× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে কারামুক্ত জঙ্গিরা

আলাউদ্দিন আরিফ

প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৩ ১২:৩২ পিএম

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৩ ১৩:১২ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

‘মুসলিম মিল্লাত বাহিনী’ গঠনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে উগ্রবাদীদের তৎপরতার সূচনা হয় ১৯৮৬ সালে। আর হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ (হুজিবি) নামক সংগঠনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়। মুসলিম মিল্লাত বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা মতিউর রহমান কিশোরগঞ্জ জেলার শিমুলিয়া এলাকায় ‘শিমুলিয়া ফরজে আইন মাদ্রাসা’ স্থাপন করে ওই মাদ্রাসার ছাত্রদের যুদ্ধবিদ্যা প্রশিক্ষণ দিতেন। ১৯৮৯ সালের ১২ ডিসেম্বর ওই মাদ্রাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। আড়াই দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পুলিশসহ নিহত হন ২১ জন। আর গ্রেপ্তার হন মতিউর রহমানসহ ৪৮ জন। মাদ্রাসা থেকে উদ্ধার হয় রাইফেল, বন্ধুকসহ অনেক দেশি-বিদেশি অস্ত্র। 

মুসলিম মিল্লাতের কিছু অনুসারী ও আফগান যুদ্ধফেরত ৫ হাজার মুজাহিদ নিয়ে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় হুজি-বি। যশোরের মাওলানা আব্দুর রহমান ফারুকী ছিলেন হুজিবির প্রতিষ্ঠাতা। সংগঠনটির প্রথম লক্ষ্য ছিল আরাকানের রোহিঙ্গাদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া। ১৯৯২ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে হুজিবি প্রকাশ্যে আসার ঘোষণা দেয়। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দেশে হুজিবির অনুসারীদের ব্যাপক প্রচারণা চলতে থাকে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায় হুজিবি। এরপর হুজিবি খুলনায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে হামলা, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে বোমা পুঁতে রাখা, নারায়ণগঞ্জে সিনেমা হলে, ঢাকার রমনা বটমূলে বোমা হামলাসহ বেশ কয়েকটি হামলা চালিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করে। হুজিবি ইসলামী গণ-আন্দোলন (আইডিপি) নাম দিয়ে নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে। যদিও সচেতন নাগরিকদের আপত্তির মুখে তারা নিবন্ধন পায়নি।

হুবিজির পর আফগানফেরত অপর মুজাহিদ শায়খ আব্দুর রহমানের হাত ধরে ১৯৯৮ সালে আত্মপ্রকাশ করে জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহেদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা চালিয়ে তারা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। বিশেষ করে ২০০৪ সালে তারা সারা দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তারা উল্লেখযোগ্য ২৬টি নাশকতা ঘটায়। দেশের উত্তরাঞ্চলে তাদের তৎপরতা বেশি দেখা যায়। পরে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইসহ দলের শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হন। ২০০৭ সালের ৩ মার্চ জঙ্গিদের ৬ নেতার ফাঁসি হয়। এরপরও সংগঠনের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নেতাকর্মীরা নতুন নতুন নামে বিভিন্ন দলে ও শাখায় বিভক্ত হয়ে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।

২০০৮ সালে বনানীর একটি মসজিদে প্রতিষ্ঠা করা হয় জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)। এই সংগঠনটি নিজেদের সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংগঠন আল-কায়েদার অনুসারী দাবি করে। ২০০৩ সালে ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যাসহ বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটায় সংগঠনটি। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ক্রমাগত অভিযানে সংগঠনের সদস্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই সেনাবাহিনীর বহিষ্কৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়ার হাত ধরে তৎপরতা শুরু করে নব্য জেএমবি। তার একটি শাখার নাম আনসার আল ইসলাম। নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম নিজেদের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংগঠন আইএসের অনুসারী দাবি করে। এরা আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট (অ্যাকিউআইএস) নামেও নিজেদের সংগঠিত করে। এই নব্য জেএমবির সদস্যরা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংসতম জঙ্গি হামলা ঘটায় রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে। নব্য জিএমবির কর্মীদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হন পুরোহিত, মন্দিরের সেবায়েত, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও বিদেশি নাগরিক।

বাংলাদেশে আরও যেসব নামে উগ্রপন্থিরা অপতৎপরতা পরিচালনা করে তার মধ্যে রয়েছে আফগান পরিষদ, আহলে হাদিস আন্দোলন, আহলে হাদিস যুবসংগঠন, হিযবুত তাহরীর, আহসাব বাহিনী, আল-ইসলাম মারটার্স গ্রুপ, আল-জিহাদ বাংলাদেশ, আল-কুদরাত আল ইসলামী মরটারস, আল-কায়েদা, আল্লার দল, আল্লার দল বিগ্রেড, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমবেবি), জয়শে মোহাম্মদ, ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আরাকান, তামিরুল দ্বীন বাংলাদেশ, তাওহিদী জনতা, শহীদ নাসিরুল্লাহ খান আরাফাত বিগ্রেড, জামাতুল আনসার ইত্যাদি।

সম্প্রতি জঙ্গিরা পাহাড়ি উগ্রবাদীদের সঙ্গে মিলে নতুন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। এর নাম দেওয়া হয় জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া। ইতোমধ্যে এই সংগঠনের প্রধান শামিন মাহফুজসহ অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। 

র‌্যাব ও পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, জঙ্গি সংগঠনগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়লেও এখনও উগ্রবাদীদের হুমকি শেষ হয়ে যায়নি। আনসার আল ইসলাম বা অ্যাকিউআইএসের শীর্ষ নেতা সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত মেজর জিয়া দীর্ঘদিন থেকে আত্মগোপনে। তাকে ধরতে পুলিশ সদর দপ্তর পুরস্কার ঘোষণা করেছে। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। এই সংগঠনের অধিকাংশ সদস্য উচ্চশিক্ষিত, সচ্ছল ও তথ্যপ্রযুক্তিতে অত্যন্ত দক্ষ। সংগঠনের মধ্যম সারি থেকে উচ্চপর্যায়ের নেতাদের আইনের আওতায় আনা বেশ কঠিন। তাই সংগঠনটিকে এখনও হুমকি মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশ বলেন, গত কয়েক বছরে জঙ্গি হামলার বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। জামাতুল আনসার নামক একটি সংগঠন পাহাড়ি এলাকায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা ছাড়া প্রকাশ্য কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তবে তারা অনলাইনে ও বিভিন্ন ছদ্মনামে সক্রিয় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা জঙ্গি সংগঠনগুলোর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সদস্যরা যেকোনো সময় হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। তারা আরও বলেন, ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। ওই অভিযানে নব্য জেএমবি, আনসার আল ইসলামসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ২০১৭ সালের পর থেকে জঙ্গিরা বড় কোনো হামলার ঘটনা ঘটাতে পারেনি।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, ২০০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ জঙ্গিবাদ বিষয়ে ১ হাজার ৯৪৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৯ হাজার ৭২ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) জানায়, প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার হওয়ায় জঙ্গিরা সক্রিয় হতে পারছে না। তারা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় চলতি বছর ৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ২০২২ সালে ১৭০ জন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া আনসার আল ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এস এম রুহুল আমিন বলেন, ‘এটি (জঙ্গিবাদ) নিয়ে কখনও তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার সুযোগ নেই। আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। জঙ্গিবাদ দমনে আমরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি।’

এসবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ডিআইজি জানান, জঙ্গিদের প্রকাশ্যে তৎপরতা দেখা না গেলেও গোপনে তারা সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন নামে বা ছদ্মনামে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য নিত্য নতুন অ্যাপস ব্যবহার করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জেএমবি, আনসার আল ইসলাম ও হুজিবি নতুনভাবে সংগঠিত হচ্ছে, অপরদিকে সংগঠনের কিছু প্রবীণ নেতা জামিনে জেল থেকে বেরিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছোট ছোট দল গঠন করার চেষ্টা করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা নতুন নাম দিয়ে গোপনে তরুণদের সক্রিয় করছে। তাদের বিষয়ে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। 

নতুন নতুন নামে জঙ্গিদের সক্রিয় হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জেএমবি বা নব্য জেএমবি এখন আর নেই। তবে কিছু সুপ্ত বীজ রয়ে গেছে। নতুন কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। তারা সারা দেশ থেকে তরুণদের পাহাড়ে নিয়ে সংগঠিত ও প্রশিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করছে। পুলিশ ও র‍্যাবের ধারাবাহিক অভিযানে তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তারা ভবিষ্যতেও সফল হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

১৯৮৬ সালের দিকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের যে তৎপরতার সূচনা হয়, গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মধ্য দিয়ে তার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জনের মৃত্যু বাংলাদেশকে এক গভীর সংকটে ফেলে। তবে সরকার দ্রুতই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম হয়। ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে ওঠা জঙ্গিদের একের পর এক অভিযানে কোণঠাসা করে তোলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা