প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৪ ১৮:৪৭ পিএম
আপডেট : ১৭ মে ২০২৪ ১৯:০৯ পিএম
জঙ্গি সংগঠনে অস্ত্র সরবরাহকারী আব্দুর রহিমকে গ্রেপ্তার করেছে সিটিটিসি। প্রবা ফটো
শুরুটা হয়েছিল পাহাড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। ২০১৯ সাল, বান্দরবানের রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় চলে ‘রহিম ডাকাত’ গ্রুপের অপরাধ কর্মকাণ্ড। নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুর রহিম। একপর্যায়ে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। শুরু করেন নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর জন্য অস্ত্র সরবরাহ।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় অভিযান চালিয়ে বুধবার (১৫ মে) আব্দুর রহিমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। এ সময় তার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরক জব্দ করা হয়।
শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সিটিটিসি প্রধান মো. আসাদুজ্জামান।
জঙ্গি সংগঠনের জন্য পাহাড়ে লুকানো অস্ত্র-গোলাবারুদ
সিটিটিসির অভিযানে আব্দুর রহিমের কাছ থেকে একটি ৭.৬৫ বিদেশি পিস্তল, দেশীয় চারটি বন্দুক, বারুদভর্তি তিনটি বন্দুক, একটি ওয়ান শুটার বন্দুক, একটি ধারালো অস্ত্র, গুলি ১৬টি, কার্তুজ ১১টি, শটগানের খোসা ২৪টি, বাইনোকুলার দুটি, গ্যাস মাস্ক একটি, চার্জার লাইট একটি, রিচার্জেবল ব্যাটারি একটি, ওয়াকিটকি ও চার্জার দুটি, এসিড সৃদশ্য তরল পদার্থ ছয় লিটার, ইলেকট্রিক তার ৬০ ফুট, মোবাইল সিগন্যাল বুস্টার একটি, তারসহ এন্টেনা একটি, হাতুড়ি একটি, করাত একটি, হেক্স ব্লেড একটি, বাল্ব চারটি, ইলেকট্রিক হোল্ডার চারটি, নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম দুটি ও একটি ত্রিপল জব্দ করা হয়।
সিটিটিসি জানায়, এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ছাগলখাইয়্যা এলাকায় পাহাড়ের ঢালে ঘন জঙ্গলের ভেতর মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন আব্দুর রহিম। এগুলো জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়ার কাছে সরবরাহ করার জন্য মজুদ করেন তিনি। গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করা হয়।
সিটিটিসিপ্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) ডেরায় জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়ার প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের সন্ধান পেয়ে যৌথ বাহিনী যখন অভিযান শুরু করে, তখন থেকে এসব নিষিদ্ধ সংগঠনকে একাধিকবার অস্ত্র সরবরাহ করেন আব্দুর রহিম। পরে আরও অস্ত্র সরবরাহের কথা ছিল। সেগুলো মাটির নিচে রেখে সমতলে চলে আসেন আব্দুর রহিম। কেএনএফের ডেরায় শারকিয়ার সদস্যদের ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এতে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক প্রয়োজন হতো। সেই রাসায়নিকও সরবরাহের কথা ছিল আব্দুর রহিমের। এ ছাড়া তিনি জঙ্গি সংগঠনে সরবরাহের জন্য মোবাইল নেটওয়ার্ক বুস্টার সংগ্রহ করেছিলেন।’
আত্মগোপনে ছিলেন রহিম ও সহযোগীরা
সিটিটিসি জানায়, শারকিয়া যখন পাহাড়ে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প শুরু করে, তখন থেকে আব্দুর রহিম অস্ত্র সরবরাহের কাজ করছিলেন। তার সঙ্গে এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া শারকিয়ার অস্ত্র সরবরাহকারী কবির আহাম্মদের যোগাযোগ ছিল। কবির সংগঠনের জন্য কাজ করতে রহিমকে প্রস্তাব দেয়। রহিম তার প্রস্তাবে রাজি হন এবং অস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি সংগঠনের সদস্য সংগ্রহেও তিনি কাজ করেন।
শারকিয়ার মাস্টারমাইন্ড ও সংগঠনের প্রধান শামিন মাহফুজকে গত বছরের ২৩ জুন গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে শারকিয়ার প্রশিক্ষণ, অস্ত্রের উৎস, অর্থায়ন সম্পর্কে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর আগে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মো. ইয়াছিন এবং বান্দরবান থেকে অস্ত্র সরবরাহকারী কবির আহাম্মদকে ৮ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয়। শামিন মাহফুজ ও অস্ত্র সরবরাহকারী কবির আহাম্মদ গ্রেপ্তার হলে এবং পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হলে আব্দুর রহিম ও তার সহযোগীরা আত্মগোপনে চলে যান।
সিটিটিসিপ্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, ‘কীভাবে তিনি (আব্দুর রহিম) এসব অস্ত্র সংগ্রহ করেছেন, তার সঙ্গে কারা জড়িত রয়েছে এবং কোন কোন পর্যায় থেকে তিনি সহযোগিতা পেয়েছেন– এসব জানার জন্য আব্দুর রহিমকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। তার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে।’
শারকিয়ার ফের সংগঠিত হওয়ার তথ্য নেই
মার্চে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএসের প্রধান হারিজ ফারুকি ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তারা বলছে– তিনি (হারিজ ফারুকি) বাংলাদেশে ছিলেন। তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রয়েছে কি না রহিমের? এমন প্রশ্নের জবাবে সিটিটিসিপ্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের কোথাও আন্তর্জাতিক জঙ্গি অবস্থান করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের কারও অবস্থানের প্রশ্নই আসে না।’
বর্তমানে শারকিয়ার নেতৃত্বে কে– জানতে চাইলে সিটিটিসিপ্রধান বলেন, ‘তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ নেই। এই সংগঠনের সব শীর্ষ নেতাকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। নতুন করে সংগঠিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।’
তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়াদের তালিকা পেয়েছি। তালিকার প্রায় সবাই গ্রেপ্তার হয়েছে। যারা প্রশিক্ষণের দাওয়াত পেয়েছে তাদেরও নাম পেয়েছি। তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’