কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪০ এএম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১৬ এএম
দেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার চিত্র দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রতীকী ছবি।
দেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার চিত্র দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত বছরের নভেম্বর মাসেই ২৯ কন্যাশিশু ও ১৬ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ৯ জন কন্যাশিশুসহ ১৪ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন।
পুলিশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ডিসেম্বরে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা হয়েছে ১২৪৮টি। সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন প্লাটফর্ম বলছে, সাইবার সহিংসতার শিকার হওয়াদের মধ্যে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশই শিক্ষার্থী, গৃহিণী ২০ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া বিক্রয়কর্মী, বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কর্মী ও ব্যবসায়ী ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যাই নয়, বরং সমাজে নারীর নিরাপত্তাহীনতার নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। শরীয়তপুর সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী পরীক্ষা শেষে সহপাঠীর সঙ্গে বাসের অপেক্ষায় থাকাকালে কয়েকজন যুবক তাদের জোর করে বন বিভাগের ভেতরে নিয়ে যায়। সেখানে সহপাঠীকে মারধর করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় এবং ওই শিক্ষার্থীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়। প্রায় ২ ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখিয়ে সড়কে ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে। রাজধানীর চকবাজার এলাকায় স্বামীকে অস্ত্রের মুখে আটকে রেখে গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে ইসলামবাগের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। রাজশাহীর তানোরেও এক নারীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ১১ মাসে সারা দেশে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২ হাজার ৫৪৯ নারী। এর মধ্যে ১ হাজার ১৭৪ কন্যাশিশু। পরিসংখ্যান বলছে, ১১ মাসে ৫৯৩ নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কন্যাশিশু ও কিশোরী ১০১ জন। নিপীড়নের শিকার হয় ৯৫ জন; এর মধ্যে কন্যাশিশু ও কিশোরী ৬১ জন। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৮১ জনকে, যাদের মধ্যে ১৪১ জন কন্যাশিশু ও কিশোরী। ধর্ষণ ও দলগত ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭২৪ নারী ও কন্যাশিশু। এদের মধ্যে ৫০০ জন কন্যাশিশু ও কিশোরী। অর্থাৎ ধর্ষণ ও দলগত ধর্ষণের শিকার হওয়াদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিল কন্যাশিশু ও কিশোরী। ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন ২৯ নারী ও কন্যাশিশু। তাদের মধ্যে ১৬ জনের বয়স ১৮ বছরের মধ্যে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৭৮৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬২৭ জন। তবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা নেমে আসে ৩২৯-এ। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত চার বছরে বাংলাদেশে প্রতি ৯ ঘণ্টায় একটি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেই দেখা যায়, গত চার বছরে প্রতিদিন অন্তত দুজন করে নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্যাতন সংক্রান্ত প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১১টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত ১১টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) গত আড়াই বছরে ৩৮ হাজার ১২৪ জন নারী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১১ হাজার ৪২৮ জনই যৌন পীড়নের শিকার হয়েছেন। ২০১৭ থেকে গত বছরের জুলাই পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতেই চিকিৎসা নিয়েছেন ৩ হাজার ৬০১ জন নারী ও শিশু।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৫৭১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন আর ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই হয়েছেন ৪৯৬ জন। গত বছরের ছয় মাসে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর মৃত্যু হয়েছে ২৬ শিশুর। ২০১৮ সালে পুরো বছরে ৩৫৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। এর মধ্যে মারা যায় ২২ জন।
আসকের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৭৩২টি। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৬৩ জনকে। ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে তিন নারীকে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২০৩টি। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৮১টি। গত জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭৯১টি। এ সংখ্যা আগের এক বছরের চেয়েও বেশি। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৬ জনকে। ২০১৭ সালে ধর্ষণের মোট সংখ্যা ছিল ৮১৮ এবং ২০১৬ সালে ৭২৪টি। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণ বাড়ে ৩৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের আন্দোলনে তরুণদের সঙ্গে তাদের চিন্তা ও কর্মধারার মিল রয়েছে। বর্তমান সহিংসতার বর্বর রূপ থেকে মুক্তি পেতে হলে সংগঠিত ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নাগরিক হিসেবে নারীর অধিকার আদায়ের পথে থাকা বাধাগুলো চিহ্নিত ও প্রতিহত করা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম সম্প্রতি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতাই আজ নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় বাধা। পাশাপাশি সাইবার সহিংসতা নারীর অবস্থানকে আরও নাজুক করে তুলছে। প্রতিবাদের স্বর জোরালো হলেও বিরুদ্ধ শক্তিও শক্তিশালী হচ্ছে। এ অবস্থায় জ্ঞান, সচেতনতা ও সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং নারী আন্দোলনে পুরুষদের সম্পৃক্ত করতে হবে। সুন্দর সমাজ গঠনে তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নারীপক্ষের রীনা রায় প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ধর্ষণের পেছনে অনেক সময় ক্ষমতার অপব্যবহার বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। শুধু লালসা নয়, বরং পূর্বশত্রুতা, প্রতিশোধপরায়ণতা ও আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতাও এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেন, বর্তমানে ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির পাশাপাশি সাইবার ক্রাইম ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রণয়ন ও নিয়মিত হালনাগাদের পাশাপাশি প্রযুক্তি বিষয়ে নারী সমাজকে শিক্ষিত করা জরুরি। সারভাইভারদের জন্য কাউন্সেলিং ও আইনি সহায়তা বাড়ানোর ওপরও তিনি জোর দেন।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নুজহাত-ই-রহমান বলেন, সাইবার সহিংসতার শিকার কন্যার ক্ষেত্রে বাবা-মাকে সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে মানসিক সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সন্তানদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিভাবকদেরও নিজেদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সচেতনতা নিয়মিত হালনাগাদ করার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার মোসা. ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানো না গেলে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ে। সাইবার সহিংসতা প্রতিরোধে শৈশব থেকেই ছেলে-মেয়েদের পারস্পরিক সম্মান শেখানো এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।