কবির হোসেন
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫১ এএম
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০০ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালানের খবর পাওয়া যাচ্ছে গত কয়েক মাস ধরেই। আর এই সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারিরাও। সীমান্তপথে এসব কারবারি সক্রিয় হচ্ছে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে ফেনসিডিল নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়তেই কৌশল বদলেছে মাদক চক্রগুলো। পুরনো নামের বদলে এবার নতুন মোড়কে তিনটি সিরাপÑ ‘ব্রনোকফ সি’, ‘চকো প্লাস’ ও ‘উইন কোরেক্স’ বাংলাদেশের বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এই চক্রটি।
সীমান্তঘেঁষা ভারতের অন্তত ১০ জেলার কারখানায় তৈরি এসব নেশাজাতীয় সিরাপ ইতোমধ্যে দেশের আটটি সীমান্ত জেলা দিয়ে ঢুকতে শুরু করেছে। ছোট পরিসরে কিছু চালান আটক হলেও, মাদক হিসেবে এখনও অপরিচিত এসব সিরাপের বিস্তার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফেনসিডিলের মতো এসব সিরাপেও রয়েছে কোডিন ফসফেট, যা নেশার প্রধান উপাদান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি ব্যস্ততাকেই সুযোগ হিসেবে দেখছে মাদক কারবারিরা। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যস্ত ঠিক সেই সময় মাদক কারবারিরা এটাকে একটি সুযোগ মনে করছে। সীমান্তপথে মাদক পাঠিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে নতুন করে মাদকাসক্ত তৈরি করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচনে সহিংসতা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্যই কাজ করবে, তবে এই কাজের সঙ্গে মাদকের মতো বিষয়গুলো নিয়ে, যাতে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়। দেশে একবার মাদক প্রবেশ করার পরে আমরা যতই কঠোর হই তা আর ঠেকানো যায় না। মাদক প্রবেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অবস্থান হলো জিরো টলারেন্সÑ এটি কেবল মুখে আমরা এর কোনো বাস্তবায়ন দেখি না। ওষুধের আড়ালে নতুন নামে মাদক প্রবেশ করলে প্রতিটি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে নজরদারি বাড়াতে হবে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর ও দামকুড়া থানার মুরারীপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী ব্রনোকফ সি পাচারের সঙ্গে জড়িত। নতুন মাদক হিসেবে অনেক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এখনও এটি শনাক্ত করতে না পারায় পাচারকারীরা তুলনামূলক সহজেই সীমান্ত পার হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ সীমান্তে গত ৩ ডিসেম্বর ‘চকো প্লাস’ সিরাপের একটি চালান জব্দ করে বিজিবি। মহানন্দা ব্যাটালিয়নের টহলে ১৫০ বোতল উদ্ধার করা হয়। গত এক মাসে একই ব্যাটালিয়ন প্রায় ২০০ বোতল চকো প্লাস জব্দ করেছে। বিজিবির মহানন্দা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম কিবরিয়া বলেন, মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে এবং নতুন মাদক নিয়েও সীমান্তে সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
অন্যদিকে যশোরের শার্শা ও বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বেশি আসছে ‘উইন কোরেক্স’। শুধু গত নভেম্বরের প্রথম ১০ দিনেই বিজিবি ৮৫০ বোতল এই সিরাপ জব্দ করেছে। যেখানে এক বোতল ফেনসিডিলের দাম তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা, সেখানে উইন কোরেক্স বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। কম দামের কারণে তরুণদের মধ্যে এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, নেশার মাত্রা বাড়াতে পাচারকারীরা এতে প্যাথেডিন মিশিয়ে দিচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। সর্বশেষ গত সোমবার কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়ারছড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ২৪ কোটি টাকা মূল্যের ৬ লাখ ৩০ হাজার ইয়াবা ও ১০ কেজি হেরোইন উদ্ধার করেছে র্যাব। এ সময় দুই মাদক কারবারিকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত এসব মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৪ কোটি টাকা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, ফেনসিডিলের আদলে তৈরি এই তিন সিরাপের মধ্যে ‘ব্রনোকফ সি’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি শঙ্কা রয়েছে। কাশির সিরাপ হিসেবে বাজারজাত হলেও নেশাজাতীয় উপাদান থাকায় ভারতে এগুলো নিষিদ্ধ। তবে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও উৎপাদন বন্ধ হয়নি। বরং ফেনসিডিলের বোতলে নতুন নামের লেবেল লাগিয়ে সেগুলো বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। এর আগে ‘এস্কাফ’ নামের সিরাপও একই কৌশলে দেশে ঢুকেছিল। নাম বদলালেও নেশার মাত্রায় এই তিনটি সিরাপ ফেনসিডিলের সমান বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন তিনটি সিরাপের মধ্যে ‘ব্রনোকফ সি’ সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। রাজশাহীর চারঘাট ও দামকুড়া এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে এই সিরাপ বেশি ঢুকছে। সহজলভ্যতার কারণে এটি দ্রুত ওষুধজাত মাদকের বিকল্প হয়ে উঠছে। নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যস্ততা বাড়লে এই পাচার বহুগুণে বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে। অধিদপ্তরের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্ত। অধিদপ্তরের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন অধিশাখার তথ্যমতে, এসব মাদক সেবনে গলা শুকিয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঝিমুনি, লিভার ও কিডনি বিকল হওয়া এবং দীর্ঘ মেয়াদে পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ভারতের সীমান্তবর্তী ১০টি জেলায় অন্তত ৬২টি কারখানায় এই তিন ধরনের নেশাজাতীয় সিরাপ উৎপাদিত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, মালদা ও মুর্শিদাবাদ; ত্রিপুরার পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চল, সিপাহীজলা, বিলোনিয়া ও শান্তির বাজার এবং মেঘালয় রাজ্যের একটি জেলায় এসব কারখানা অবস্থিত। এসব কেন্দ্র ঘিরে অন্তত ৩৭৪ জন ভারতীয় মাদক কারবারি সক্রিয়, যারা বাংলাদেশে পাচারের সঙ্গে জড়িত। সাতক্ষীরা, যশোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াÑ এই আটটি সীমান্ত জেলা দিয়ে এসব মাদক দেশে ঢুকছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা ভারতীয় এসব কারখানা, কারবারি, পাচারের রুট এমনকি জিরো লাইন থেকে দূরত্ব পর্যন্ত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব তথ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ভারতের কাছে তুলে ধরে কারখানাগুলো বন্ধের সুপারিশ করা হবে। পাশাপাশি যেসব সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢুকছে, সেখানকার পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সতর্ক করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এর আগেও ভারতীয় কারখানার তালিকা পাঠানো হলেও বাস্তবে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি।
নতুন মাদক নিয়ে অনুসন্ধান চালানো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বগুড়া কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহা. জিললুর রহমান বলেন, কোডিন ফসফেটযুক্ত সিরাপের নাম যাই হোকÑ ফেনসিডিল, ব্রনোকফ সি, চকো প্লাস বা উইন কোরেক্সÑ সীমান্তে এগুলো ঠেকাতে পারলেই দেশের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হবে। তিনি জানান, ভারতের ‘ল্যাবোরেট ফার্মাসিউটিক্যালস’ নামের প্রতিষ্ঠান কাশির ওষুধ হিসেবে এসব সিরাপ উৎপাদন করে। নেশাজাতীয় উপাদানের কারণে ভারতে নিষিদ্ধ হলেও উৎপাদন বন্ধ না হওয়ায় সেগুলো বিভিন্ন রাজ্য হয়ে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
র্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিয়ামুল হালিম খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সম্প্রতি আমরা বড় বড় অভিযানে সফলতা পেয়েছি। নির্বাচনের আগে যে সুযোগ নিতে চেয়েছিল তারা ব্যর্থ হচ্ছে। গত ১৫ দিনে প্রত্যেকটি জায়গায় তারা আটক হয়েছে। প্রতিটি ব্যাটালিয়ন সক্রিয় রয়েছে।