ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১১ এএম
প্রতিকী ছবি: সংগৃহীত
মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বাংলাদেশের জন্য বহু বছর ধরেই একটি বড় সংকট। দেশে গৃহকর্মী, ইটভাটা, চা-বাগান থেকে শুরু করে বিদেশগামী শ্রমিক নির্যাতন সব জায়গাতেই পাচার ও শোষণের ধরন বদলে গেছে। এই বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকার মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ব্যাপক সংশোধন আনতে যাচ্ছে। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অভিবাসী চোরাচালানে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে, সেটিও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১০ বছর এবং ন্যূনতম ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড, পাশাপাশি ন্যূনতম ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হবে। এমন বিধান রেখে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এটি অনুমোদন হতে পারে। এটি পাস হলে পরবর্তীতে অধ্যাদেশ জারি করবে সরকার।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দণ্ডবিধি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে অবৈধ অভিবাসন সিন্ডিকেটের কার্যক্রম বড় ধরনের চাপে পড়বে। তা ছাড়া অপরাধের সংজ্ঞাগুলো স্পষ্ট হওয়ায় তদন্ত, বিচার, ভুক্তভোগী সুরক্ষা এবং অপরাধ শনাক্তকরণে অতীতের জটিলতা অনেক কমে যাবে।
আশ্রয়কেন্দ্র উদ্ধারকৃত ব্যক্তিদের সুরক্ষায় নতুন কাঠামো
মানব পাচারের শিকারদের নিরাপদ আবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আইনগত বিভ্রান্তি ছিল। কখনও দপ্তর বলেছে, একটি এনজিও কেন্দ্রই ‘শেল্টার হোম’, আবার কখনও প্রশাসন তা অস্বীকার করেছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে জেলখানা ছাড়া যেকোনো প্রতিষ্ঠান, যেই নামে অভিহিত হোক না কেন, যদি পাচারের শিকার বা উদ্ধারকৃত ব্যক্তিদের গ্রহণ, আশ্রয় বা পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, সেটাই আশ্রয়কেন্দ্র। আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে চোরাচালানের চেষ্টা করলেও তিনি কঠোর দণ্ডের আওতায় আসবেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাখাওয়াত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, উদ্ধার হওয়া নারী বা শিশুকে কোথায় পাঠানো হবে এ নিয়ে অস্পষ্টতার কারণে অনেক সময় পরিবার, এনজিও আর পুলিশের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা দিত।
হারবারিং পালিয়ে বাঁচা হবে কঠিন
শুধু পাচারকারী নয়, লুকিয়ে রাখা, আশ্রয় দেওয়া বা সহায়তাকারীদেরও মূল অপরাধের অংশ হিসেবে ধরা হবে এমনই কঠোর ব্যাখ্যা এসেছে নতুন আইনে। ‘হারবারিং’ বলতে বোঝানো হয়েছে, দেশে কিংবা দেশের বাইরে বিক্রয় বা পাচারের উদ্দেশ্যে কাউকে লুকিয়ে রাখা বা আশ্রয় দেওয়া। এমনকি দণ্ডবিধির ৫২ এ ধারায় হারবার যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটিও এখানে প্রযোজ্য।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চট্টগ্রাম বা টেকনাফে অনেক সময় পাচারের জন্য গৃহপালিত হোস্টেল থাকে। সেখানে পাচারের শিকার নারীদের কয়েকদিন বা সপ্তাহ রেখে পরে বাণিজ্যিকভাবে বিদেশে পাঠানো হয়। আগে মালিক দাবি করতেন ‘আমি পাচারকারী না’। এখন এই উপায় বন্ধ হবে।
ঋণ-দাসত্ব-শোষণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হাতিয়ার
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ঋণের দায়ে নিজের শ্রম দিতে বাধ্য হয়, কিন্তু সেই শ্রমের মূল্য ঋণশোধ হিসেবে গণ্য না হয়, কিংবা সেবার সময়সীমা অনির্দিষ্ট হয়, তাহলে সেটিকে ঋণ-দাসত্ব হিসেবে গণ্য করা হবে। নারী শ্রমিক তানিয়া ইসলাম বলেন, গৃহকর্মী, ইটভাটা, মাছের ঘের অনেক জায়গায় ‘আগে টাকা নিয়ে পরে কাজ করার’ নামে মানুষকে আটকে রাখা হয়।
ইটভাটার একজন সাবেক শ্রমিক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, তাদের বলা হতো, ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত কাজ করতে হবে। কিন্তু বহু বছর ধরে কাজ করেও ঋণ কমত না। এটাই ছিল দাসত্ব।’
জবরদস্তিমূলক ভয় দেখালেই অপরাধ
খসড়া আইনে জবরদস্তিমূলক শ্রম বলতে বোঝানো হয়েছে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, সম্পত্তি বা সুনামের ক্ষতির হুমকি দেখিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে শ্রম বা সেবা গ্রহণ করা। সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে গৃহকর্মীদের পাসপোর্ট কেড়ে রাখে নিয়োগকর্তারা, আর দেশে ফেরার ভয় দেখিয়ে অতিরিক্ত কাজ করায়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সংজ্ঞা, কারণ ভয় দেখানো প্রমাণ করা সাধারণত কঠিন। দাসত্ব-আধুনিক দাসপ্রথার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। নতুন আইনে দাসত্বকে এমন অবস্থায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যেখানে কোনো ব্যক্তি ‘সম্পত্তির মতো নিয়ন্ত্রিত’ হয়।
ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, এটি কেবলই ঐতিহ্যগত দাসত্ব নয়। এখনও যেসব নারী বা শ্রমিককে সীমান্তের ওপারে অপরাধী সিন্ডিকেট ‘অধিকারে’ রাখে তাদের সবই এই সংজ্ঞার আওতায় আসবে।’
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইমেজ উন্নত করতে এই ধরনের সংজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ।
পতিতাবৃত্তি তদন্তে স্পষ্টতা আসবে
খসড়া আইনে ‘পতিতাবৃত্তি’ অর্থ বা কোনো সুবিধার বিনিময়ে কারও যৌন শোষণ বা নিপীড়ন। আর ‘পতিতালয়’ বলতে বোঝানো হয়েছে, যৌন শোষণ পরিচালনার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কোনো বাড়ি বা স্থাপনা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় হোটেল বা স্পার আড়ালে পতিতাবৃত্তি হয়। সংজ্ঞার অস্পষ্টতার কারণে এগুলো ধরতে সমস্যা হতো। এখন যে বাড়িটিতে বাণিজ্যিক যৌন নিপীড়নের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেটি পতিতালয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
নতুন খসড়া সংশোধনীতে ‘দূতাবাস’ বলতে বোঝানো হয়েছে বিদেশে বাংলাদেশের সব ধরনের মিশন, হাইকমিশন, কনস্যুলেট, ভিসা অফিসও এর অন্তর্ভুক্ত।
একীভূত ট্রাইব্যুনাল
বর্তমানে দেশের ৭টি ট্রাইব্যুনালে মানব পাচার মামলার জট ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। বিচারকরা মনে করছেন, নতুন সংজ্ঞার প্রয়োগ হলে অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্য গ্রহণ দ্রুত হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের টিআইপি রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সুপারিশ এবং দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা সব মিলে আইনটি হালনাগাদ করা জরুরি ছিল।