তানভীর হাসান ও নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হয়ে উঠেছে ভয়ংকর এক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে! গড়ে উঠেছে নতুন সিন্ডিকেট। অভিযোগ উঠেছে, এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা জামিনপ্রাপ্তদের ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে নতুন মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় (পেন্ডিং বা শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখিয়ে আদায় করছেন মোটা অঙ্কের টাকা। প্রকারভেদে তা ৫০ হাজার থেকে ঠেকছে লাখের ঘরে। আর এই কারা কর্মকর্তারা এই অপকর্মটি করছেন কারাগারে দায়িত্বরত পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সহায়তায়। দিন শেষে অবৈধ পথে আয়ের টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়ে যাচ্ছে তাদের মধ্যে। সেই সঙ্গে বন্দিদের স্বাভাবিক অধিকারও বিক্রি হচ্ছে টাকার বিনিময়ে। ভালো সিট, ভালো খাবার, স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও মোটা অঙ্কের ঘুষ ছাড়া মিলছে না। একইভাবে জামিনের পর মুক্তিতে বিলম্ব করানো, হাসপাতালে সিট বরাদ্দ নিয়েও চলছে রমরমা বাণিজ্য। এ ছাড়া কারাগারে মাদক ব্যবসা এখন ওপেন সিক্রেট। কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি স্বীকার করলেও প্রতিকারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় নাÑ এমন অভিযোগ কারাগারে আটক বন্দির স্বজনদের।
জানতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) জান্নাত-উল ফরহাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কারারক্ষীদের টাকা দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। তবে সন্ত্রাস দমন আইনের কিছু ধারায় জামিন পাওয়া আসামিদের বিষয়ে এসবি ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিতে হয়। এসবি যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ড করে থাকে তাহলে সেটি তাদের নিজস্ব বিষয়। এখানে কারারক্ষীরা জড়িত না।’
মাদক ব্যবসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি কারাগারে টেনিস বলের ভেতরে মাদক পাওয়া গেছে। আসলে দর্শনার্থী বা বাইরের যে কেউ বল ছুড়ে দিলেই তো কারাগারের ভেতরে তা ঢুকে যায়। সবসময় এসব নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, কারা ফটকে জামিনে মুক্ত আসামিদের কাছে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সদস্য ও কারারক্ষীরা। পেন্ডিং মামলায় ঢুকানোর ভয় দেখিয়ে তারা জামিনে মুক্ত সাধারণ বন্দিদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা আদায় করছে এসবি-কারারক্ষীদের এই চক্র। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বিএনপি-জামায়াত বা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের পর সন্ত্রাস দমন আইনের বিভিন্ন মামলায় কারাগারে পাঠানোর পর সাজার মেয়াদ শেষে কিংবা জামিন লাভের পর এসবি ছাড়াও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তাদের অনেককেই পেন্ডিং মামলায় ফের কারাগারে প্রেরণ কিংবা শ্যোন অ্যারেস্ট দেখাতেন। ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে আওয়ামী সরকারের চালু করা ওপেন সিক্রেট এই বিষয়টিকে পুঁজি করেই নতুন করে এই চাঁদাবাজিতে যুক্ত হয়েছেন এসবির কতিপয় সদস্য।
কারা সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকার আমলেই আইনের কিছু ধারায় আসামিদের পেন্ডিং মামলায় ঢুকানোর পদ্ধতি চালু হয়, যা বাস্তবায়নে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি অলিখিত চুক্তিও করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। চুক্তি অনুযায়ী জামিন পাওয়ার পরও ২৪ ঘণ্টা আসামিদের কারাগারে রাখতে হতো। সেই পদ্ধতি এখনও জারি রেখে বন্দিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন এসবি ও কারা সদস্যরা। একাধিক সূত্র বলছে, জামিনে বের হওয়া সাধারণ আসামিদের কাছে এসবি সদস্যরা ১৫-২০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে পুরনো পেন্ডিং মামলা দেখিয়ে আবার গ্রেপ্তারের হুমকিও দেন।
জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মোহাম্মদ মাসুদ হাসান জুয়েল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পেন্ডিং মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ পুরোপুরি হয়তো অস্বীকার করা যাবে না। কারণ অসাধু ব্যক্তিরা এমন সুযোগ নেবার চেষ্টা করেন। তবে বন্দি বা তাদের স্বজনরা যেন হয়রানির শিকার না হনÑ আমরা সেদিকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কোথাও কোনো অভিযোগ পেলে, তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। কিন্তু এ ধরনের অপকর্ম কে, কোথায়, কখন করছেন এজন্য সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রয়োজন। তাহলে আমরা নজরদারি বাড়াতে পারব।’
সাক্ষাৎ কিংবা জামিন বিলম্ব করিয়ে অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন এ সুযোগ নেই। অন্তত ঢাকা জেলে এসবের সুযোগ নেই। এসবি কিংবা অন্যান্য যেসব ইন্টেলিজেন্স রয়েছে, তাদের আমরা জামিনের সুনির্দিষ্ট সময় জানিয়ে দিই। এক্ষেত্রে অন্তত আমাদের স্টাফরা টাকা-পয়সা লেনদেনের সুযোগটা পান না।’
এদিকে প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর কলাবাগান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ব্যবসায়ী একেএম খোরশেদ আলমকে। এরপর সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে একটি পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এই মামলায় গত ২৩ অক্টোবর হাইকোর্ট থেকে ৬ মাসের জামিন পান খোরশেদ আলম। এরপর জামিনের কাগজ কারাগারে পৌঁছার পর খোরশেদের পরিবারের সদস্যদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন এসবি ও কারারক্ষীরা। তাদের দাবিকৃত দেড় লাখ টাকার মধ্যে ১৫ হাজার দেওয়ার পরও সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়ে কলাবাগান থানার অন্য একটি মামলায় তাকে ফের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই মামলায় ৩ অক্টোবর জামিনের পর ফের শুরু হয় দেন-দরবার। চাহিদামতো টাকা না পাওয়ায় খোরশেদ আলমকে আবারও ধানমন্ডি থানায় আরেক মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ দফায়ও খোরশেদের পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় ১৮ হাজার টাকা। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও ডিএমপি কমিশনার বরাবর ভুক্তভোগীর সন্তান আসিফ ইবনে আলম তিতাস একটি লিখিত অভিযোগ করেন। সেখানে বলা হয়Ñ সর্বশেষ ৩ নভেম্বর জামিনের দিন পুলিশের জিআর শাখার কর্মকর্তা আবুল বাশার বিপি নং : ৮৫০৫১০৬০৩৬ তাদের কাছে ১ লাখ টাকা দাবি করেন। অন্যথায় পুনরায় মামলার হুমকি দেন। আর এই টাকা না দেওয়ার কারণেই খোরশেদ আলমকে ধানমন্ডি থানার অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
কারা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিন গত সপ্তাহে দুই দফা কারাগার এলাকায় অনুসন্ধানে দেখা যায়, জামিননামা পৌঁছার পরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে স্বজনদেন। সাভার থেকে আসা দুই নারী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার জামিন পেলেও তাদের স্বজন পরের দিন বুধবার সন্ধ্যার আগে বের হতে পারেননি। এসবির সদস্য ও কারারক্ষীরা টাকা না পেলে নতুন পেন্ডিং মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে বলে হুমকি দেন। পরে বাধ্য হয়ে তাদের টাকা দিলে মুক্তি পান ভুক্তভোগীর স্বজনরা। মাতুয়াইলের রাসেল নামে এক যুবক জানান, পাথরকাণ্ডের ঘটনায় ডেমরা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ৪ আসামির জামিনের পর শুরু হয় পেন্ডিং মামলার হুমকি। প্রথমে ২০ হাজার টাকা দাবি করলেও পরে ৮ হাজারে রফা হয় এবং এ টাকা দেবার পরই তাদেরকে কারাগার থেকে বের হতে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আদালতের জিআরও সেকশন থেকে কারাগার পর্যন্ত একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রের সদস্যরা জিআরও শাখা থেকে কারাগারে দায়িত্বরত এসবির (পুলিশের বিশেষ শাখা) সদস্যদের জামিনপ্রাপ্তদের তথ্য জানিয়ে দেয়। এরপর জামিনপ্রাপ্ত বন্দির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেন-দরবার শুরু হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে বন্দি আসামিদের নামে নতুন মামলা দায়ের হলে সংশ্লিষ্ট থানা থেকে কোর্টের জিআরও শাখায় মামলার বিষয়ে তথ্য পাঠানো হয়। ওই তথ্য জিআরও সেকশন থেকে পাঠানো হয় কারাগারে। ফলে নতুন মামলা থাকায় কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিকে মুক্তি দিতে পারে না। আর এই সুযোগটিই কাছে লাগাচ্ছেন অসাধু কারা ও পুলিশ সদস্যরা।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) আশীষ বিন হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কারও জামিন হলে আদালত আদেশ জারি করেন। ওই আদেশ জেলগেটে পৌঁছলে সংস্থাগুলো খোঁজ রাখে ওই আসামি অন্য কোনো মামলায় সন্দিগ্ধ বা গ্রেপ্তার আছে কি না। কোর্ট জিআরওদের জানালে তারা রেকর্ড দেখে একটি প্রতিবেদন দেন। পরের দিন বিষয়টি আদালতে ওঠালে আদালত হয়তো গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেনÑ যাকে শ্যোন অ্যারেস্ট বলা হয়। পরের শুনানিতে আবার আদালত চাইলে তাকে জামিনও দিতে পারেন। এটাই প্রক্রিয়া। কিন্তু পেন্ডিং মামলা বলতে কিছু নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব মামলার ভয় দেখিয়ে যদি কেউ টাকা আদায় করেন, এটা পুরোপুরি অনৈতিক। এক্ষেত্রে আইনের দোহাইও দেবার সুযোগ নেই।’ কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে কারাগারের অভ্যন্তরে চলা নানা অনিয়মের বিষয়ে সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পাওয়া একাধিক বন্দি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কারাগারে মাদক বেচাকেনা, বন্দিদের খাবার কমিয়ে বিক্রি করা, টাকার বিনিময়ে কারারক্ষীদের আওয়ামী লীগ নেতাদের তোষামদিসহ নানা অনিয়ম ঘটছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জন্য বিশেষ কক্ষ, টেলিভিশন, ওয়াইফাই, মোবাইল ফোন ও বিশেষ খাবার সার্ভিস বহুদিন ধরেই চালু আছে বলেও জানান কারামুক্তরা। তারা বলেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের পিসি কার্ডে ২-৪ লাখ টাকা জমা থাকার কারণে তারা দৈনিক মোটা অঙ্কের টাকা ব্যয় করেন এবং সবাইকে নিজেদের কাজে খাটান।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষ্য, কারাগারে রাজকীয় কোনো ব্যবস্থা নেই; মোবাইল/ইন্টারনেট সুবিধা কারাগারে কোনো বন্দিই পান না। তবে যার টাকা আছে তিনি ক্যান্টিন থেকে ভালো খাবার কিনতে পারেনÑ এটা বাস্তবতা।
যাদের টাকা আছে, তারা ভালো খাবেন ভালো থাকবেন উল্লেখ করে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক জান্নান-উল ফরহাদ বলেন, ‘কারাগারে মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ নেই। কারণ সেখানে জ্যামার বসানো আছে।’
কারাগার ঘিরে সবচেয়ে বড় অভিযোগ মাদকের ব্যবসা সম্পর্কে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে কারামুক্ত একাধিক বন্দি বলেন, চার পথে কারাগারে মাদক প্রবেশ করছে। এর মধ্যে রয়েছে টেনিস বলের ভেতরে মাদক ঢুকিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ। এ ছাড়া সুইপারদের মাধ্যমে, ময়লার গাড়িতে লুকিয়ে ও বন্দিদের পেটের ভেতরে করে মাদক প্রবেশ করছে। সুইপাররা ময়লা পরিষ্কারের নামে ভেতরে গিয়ে ৪০০-৬০০ টাকায় ইয়াবা বা গাঁজা বিক্রি করেন। বন্দিদের অভিযোগÑ এসবের জন্য কারারক্ষীরাই দায়ী। কারণ তাদের নীরব সম্মতি ছাড়া এমন ব্যবসা অসম্ভব।
এ বিষয়ে সিনিয়র জেল সুপার সুরাইয়া আক্তার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বন্দিদের ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়া হচ্ছে না বিষয়টি এমন নয়, হয়তো কিছুটা হচ্ছে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া তো কাউকে ঢালাওভাবে দায়ী করা যায় না।’ এসবি কিংবা কারারক্ষীদের যারা এসব কাজে জড়িত, তাদের বিষয়ে তথ্য চেয়ে তিনি বলেন, ‘তথ্য পেলেই আমরা ব্যবস্থা নেব। আমাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য দিন।’