এম আর মাসফি
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৩ ১০:০৪ এএম
আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৩ ১২:০৮ পিএম
নদ-নদী, হাওর, বিল, দিঘি- কিছুই বাদ পড়ছে না। নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নির্বিচারে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে দেশের জলাশয়গুলো। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রকৃতি ও পরিবেশে। বর্ষার সময় অতিরিক্ত পানি ধারণ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে যেসব জলাভূমি, দিন দিন সেগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় বাড়ছে বন্যা, ভাঙছে জনপদ।
সম্প্রতি এমন বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে জলাশয় ভরাট করে। জলাধার ভরাট রোধে আইনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রভাবশালীদের চাপে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এর ফলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়েছে। প্রকল্প যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, পরিবেশ বাঁচানো তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
অন্যদিকে প্রকল্প অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের যুক্তি দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষা করেই সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা রয়েছে বলে তাদের দাবি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিককালে এমন বেশকিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যেগুলো বিশাল বিশাল জলাশয় ভরাট করে বাস্তবায়ন করতে হবে। এগুলোর কয়েকটি অনুমোদনের অপেক্ষায়, কিছু অনুমোদন পেয়েই গেছে। কিছু প্রকল্প রয়েছে বাস্তবায়নের পর্যায়ে।
জলাশয় ভরাট করে নিত্যনতুন প্রকল্প নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকার আইন ভাঙে বলেই জলাশয় ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য বিষয় হলো, জলাশয়ের গুরুত্ব বাংলাদেশের মতো দেশে সরকার উপেক্ষা করে ব্যক্তির স্বার্থে। আসলে পরিবেশ রক্ষা নিয়ে সরকারি বক্তব্য অন্তঃসারশূন্য। এই অবস্থা না বদলালে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর জনদুর্ভোগই কেবল বাড়বে।’
ডাকাতিয়ার পাড়ে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ
চাঁদপুর শহরের পাশে ডাকাতিয়া নদীর তীরে মহাদেব গাছতলা মৌজায় ৩০ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হচ্ছে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। যেখানে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার প্রায় অর্ধেক জায়গা বর্ষা মৌসুমে প্লাবিত থাকে। পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, চাঁদপুরে নদীর তীরে মেডিকেল কলেজ করা হচ্ছে। এটা অন্য কোনো জায়গাতেও করা যেত। এই জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে ১২ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত বালু ভরাট করতে হবে। একই সঙ্গে নদী রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ডাকাতিয়া নদীর গতিপথ পরিবর্তন হলে বা পানির স্রোত বেশি হলে সেখানে ভাঙন দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত পানির চাপে অনেক সময় মজবুত বাঁধও কাজে আসে না।
সম্প্রতি এই প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। তবে একনেকে নদীর জায়গা ভরাট না করে পাশের স্থলভূমিতে মেডিকেল কলেজটি করার জন্য বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জলাশয় ভরাট করে প্রকল্প নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান (এ বক্তব্য নেওয়ার সময় তিনি চেয়ারম্যান পদে দায়িত্বরত ছিলেন। গত বুধবার সরকার তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে) মনজুর আহমেদ চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জলাশয় ভরাট করলে তো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বেই। আমরা চাঁদপুরে নদী রক্ষা করেই মেডিকেল কলেজ করার জন্য বলেছি। কখনোই জলাশয় বা নদী ভরাট করে প্রকল্প নেওয়া কাম্য নয়।’
যশোরের ইপিজেড প্রকল্প
যশোরের অভয়নগরে বিলের মধ্যে ১২ থেকে ১৫ মিটার গভীর ৫৬৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠছে যশোর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)। এরই মধ্যে বিল ভরাট করার অনুমতিও দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিকল্পনা কমিশন বিল ভরাট করা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বলছে সমস্যা হবে না। পানি অন্যত্র স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, বিল ভরাট করলে পরিবেশের ওপর তার প্রভাব পড়বেই।
বিল ভরাট করে ইপিজেড করার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল কবীর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর এলাকা দেখে গেছে। তারা বলেছে, এখানে ইপিজেড করলে কোনো সমস্যা হবে না। পানি স্থানান্তরের জন্য আলাদা খাল তৈরি করা হবে। ১২ থেকে ১৫ মিটার গভীর জায়গা ভরাটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এতটা গভীর না। চারপাশে পাড় বেঁধে জায়গাটা গভীর করে রাখা হয়েছে।’
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিলে আমাদের আর কী বলার আছে। আর প্রস্তাবনাও দেওয়া হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ একটি পর্যায় থেকে। তারপরও কমিশন সব বিষয়ে ক্লিয়ারেন্স নিয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যশোর ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে ২ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আসবে এবং বছরে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হবে। প্রকল্পে ৪৩৮টি শিল্প প্লট তৈরি করা হবে। এর জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা।
ইপিজেড করতে গিয়ে জলাশয় ভরাটের বিষয়ে জানতে চাইলে যশোরের ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটির উপদেষ্টা ও কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, উন্নয়নের নামে যেসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেক্ষেত্রে ধানি জমির কী হবে? ওখানে পানি নিষ্কাশনের কী হবে? সেখানে যে বর্জ্য হবে সেগুলো কোথায় যাবে? এসব বিষয় চিন্তা করা হয় না। প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে জনমতও যাচাই করা হয় না। সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিক না হলে ভৈরব দূষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে স্থানীয় জনগণ সমস্যায় পড়বে। আর পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়া তো কোনো কঠিন বিষয় নয়।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জলাশয় ভরাট করার মারাত্মক পরিণতি আছে। এতে যেমন পরিবেশের বিপর্যয় হবে, তেমনি জনজীবনও ঝুঁকিতে পড়বে। অর্থনীতিরও হুমকি রয়েছে। এ কারণেই আইন করা হয়েছে। কিন্তু আইনের বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যারা এগুলো করছে, তারা হয়তো পাওয়ারফুল। তাই পরিবেশ অধিদপ্তরও কিছু করতে পারছে না।’
হবিগঞ্জে ১২-১৫ ফুট গভীর জমিতে মেডিকেল কলেজ প্রকল্প
হবিগঞ্জের যে জায়গায় শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং নার্সিং কলেজ তৈরির প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি রাস্তার লেভেল থেকে ১২-১৫ ফুট নিচু। যার বড় অংশই খাল-বিল বা জলাধার। জায়গাটি সারা বছরই জলমগ্ন থাকে। তাই এ জায়গা বাদ দিয়ে অন্যত্র মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য বলেছে পরিকল্পনা কমিশন। তাছাড়া প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটির প্রস্তাবের ওপর পর্যালোচনা সভা হয়েছে। সভায় জলাশয় ভরাট করে পরিবেশ অধিদপ্তর কীভাবে সেখানে প্রকল্প নেওয়ার ছাড়পত্র দিল তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ওপর থেকে চাপ দিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়। নিজেদের চাকরির কথা চিন্তা করে তারা তেমন বাধা দেন না। ফলে পরিবেশের ক্ষতি করে এভাবে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকায় পরিকল্পনা কমিশনও এসব প্রকল্প নিয়ে খুব একটা প্রশ্ন তুলতে পারছে না।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ত্রুটি থাকলে পরিকল্পনা কমিশন সেটা বিশেষভাবে দেখতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘জলাশয় ভরাট করে প্রকল্প নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। পরিকল্পনা কমিশনের এ বিষয়ে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়া দরকার। পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিয়েছে বলেই অনুমোদন দিতে হবে তার কোনো মানে নেই।’
নেত্রকোণায় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়
নেত্রকোণায় ৫০০ একর বিল ভরাট করে শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হচ্ছে। রাতারাতি বালু ফেলে জায়গা ভরাট করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এতদিন এই বিল থেকে বহু মানুষের মাছের জোগান হতো। বিলের শাপলা-শালুক থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক নানা সম্পদ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত অনেকেই। সেই সঙ্গে ধান উত্পাদন হতো মাঠজুড়ে। প্রকল্পের জেরে এখন ধান, মাছ থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য সবই গেছে। বিল ভরাটের নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে দেখা দিতে শুরু হয়েছে।
আইনে যা বলা হয়েছে
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এ জলাধার সম্পর্কিত ৬-এর(ঙ) ধারায় বলা আছে, আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, জলাধার হিসাবে চিহ্নিত জায়গা ভরাট বা অন্য কোনভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করা যাইবে না। তবে শর্ত থাকে যে, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণক্রমে জলাধার সম্পর্কিত বাধা-নিষেধ শিথিল করা যাইতে পারে।
পরিবেশের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে এমন প্রকল্প নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সংবিধানে আছে যে, জলাশয় ভরাট করা যাবে নাÑ একেবারে অপরিহার্য কোনো জাতীয় স্বার্থ ছাড়া। এখন সবকিছুতেই জাতীয় স্বার্থ দেখিয়ে জলাশয় ভরাট করে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। আবার পরিবেশ অধিদপ্তরও ছাড়পত্র দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সংবিধান তো সবচেয়ে বড়। তাহলে এই সংবিধান লঙ্ঘন বা আইন ভাঙছে কে। যারা ভাঙছে, তারা হয় অত্যন্ত ক্ষমতাশীল লোকÑ যারা আইনের তোয়াক্কা করেন না। যেখানেই মেডিকেল কলেজ হোক বা ইপিজেডÑ সেটা কোনো মন্ত্রীর তদারকিতে হচ্ছে বা সরকারই তো করছে। মৎস্য মন্ত্রণালয় আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি জলাশয় ভরাট করে ভবন বানায়, তাহলে আর কার ওপর আস্থা রাখব। আমরা আসলে জলাভূমির প্রয়োজন বুঝি না, প্রকৃতির প্রয়োজন বুঝি না। বুঝলে এগুলো করতাম না।’
জলাশয় ভরাট করে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়ার বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘উন্নয়নের জন্য মূল্য দিতে হয়। এতে পরিবেশের ক্ষতি হবে এটা অবধারিত। তুলনা করতে হয় তাৎক্ষণিক ক্ষতি বেশি না লাভ বেশি। সুদূরপ্রসারী লাভ-ক্ষতির হিসাব করার মতো পণ্ডিত আমরা নই। আজকে আমাদের ছেলেমেয়ে স্কুলে যাবে, তার জন্য কী দরকার সেই হিসেবে আমরা কাজ করছি। ১০০ বছর পরে এই কাজের ফলে কী ক্ষতি হবে বলা সম্ভব নয়। উন্নয়নের স্বার্থেই এগুলো করা হচ্ছে।’