একটি ট্রলিব্যাগ নিয়ে প্রথমে সৈয়দ আমানুল্লাহ কিলিংমিশনে অংশ নেওয়া জিহাদ ওই ফ্ল্যাট থেকে বের হয়। নিউটাউনে এসে পাবলিক টয়লেটের কাছে পৌঁছে প্রথম ট্রলিটি সিয়াম নামে আরেক বাংলাদেশি নাগরিকের কাছে দেওয়া হয়। সিয়াম সেই ট্রলি নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে গেছে। অপর তিনটি ট্রলি নিয়ে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে ওই ফ্ল্যাট থেকে বের হয়।
সৈয়দ আমানুল্লাহ সাইদের বর্ণনা অনুযায়ী তাদের কেউ ১৪ মে কেউ ১৫ মে বাসা থেকে বের হয়।
হত্যার পর রক্তের গন্ধ দূর করতে ঘটনাস্থলে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হয়। তবু গন্ধ থেকে যায়।
ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মরদেহ ভর্তি ট্রলিব্যাগগুলো কোথায় নেওয়া হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কলকাতার পুলিশ ও গোয়েন্দারাও তার সন্ধান পায়নি। তবে যে বাড়িতে এমপি আনারকে হত্যা করা হয়েছে সেই বাড়িতে রক্তের নমুনা মিলেছে। এ রক্তের নমুনার সূত্র ধরে তারা মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা করছে। কিলিং মিশন বাস্তবায়নের পর লাশ গুমে অংশ নেওয়া জাহিদ ওরফে জিহাদ ও সিয়ামসহ তিনজন এখনও ভারতে রয়েছে। তাদের ধরতে পারলে মরদেহের অংশবিশেষগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে মূল পরিকল্পনাকারী, আকতারুজ্জামান শাহীন ১৫ মে বাংলাদেশ আসেন। এরপর উড়োজাহাজ যোগে কাঠমান্ডু, সেখান থেকে দিল্লি হয়ে দুবাই এবং দুবাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরবর্তী সময়ে আর তার বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করতে আকতারুজ্জামান শাহীন ও তার বান্ধবী সেলে নিস্কি রহমান মে মাসের শুরুর দিকে ভারতে যান। তারা সেখান থেকে ১০ মে বাংলাদেশে আসেন। দেশে ফিরে শাহীনের বেয়াই সৈয়দ আমানুল্লাহ সাঈদকে সঙ্গে নেন। ভারতে গিয়ে ভাড়াটে হিসেবে ভারতে অবস্থান করা দুই বাংলাদেশি সন্ত্রাসীকে সঙ্গে নেন। শাহীন তার বান্ধবী ও কথিত মডেল সেলে নিস্কি রহমানকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেন।
দাগী অপরাধী আমানুল্লাহ
২০ মিনিটের কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেওয়া আমানুল্লাহ একাধিক হত্যা মামলার আসামি। একটি হত্যা মামলায় সে সাত বছর কারাগারে ছিলেন। আরেকটি হত্যা মামলায় ১৩ বছর জেল খাটে। আমানুল্লাহ সাঈদ বর্তমানে ডিবি হেফাজতে রয়েছে।
পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে মোবাইল লোকেশন
এমপি আনারকে হত্যার পর তার মোবাইল নিজেদের কবজায় নিয়ে নেয় খুনিরা। তারা ওইসব মোবাইল থেকে বিভিন্নজনকে মেসেজ পাঠাতে তাকে। একটি মেসেজে লেখা ছিল এমপি আনার দিল্লিতে অবস্থান করছেন, তাকে কেউ যেন বিরক্ত না করে। এ ছাড়া এমপি আনারের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ আছে এমন কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার কাছেও মেসেজ দেওয়া হয় তার মোবাইলে। মূলত পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে হত্যাকারীরা এসব মেসেজ দেয়। একটি মোবাইল পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঝাড়খণ্ড রাজ্যের মোজাফ্ফরাবাদ এবং অপরটি ঝিনাইদহ সীমান্তে।
খুনের নেপথ্যে যা রয়েছে
আনার দীর্ঘদিন থেকে স্বর্ণ চোরাচালান ও হুন্ডি কারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট রেড নোটিস জারি করে আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ২০০৭-০৮ সালের দিকে তিনি স্বর্ণ পাচারকারী চক্রের হাজার কোটি আত্মসাৎ করে দেন। এ নিয়ে বাংলাদেশি ও ভারতীয় চোরাকারবারি চক্রের মধ্যে চরম ক্ষোভ ছিল। সেই প্রতিশোধ নিতে তাকে টার্গেট করা হয়েছে। এ ছাড়া ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত স্বর্ণ এবং মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট। এই রুটের পাচারকারীদের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন নিতেন এমপি আনার। তাকে কমিশন না দিলে স্বর্ণসহ চোরাচালান পণ্য ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন। এ নিয়ে ঢাকার প্রভাবশালী এক পাচারকারী গডফাদারের সঙ্গে তার বিরোধ দেখা দেয়, যার ফলশ্রুতিতে তাকে সরিয়ে দেওয়ার নিখুঁত পরিকল্পনা করে ওই চক্র। আবার কেউ কেউ বলছেন, ২০০৭ সালের দর্শনা এলাকার সিএ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী সাইফুল হত্যা মামলার প্রতিশোধ নিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
সন্দেহে গোপাল বিশ্বাস
এমপি আনার হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে তার বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের নামও এসেছে। গোপাল বিশ্বাস একসময় হতদরিদ্র ছিলেন। আনারের টাকায় তিনি জুয়েলারি ব্যবসা শুরু করেন। জুয়েলারি ব্যবসায় তার পাঁচতলা বাড়িসহ ব্যাপক উন্নতি হয়। ওই অর্থের সবই আনারের ছিল বলে ঝিনাইদহের স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
আমি এর শেষ দেখতে চাই : ডরিন
‘আমি আমার বাবার হত্যার বিচার চাই। কারা আমার বাবাকে হত্যা করেছে, কেন করেছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই। আমি এর শেষ দেখতে চাই, আমি বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু দেখে যেতে চাই।’ বাবাকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কথাগুলো বলেন আনারের ছোট মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। বুধবার ভারতে বাবার মৃত্যুর খবর শুনে ডিবি কার্যালয়ে ছুটে যান ডরিন। সেখান থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের ডরিন বলেন, ইতোমধ্যে জেনেছি, আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। এটা শুনেই আমি ডিবিপ্রধানের কাছে এসেছি। তারা ইতোমধ্যে তিনজনকে ধরেছেন। আমি মামলা করব। ডিএমপি কমিশনার, ডিবিপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সবাই আমাকে আশ্বস্ত করেছেন। ডিবি আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি দেখছে।
ডরিন বলেন, আমার কোনো ভাই নেই। আমরা দুই বোন। বড় বোন ডাক্তার। আমি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে এলএলবি ফাইনাল পড়ছি।
গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়ে ডরিন বলেন, আমি আপনাদের কাছে সহযোগিতা চাই। আপনারা নিউজ করেন, অনুসন্ধান করেন। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আলোড়ন তোলেন। যাতে আমার বাবার হত্যার বিচার পাই।
কাঁদতে কাঁদতে ডরিন বলেন, আজকে আমি এতিম হয়ে গেছি। এখনও আমার পড়াশোনা শেষ হয়নি। আমি মাঝপথে। যার বাপ থাকে না তার কেউ থাকে না। তারা এতিম হয়ে যায়। যতই কাছের আত্মীয়, আপন মানুষ যেই থাকুক। বাবা বাবা-ই। বাবার মতো কেউ হয় না।
আপনি কাউকে সন্দেহ করছেন কি না? তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এর মধ্যে একজনের নাম আনোয়ারুল, আরেকজনের নাম ফয়সাল। আপনি তাদের চেনেন কি নাÑ এ বিষয়ে ডরিন বলেন, ‘আমি চিনি না, কিন্তু চিনতে চাই। আমি হারুন আঙ্কেলকে বলেছি, আপনি আইডেনটিফাই করুন, কেন এরকমটি হলো। আমি নিজেও আইন পড়ছি, আইনের কিছু বিষয় আমি জানি। আপনি দেখুন, আমাকে চেনান তারা কারা। আমি তাদের চিনতে চাই, আমি তাদের প্রকাশ্যে মৃত্যু দেখতে চাই। আমাকে এভাবে এতিম করে দিল!’
পরিকল্পিত হত্যার তথ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
গতকাল দুপুরে এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, আনোয়ারুল আজিম আনারকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। খুনের ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। নেপথ্যের কারণ পরে জানাব। তিনি বলেন, আমরা সুনিশ্চিত তাকে হত্যা করা হয়েছে। যতদূর খবর পেয়েছি, এ ঘটনায় ভারতের কেউ জড়িত না। অনেক তথ্য আছে, তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই বলা যাচ্ছে না। খুনের মোটিভ জানার কাজ চলছে।
আইজিপি বললেন যৌথ তদন্ত চলছে
আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন গতকাল সকালে বলেন, ভারতে গিয়ে নিখোঁজ এমপি আনারের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়েছি গণমাধ্যম সূত্রে। তবে ইন্ডিয়ান বা কলকাতা পুলিশ আমাদের এখনও কিছু নিশ্চিত করেনি। তিনি জীবিত নাকি মৃত তা এখনও অফিসিয়ালি নিশ্চিত নই। আমরা যৌথভাবে তদন্ত কাজ করছি।
গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে ডিবি
গতকাল ডিবি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংয়ে ডিএমপির ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন-আর-রশীদ বলেন, এমপি আনার বাংলাদেশের কিছু অপরাধীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এটি নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনা পারিবারিক, আর্থিক নাকি এলাকার কোনো দুর্বৃত্তকে দমন করার জন্য হয়েছে, তা আমরা তদন্ত করে দেখছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা নিবিড়ভাবে ভারতীয় পুলিশের সঙ্গে কাজ করছি।
তিনি জানান, কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া কয়েজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আটক ব্যক্তিদের নাম বলা হচ্ছে না। বাকিদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
বাড়ির সামনে হাজারো নেতাকর্মীর ভিড়
ঝিনাইদহ প্রতিবেদক জানান, বুধবার সকালে নিহত সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিমের বাড়ি ও তার নির্বাচনী এলাকায় এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার নেতাকর্মী ভিড় করতে থাকে। তার নিজ বাসভবন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের নিশ্চিন্তপুর এলাকার ভূষণ রোড বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। দলীয় কার্যালয় ও বাড়ির সামনে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এমপি আনার খুন হওয়ার খবর পেয়ে তার বাড়িতে যান কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান, কালীগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ আবু আজিফসহ প্রশাসনের নানা স্তরের কর্মকর্তারা। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে যান। ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু জানান, এই নৃশংস হত্যায় তাদের দল ও দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। খুনিদের চিহ্নিত ও দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে।
প্রসঙ্গত, আনোয়ারুল আজিম আনার ঝিনাইদহ-৪ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য। তিনি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচনে টানা তিনবার আওয়াামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্থানীয়রা জানায়, এমপি হিসেবে বিভিন্ন সেবামূলক কাজের জন্য তার বেশ সুনাম রয়েছে।