বগুড়া অফিস ও সারিয়াকান্দি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৩ ১৩:৪১ পিএম
বগুড়ার যমুনা এবং বাঙালি নদীতে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ নিধন করা হচ্ছে। এ কারণে পেশাদার জেলেরা জাল ফেলে মাছ পাচ্ছেন না। প্রবা ফটো
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা ও বাঙালি নদীতে তৎপর ভয়ংকর ‘কারেন্ট জ্যালা’। তারা বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নদীতে মাছ শিকার করছেন। কম সময়ে বেশি মাছ পাওয়ার আশায় কিছু লোভী জেলে এ পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ জেলেরা। তাদের জালে এখন আর খুব একটা মাছ ধরা পড়ছে না। বৈদ্যুতিক শকে মাছ ধরার কারণে নদীতে থাকা মাছের পোনা, ডিমসহ অন্যান্য জলজপ্রাণীও মারা পড়ছে। ফলে এ দুই নদীতে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরেরর তথ্যমতে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যমুনা ও বাঙালি নদীতে ছোট-বড় মিলে মোট ৮৪৭ টন মাছ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালে সেই উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে ৫৮৭ টনে এসে ঠেকেছে।
স্থানীয় জেলেরাও বলছেন, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকারির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় যমুনা ও বাঙালি নদীতে জাল ফেলে আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা অবিলম্বে অবৈধ এ মাছ শিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকারিদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না বলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও হচ্ছে না।
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে সারিয়াকান্দি উপজেলা সদরের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে যমুনা ও বাঙালি নদী বয়ে গেছে। উভয় নদীর মধ্যে দূরত্ব দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার। তবে উপজেলার তিতপরল ও দেবডাঙ্গা এলাকাসহ কোনো কোনো স্থানে এর ব্যবধান ৫০০ মিটারেরও কম। বড় নদী হওয়ায় যমুনায় সারা বছর মাছ পাওয়া গেলেও ছোট নদী বাঙালিতে শুধু বর্ষাকাল কিংবা বৃষ্টিতে যখন পানি বাড়ে, তখনই মাছ পাওয়া যায়।
সারিয়াকান্দি মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই নদীতে প্রায় তিন হাজার জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। সারিয়াকান্দিতে প্রতিবছর মাছের চাহিদা রয়েছে ৫ হাজার টন। এর প্রায় ১০ শতাংশ উৎপাদন হয় যমুনা ও বাঙালি নদী থেকে।
যমুনা নদীতে প্রায় সব প্রজাতির মাছ মেলে। ছোট মাছের মধ্যে বাঁশপাতারি, বৈরালি, বেলে, রিটা গলদা চিংড়িই বেশি পাওয়া যায়। আর বড় মাছের মধ্যে ৫-১০ কেজি ওজনের পাঙাশ, বাঘাইড়, বোয়াল, ভেউশ, এমনকি ইলিশও মেলে। অন্যদিকে পাশের বাঙালি নদীতে রানী বউ, ভাঙনা বাটা, কালিবাউশ ও ঘাউড়া মাছ বেশি পাওয়া যায়।
সারিয়াকান্দি উপজেলার হিন্দুকান্দি গ্রামের কলেজছাত্র সেলিম আহমেদ স্বপন জানান, তিনি পড়ালেখার পাশাপাশি অবসর পেলেই বাড়ির পাশে বাঙালি নদীতে বড়শি কিংবা জাল নিয়ে মাছ ধরতে যান।
স্বপন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রায় এক বছর আগে রাতে বাড়ি থেকে একটু দূরে পাইকাড়পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখি দুজন নৌকায় বসে নতুন এক পদ্ধতিতে মাছ শিকার করছেন। কৌতূহল মেটাতে তাদের নৌকার কাছে গিয়ে দেখতে পাই ইজিবাইকে ব্যবহৃত ব্যাটারির সঙ্গে একটি ইনভার্টার (ব্যাটারির নির্ধারিত ভোল্টকে কয়েকগুণ বৃদ্ধি করার যন্ত্র) যুক্ত করে বিদ্যুৎপ্রবাহ তৈরি করা হয়েছে। সেই ইনভার্টার থেকে দুটি তার বের করে একটি পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে আর অন্যটি একটি জালির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যুতায়িত ওই জালি যখন নদীর পানিতে ফেলা হচ্ছে, তখন ৫ থেকে ৭ ফুট দূরত্বের মধ্যে থাকা মাছগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভেসে উঠছে। ভেসে ওঠা মাছগুলো পরে জালি দিয়ে নৌকায় তোলা হচ্ছে। ওই পদ্ধতিতে মাছ শিকারের সময় আমি একটি সাপকেও ভেসে উঠতে দেখলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর আরেক দিন জোড়গাছা এলাকাতেও বাঙালি নদী থেকে ওই একই পদ্ধতিতে মাছ শিকারের দৃশ্য চোখে পড়েছে। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি তারা ইউটিউবে মাছ শিকারের ওই পদ্ধতি রপ্ত করেছেন। অল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়া যায় বলেই তারা এই পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। সারিয়াকান্দির বিভিন্ন এলাকার প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি অবৈধভাবে এই পদ্ধতিতে মাছ শিকারে যুক্ত।’
গত বৃহস্পতিবার সারিয়াকান্দির যমুনা তীরবর্তী মথুরাপাড়া এলাকা গিয়ে স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকারিরা যমুনা নদীতেও বেশ তৎপর। ওই প্রক্রিয়ায় যারা মাছ শিকার করেন, তাদের স্থানীয় জেলেরা ‘কারেন্ট জ্যালা’ নামে ডাকেন। মথুরাপাড়া এলাকার জেলে সয়ফুল হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘পানি কমে যাওয়য় যমুনা নদীতে এমনিতেই মাছ কমেছে। তার ওপর এখন এই কারেন্ট জ্যালারা আসার পর আমরা আর মাছই পাচ্ছি না। ওরা ক্যারেন্ট দিয়ে নিমেষেই ছোট-বড় সব মাছ মারছেন।’
সুবল হাওলাদার নামে আরেক জেলে বলেন, ‘উজানে হাসপানাপাড়া থেকে ভাটিতে চন্দনবাইশা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় যমুনা নদীতে কারেন্ট দিয়ে মাছ মারা হচ্ছে। তারা গভীর রাতে মাছ ধরতে নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন আর ভোরে বাড়ি ফেরেন।’
হবিবর রহমান নামে অপর এক জেলে বলেন, ‘আমরা ১৫ থেকে ১৮ জন জেলে সারা দিন দু-তিনবার জাল ফেলে ৮-১০ হাজার টাকার মাছও পাই না। ওই মাছ বিক্রির টাকা থেকে নৌকার ভাড়া এবং মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ শোধ করার পর একজনের ভাগে ৫০০ টাকাও থাকে না। সবচেয়ে বড় কথা এই কারেন্ট জ্যালাদের কারণে মাছের পোনা এবং ডিমও নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে নদীতে আর কোনো মাছই থাকবে না। যদি এদের ধরা না হয়, তাহলে আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।’
মথুরাপাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে অস্থায়ী আড়তে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিকরা মাছের নাম ধরে চিৎকার করে দর হাঁকছেন। সেখানে মাছ কিনতে আসা নবানু হাওলাদার জানালেন, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে শিকার করা মাছগুলো ওই আড়তেও বিক্রি করা হয়। নিশি হাওলাদার নামে অপর এক পাইকারি ক্রেতা জানান, যারা বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরেন, তারা সাধারণত ভোরের দিকে আড়তে এসে মাছ বিক্রি করে চলে যান।
সারিয়াকান্দি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম মোর্শেদ বলেছেন, যমুনা ও বাঙালি নদীতে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকারের তথ্যটি ৬ মাস আগে পাওয়া গেছে। কিন্তু তারা গভীর রাতে নদীতে নামেন বলে অনেক চেষ্টা করেও ধরা সম্ভব হচ্ছে না। তবে তাদের ধরতে চেষ্টা চলছে। এমনকি তাদেরকে শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশেরও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনগণকেও সচেতন করা হয়েছে।