শহিদুল ইসলাম রাজী
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:৫০ পিএম
প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার আবু হানিফ ওরফে তুষার। প্রবা ফটো
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্ত্রীর আসনে নতুন তিনজনকে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে ৬০০ কোটি টাকার চুক্তি করেন আবু হানিফ তুষার ওরফে হানিফ মিয়া। মনোনয়ন নিয়ে দিতে পারবেন- তা বিশ্বাস করানোর জন্য তিনি নিজের মোবাইলে ‘শেখ রেহানা আপা’ নাম দিয়ে একটি নম্বর সেভ করেন। সেই নম্বরে পাঠানো এসএমএস দেখিয়ে প্রার্থীর বিশ্বাস অর্জন করতেন। তার প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও টেলিভিশন মালিক। তবে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা আগেই বড় কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি। প্রতারণার অভিযোগে গত মঙ্গলবার রাতে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার আবু হানিফ এসব তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে র্যাব।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আবু হানিফ গাজীপুরের এক মন্ত্রীকে সরিয়ে সেখানকার আওয়ামী লীগের এক বিতর্কিত নেতাকে ৩০০ কোটি টাকার বিনিময়ে মনোয়নের জন্য চুক্তি করেন। একটি বিলাসবহুল হোটেলে ওই চুক্তি হয়। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার এক মন্ত্রীকে সরিয়ে তার আসনে মনোনয়ন পাইয়ে দিতে চুক্তি করেন ২৫ কোটি টাকার। ওই মন্ত্রী ঢাকার একটি আসন থেকে নির্বাচন করবেন বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়াও ঢাকা উত্তরের এক এমপিকে সরিয়ে সেখানে নিজের সাবেক বসকে মনোনয়ন পাইয়ে দিতে ১৫০ কোটি টাকার চুক্তি করেন আবু হানিফ তুষার। এ ছাড়াও একটি টিভি চ্যানেলের মালিককে এক মন্ত্রীর আসন থেকে মনোনয়ন পাইয়ে দিবেন বলে ১৫০ কোটি টাকা দাবি করেন। তবে ওই চ্যানেলের মালিক তার টিভি বিক্রির ৭০ কোটি টাকা দিতে পারবেন বলে চুক্তি করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেন, মনোনয়নপ্রত্যাশীদের এমন অনেকের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন আবু হানিফ তুষার। তবে সবার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলেও কারো সঙ্গে মোটা অঙ্কের লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে চুক্তি হয় মনোনয়ন পাওয়ার পর টাকা পরিশোধ করার।
আবু হানিফের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আবু হানিফ অনেক মন্ত্রী, এমপির আসনে দলের বিতর্কিত নেতা ও ব্যবসায়ীদের টোপ দিয়ে নতুন মনোনয়ন পাওয়ার জন্য অর্থ আত্মসাৎ শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার নিকট আত্মীয় পরিচয়ে তিনি এসব প্রতারণা করে আসছিলেন। একের পর এক প্রতারণার কারণে র্যাবের কাছে অভিযোগ আসে আবু হানিফ তুষারের বিরুদ্ধে। একপর্যায়ে তুষারের বিষয়ে গোয়েন্দা কার্যক্রম চালানো হলে ভয়ঙ্কর ও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। তাকে গ্রেপ্তারের পর সমস্ত প্রতারণার বিষয়ে মুখ খোলেন তিনি। প্রমাণপত্রও তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নাম ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করতেন।
তিনি বলেন, মনোনয়ন দেওয়ার চুক্তি ছাড়াও একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য একজনের সঙ্গে ২০ কোটি টাকার চুক্তি করেন।
কমান্ডার আল মঈন বলেন, প্রতারক চক্রের হোতা আবু হানিফ তুষার ওরফে হানিফ মিয়া এভাবে অন্তত ১০-১২ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। প্রতারণা করে এ পর্যন্ত ৩০ জনকে সরকারি চাকরিও দিয়েছেন। বিশ্বাস অর্জনের জন্য শেখ পরিবারের সদস্য সেজে পদায়ন ও পদোন্নতি, সরকারি চাকরি দেওয়াসহ বিভিন্ন প্রতারণার নামে টাকা হাতিয়ে নিতেন। এমনকি প্রতারণার বিষয়টি আরও নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের ছবির সঙ্গে নিজের ছবি এডিট করে বসাতেন। নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে বলে মিথ্যা দাবি করতেন। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে তার টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের পাঠাতেন।
তিনি বলেন, তার ফাঁদে যারা পা দিয়েছেন তাদের কারো মনোনয়ন পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এজন্যই তিনি মনোনয়নের টিকিট পাওয়ার জন্য শত শত কোটি টাকা প্রতারণার ফাঁদ পাতেন। পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করতে পারলে তিনি বিদেশে চলে যেতেন।