প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:৩৭ পিএম
দেশের একমাত্র সরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডে (ইডিসিএল) দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা বিদ্যমান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এই স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন এবং শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে এসব অনিয়মের সত্যতাও উঠে এসেছে। এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাবেক এমডি ডা. এহসানুল কবির জগলুলের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগ। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকা সত্ত্বেও তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির বাইরে থেকে দেশ ত্যাগ করেন। আবার তিনি পরিবারসহ দেশে অবস্থান করছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কোনো আমদানি বা উৎপাদন ছাড়াই ইডিসিএলে সরবরাহ দেখানো হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কেজি পরিশোধিত নারিকেল তেল, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১২ কোটি। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে বাণিজ্যিকভাবে এক কেজিও আরবিডি কোকোনাট অয়েল আমদানি হয়নি।
ইডিসিএলের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠানটির কার্যাদেশের বিপরীতে মেসার্স ক্রিস্টাল ট্রেডিং, মেসার্স গোল্ডেন অয়েল মিলস এবং মেসার্স মোনালিসা ইন্টারন্যাশনালÑ এই তিন প্রতিষ্ঠান মোট ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৬৫ কেজি পরিশোধিত নারিকেল তেল সরবরাহ করে। আন্তর্জাতিক বাজারদরের হিসেবে যার মূল্য প্রায় ১২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। তবে কাস্টমস গোয়েন্দা অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ছয় বছরে দেশে বাণিজ্যিকভাবে কোনো আরবিডি কোকোনাট অয়েল আমদানি হয়নি। এ ঘটনায় ২০২৩ সালে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে।
ভুয়া সার্টিফিকেটের স্বীকারোক্তি অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুতর তথ্য উঠে আসে মেসার্স ক্রিস্টাল ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কামরুল হাসান মজুমদার ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে স্বীকার করেন, তিনি স্থানীয় বাজার থেকে নারিকেল তেল সংগ্রহ করে ইডিসিএলে সরবরাহ করেছেন, কিন্তু সেই তেল কোথা থেকে বা কার কাছ থেকে কেনা হয়েছে; তার কোনো প্রমাণ নেই। তবে মেসার্স গোল্ডেন অয়েল মিলস তাদের আমদানি ও উৎপাদনের পক্ষে দলিল উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়। তদন্ত শেষে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালোতালিকাভুক্ত করা হয়।
ইডিসিএলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ডা. এহসানুল কবির জগলুল নিজেই সব ধরনের কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করতেন। চার দফা মেয়াদ বাড়িয়ে টানা ১০ বছর এই পদে বহাল থাকেন। দুদকে তার বিরুদ্ধে ৪৭৭ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
ইডিসিএলের সূত্র জানায়, জগলুল দায়িত্বে থাকাকালে প্রায় তিন হাজার লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ।
জগলুলের আমলে গোপালগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে ইডিসিএলের দুটি ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গোপালগঞ্জ ইউনিটের ব্যয় ও সময় একাধিকবার বাড়ানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে চার শতাধিক কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে। অভিযোগ ছাঁটাইয়ের আড়ালে অর্থ লেনদেন হয়েছে।