মোহাম্মদপুর
মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। ফাইল ছবি
হালকা বৃষ্টির দুপুর। ঘড়ির কাঁটায় তখন সাড়ে ১২টা। মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোড ধরে জেনেভা ক্যাম্পের দিকে এগোতেই কানে ভেসে এলো, ‘ভাই, লাগবে নাকি?’ একটু সাড়া দিয়ে হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা, হেরোইন কিংবা গাঁজার মতো প্রাণঘাতী মাদক।
ঢাকা জেনারেল হসপিটাল অ্যান্ড অর্থোপেডিকসের সামনে তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো তিন তরুণ। একজনের হাতে সাদা কাগজে মোড়ানো পুঁটলি। মুহূর্তেই প্যাকেট খুলে প্রকাশ্যে গাঁজা বানাচ্ছেন তিনি। একটু সামনে এগোতেই চোখে পড়ল নারীসহ সাত-আটজনের একটি দল টাকা ভাগবাটোয়ারা করছে। অপরিচিত কারও গতিবিধি দেখলেই তাদের একজন এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করছেন, ‘কোনটা লাগবে ভাই? ইয়াবা না গাঁজা?’
এটি কেবল এক দিনের চিত্র নয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও এর আশপাশের এলাকার নিত্যদিনের দৃশ্য এটি। চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতÑ সব মিলিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকাটি এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। আর এই অপরাধজগতের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠেছে জেনেভা ক্যাম্প।
শীর্ষে মাদক, পরিসংখ্যানে উদ্বেগ
মোহাম্মদপুর থানার পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত এই থানায় মোট মামলা হয়েছে ৫৫৪টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৩৬টি মামলাই মাদকের। অর্থাৎ মোট অপরাধের প্রায় ৪২ শতাংশই মাদককেন্দ্রিক। এরপরই রয়েছে দস্যুতা ও ডাকাতির চেষ্টা (৬৪টি) এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের (৪০টি) মামলা। এ ছাড়া খুনের ৩টি, দস্যুতার ১৩টি, চুরির ২৯টি, অস্ত্র উদ্ধারের ১১টি, চাঁদাবাজির ১৬টি এবং অন্যান্য ধারায় ১৪২টি মামলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বাবর রোডের মসজিদ গলি, টাউন হল ও তাজমহল রোডের অলিগলিতে মাদকের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘পুলিশ যখন আসে, তখন এরা আড়ালে চলে যায়। পুলিশ গেলেই আবার ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করে। মাঝে মাঝে অভিযান চলে, গ্রেপ্তার হয়, কিন্তু পরিস্থিতি বদলায় না।’
কিশোর গ্যাং ও হাউজিং সোসাইটির দ্বন্দ্ব
মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে প্রায়ই স্থানীয় কিশোর গ্যাংগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। সহজলভ্য মাদকের টাকা জোগাড় করতে অলিগলিতে বাড়ছে ছিনতাই ও চুরির মতো অপরাধ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রমতে, মোহাম্মদপুর এলাকায় ৪০টির মতো হাউজিং সোসাইটি রয়েছে। এর অর্ধেকের বেশি জায়গায় জমি দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। এ ছাড়া বেড়িবাঁধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমির মতো অপেক্ষাকৃত নির্জন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে। ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষের বসবাস এই মোহাম্মদপুরে। এর মধ্যে লক্ষাধিক মানুষ ভাসমান। স্থায়ী ঠিকানা না থাকা এই ভাসমান মানুষের একটি অংশ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। অপরাধ করে সহজেই এরা গা ঢাকা দিচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য ও সীমাবদ্ধতা
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেনেভা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে মাদকের যে অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে, তা এক দিনে হয়নি। সাধারণ থানা-পুলিশের পক্ষে এটি নির্মূল করা কঠিন; এর জন্য বিশেষ ইউনিটের অভিযান প্রয়োজন।
এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেসবাহ উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা হয়েছে। আগে যা ছিল না, সেই ‘ফুট প্যাট্রোলিং’ বা পায়ে হেঁটে টহলও আমরা শুরু করেছি। জেনেভা ক্যাম্প ঘিরে আমাদের সাতটি চেকপোস্ট সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মোহাম্মদপুর অঞ্চলের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবদুল্লাহ আল মামুন মনে করেন, কিছু ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করায় এলাকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, এমনকি অনেকে এ এলাকায় বাড়ি ভাড়াও নিতে চাইছেন না। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ ছোট্ট একটি জায়গায় ৪০-৫০ হাজার মানুষের বাস। অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে অপরাধ বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে জেনেভা ক্যাম্প আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণে। আগে প্রতি মাসে দুই-তিনটা খুনের ঘটনা ঘটত, এখন তা নেই। বড় বড় মাদক কারবারিকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তবে আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, আমরা সরে এলেই অপরাধীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।’