প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৯:০৬ পিএম
সিলেটের ওসমানী নগরের ভেরুখলা গ্রামের আনহার মিয়া। স্থানীয় এই ঠিকাদার এখন ওসমানী নগরের মূর্তিমান আতঙ্ক। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। ভেরুখলা গ্রামের সাধারণ মানুষকে তিনি ফাঁসিয়ে দিচ্ছেন অবৈধ অস্ত্র দিয়ে, থানা পুলিশের যোগসাজশে গ্রামে একপক্ষের সঙ্গে অন্যপক্ষের বিরোধ সৃষ্টি করে চালাচ্ছেন কমিশন বাণিজ্য। বিভিন্নভাবে অন্যায়-উৎপীড়ন চালিয়ে, অন্যের জায়গাজমি দখল করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন ওসমানী নগরের গোয়ালাবাজার ইউনিয়নে। তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না পুলিশ। অথচ আনহারের বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালালেই অনেক অবৈধ অস্ত্র পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
ভুক্তভোগীরা জানান, অস্ত্র দিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁসানো হলেও পুলিশ তদন্ত করে দেখছে না সেগুলো কোথা থেকে আসছে। তারা বলেছেন, আনহারের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ ৭-৮টি মামলা এবং বেশ কিছু জিডি রয়েছে। কিন্তু তিনি থানা আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকায় পুলিশ কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
সম্প্রতি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভেরুখলা গ্রামের সুদুমিয়ার ছেলে শান্তকে রাস্তায় ফেলে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আনহার মিয়া স্থানীয় নেতাদের নিয়ে শান্তর পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, আনহার মিয়া ঠিকাদারির সুবাদে বেশ কিছু শ্রমিককে দিয়ে নিজের একটি বাহিনী করেছেন। কারও সঙ্গে কিছু হলেই বা কোনো বিষয় নিয়ে তর্ক হলেই সেই বাহিনী দিয়ে বাড়িতে হামলা ভাঙচুর চালায় আনহার গং।
স্থানীয় ভুক্তভোগী আব্দুল ছালিক অভিযোগ করে বলেন, আমি একজন প্রবাসী। আমাদের গ্রামের মসজিদ তথা ভেরুখলা জামে মসজিদ তৈরির কাজের জন্য আমি গ্রামে গিয়েছিলাম। আমার কাছ থেকে মসজিদ তৈরির জন্য আনহার মিয়া মোটা অঙ্কের টাকা নিলেও কাজটি করেননি। বরং মসজিদ কবে তৈরি করা হবে- এই বিষয়ে গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর জানতে চাওয়ায় এলাকার মুরব্বিদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। একপর্যায়ে আমার ওপর আনহার ও তার ভাইয়েরা হামলাও চালিয়েছে।
অভিযোগ, আরেক ভুক্তভোগী মৃত ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে ফজলু মিয়াকে আনহার মিয়া গং আনুমানিক ৫-৬ বছর পূর্বে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে আক্রমণ চালায়। ফজলু মিয়া প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা চালালে আনহার মিয়া ধারালো চাপাতি এবং দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ফজলু মিয়ার বসতঘরে আক্রমণ চালায়। এ ঘটনার একপর্যায়ে ফজলু মিয়া নিজের ঘরে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। কিন্তু স্থানীয় নেতাদের চাপে ও বাধার মুখে পোস্টমর্টেম ছাড়াই তাকে কবর দিতে হয়েছে। ফজলু মিয়ার পরিবার যাতে থানা ও কোর্টে গিয়ে মামলা করতে না পারে, ফজলু মিয়ার মৃত্যুর আসল ঘটনা যাতে চাপা পড়ে যায়- সে উদ্দেশ্যে ফজলু মিয়ার ছোট ভাই উস্তার মিয়াকে মিথ্যা অস্ত্র মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেয় আনহার মিয়া।
ওই এলাকার মুরব্বি প্রবীণ আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আনহার মিয়া তার চাচাতো ভাইদের দিয়ে হুমকি দিয়েছে, যাতে আমার ফসলি জমিতে আমি হালচাষ না করি। আমি প্রতিবাদ জানালে, তিনবার আমার ওপর আনহার মিয়া তার বাহিনী দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় থানায় জিডি করলে আনহার মিয়া বলেন, ‘এইসব করে লাভ নেই। থানা আর পুলিশ আমার কেনা, আমার কথায় ওঠ-বস করে পুলিশ। আমি এখনও সুষ্ঠু বিচার পাইনি।’
ভেরুখলা জামে মসজিদের ক্যাশ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে আনহারের বিরুদ্ধে। আব্দুল হক নামে এক ব্যক্তি জানান, স্থানীয়রা আনহারকে দায়িত্ব না দিয়ে তাকে মসজিদের ক্যাশের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এ কারণে ঢাকা ব্যাংকের গোয়ালাবাজার শাখার সামনে থেকে ব্যাংকে প্রবেশ করার সময় আনহার মিয়া ও তার ভাই খালিছ মিয়া ৬০ হাজার ৩৪৫ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায়।
স্থানীয় দোকান থেকে নিত্যপণ্য কিনে মূল্য পরিশোধ না করার ও নারীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগও রয়েছে আনহারের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী নারী রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘আমাকে আনহার মিয়া অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় আমার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট করে আনহার মিয়া ও তার বাহিনী। এ নিয়ে স্থানীয়দের কাছে বিচার দিলে ভয়ে সবাই এড়িয়ে যাচ্ছে। এই গ্রামের সবাই আনহারের অপরাধের সুষ্ঠু বিচার চায়।’
মিথ্যা মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করাও আনহার মিয়ার অত্যাচারের হাতিয়ার। সম্প্রতি তার মদদে ভেরুখলার রফু মিয়া একটি মামলা করেছেন। এ মামলায় আনহারের সঙ্গে বিরোধ বা মামলা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। গত ২৪ জানুয়ারি সিলেটের অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দণ্ডবিধি ৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৩২৪/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৫০৬ ধারায় মামলাটি করেন মো. রফু মিয়া। এতে আসামি করা হয় একই গ্রামের ইসকন্দর আলীর ছেলে সুমন মিয়া, আব্দুল মন্নানের ছেলে মিন্টু, মৃত মিয়াধন উল্ল্যার ছেলে আব্দুন নুর ও আব্দুল হান্নানকে।
মামলাটি সম্পর্কে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, সুমন মিয়ার কেনা জমিতে গত এক বছর ধরে গেট নির্মাণে বাধা দিয়ে আসছেন আনহার। ঘটনার দিন বুধবার ওসমানী নগর থানার ওসি রাশেদুল হক একজন দারোগাসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। এ সময় আনহার উপস্থিত না থেকে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি অর্ধশত সন্ত্রাসীকে ঘটনাস্থলে পাঠান। ওসি ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে আনহার ও সুমন মিয়াকে ওই দিন বিকালে থানায় উপস্থিত থাকার কথা জানিয়ে বিদায় নিতে যান। এসময় বিল্লাল গালিগালাজ করে আব্দুল নূরকে। আব্দুল নূর একজন ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী প্রবীণ মুরব্বি। যার বয়স আশির কাছাকাছি। এক পর্যায়ে আব্দুল নূরের হাতের লাঠি জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বিল্লাল। ধ্বস্তাধ্বস্তির একপর্যায়ে বিল্লাল সামান্য আঘাত পায়। এর প্রত্যক্ষদর্শী থানার ওসি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কিন্তু ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য আনহার মিয়া তার চাচাত ভাই রফু মিয়াকে দিয়ে চিফ জুডিসিয়াল আদালতে মিথ্যা মামলা করে প্রবাসী সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে (মামলা নং ২৪)।
এ বিষয়ে মামলার আরেক আসামি মিন্টু মিয়া বলেন, আনহার প্রবাসী সুমন মিয়ার জায়গা দখল করার জন্য মূলত এমন একটা ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। বৈধ কোনো কাগজপত্র না থাকার পরও আনহার সুমন মিয়ার কবরস্থানে গেট করতে দেয়নি। এ ছাড়াও গত ২০১২ সালে জুনে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ছিনতাইয়ের নাটক সাজিয়ে মামলা করেছিলেন আনহার। কিন্তু সেই মামলা কোর্টে টেকেনি।
হাজী ইসকন্দর আলীর ছেলে সুমন মিয়া জানান, তিনি একজন প্রবাসী। তিনি বলেন, আমাদের কবরস্থানের জায়গা বাড়ানোর জন্য আমি আমাদের গ্রামের উস্তার আলীর কাছ থেকে সেটির সামনের একটু জায়গার কিনেছি। যেখানে আমার বাবার কবর রয়েছে। ওই জায়গাতে আমি বাউন্ডারি দিতে গেলে আনহার মিয়া এসে বাধা দেন এবং বলেন ওই জায়গার মালিক নাকি তার চাচা। তাদের হামলায় আমার বাউন্ডারির ঠিকাদার দুলাল মিয়া গুরুতর আহত হয়। এ কারণে আমার বাউন্ডারির কাজ এখনও সম্পন্ন হয়নি। অথচ রফু মিয়াকে দিয়ে উল্টো আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে আনহার।
অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের ৩০ আগস্ট ওসমানীনগরের ভেরুখলা গ্রামের আব্দুল হান্নান আনহার মিয়ার বাড়ির সামনে থেকে যাওয়ার সময় তাকে মারপিট করা হয়। এ ঘটনায় পরের দিন ১ সেপ্টেম্বর ওসমানীনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন (জিডি) ভুক্তভোগী হান্নান। যার নম্বর-৪০। জিডির বিবরণ থেকে জানা গেছে, মুরাদপুর মেজার জে.এল নং-২০, খতিয়ান নং-এসএ ৭২, বিএস-১৮৪, দাগ নং-৫৪৬ এ ০ দশমিক ৫ শতক জমিকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী আব্দুল হান্নানের সঙ্গে আনহারের বিরোধ চলছে। বর্তমানে এ সংক্রান্ত একটি মামলা আদালতে চলমান রয়েছে।
ভূমিদস্যুতার অভিযোগও রয়েছে আনহার মিয়ার বিরুদ্ধে। গত বছরের ২৬ এপ্রিল ভেরুখলার উস্তার আলির ৬ দশমিক ৭৮ শতক জমি কেনেন একই গ্রামের সুমন মিয়া। এ ছাড়া ওই বছরের ১০ আগস্ট একই গ্রামের সুফি মিয়ার ৩ দশমিক ৩৯ শতক জমি কেনেন তিনি। এই ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ জমি নামজারি করে ভোগ দখলে আছেন সুমন। কিন্তু ওই জমিতে চোখ পড়েছে ভূমিদস্যু আনহারের। জমিতে বাউন্ডারি গেট নির্মাণ করতে গেলে আনহার বাধা দেন। বাড়িতে এসে মারধরও করেন। এ ঘটনায় ওসমানীনগর থানায় অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
ভুক্তভোগী সুমন জানান, তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ভয় শঙ্কায় দিন কাটছে তার। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে কয়েকবার স্থানীয়ভাবে বিচার সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সুরাহা না হওয়ায় আইনের আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
অভিযোগ, ভূমিদস্যু আনহার হামলা ভাঙচুর লুটপাট জমি দখল করলেও প্রভাব খাটিয়ে মামলার বাইরে থাকছেন। তার অপরাধের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ কিংবা মামলা করলেও পরে অভিযোগপত্রে আর নাম থাকে না আনহার মিয়ার।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আনহার মিয়া জানান, তার সঙ্গে কারও শত্রুতা নেই। তার বিরুদ্ধে মামলা আছে কি নাÑ তা খুঁজে দেখার পরামর্শ দেন তিনি। আনহারের অভিযোগ সম্পর্কে ওসমানী নগর থানার ওসি রাশেদুল হককে একাধিকবার কল করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে থানার পরিদর্শককে (তদন্ত) পাওয়া গেলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।