ফলোআপ : মামুন হত্যাকাণ্ড
তানভীর হাসান ও নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
পেশাদার কিলার রনি ও ফারুক ওরফে কুত্তা ফারুকের নেতৃত্বে ঢাকার আদালতপাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে খুন করা হয়। এ ঘটনার তদন্তে নেমে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে তদন্ত তদারক সংস্থাগুলো। আদালতপাড়ার বিভিন্ন ভবনের শতাধিক ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাদের এই নামে চিনলেও এটি তাদের আসল নাম কি না তা যাচাই-বাছাই চলছে।
খুনিদের একজন মিরপুর এলাকার, অপরজন পুরান ঢাকার সন্ত্রাসী। তবে তারা কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ ও সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমনকে হুকুমের আসামি ধরে তদন্ত চলছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে তদন্ত তদারক একটি সূত্রের দাবি, এরই মধ্যে দুই খুনিকে গোয়েন্দা জালে নেওয়া হয়েছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও মোটরসাইকেল উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। আজ বুধবার এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাতে পারে একটি সংস্থা। অপরদিকে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি। এরই মধ্যে রবিবার রাতেই মামুনের মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদরের মোবারক কলোনিতে দাফন করা হয়। সেখান থেকে ফেরার পর মামলা দায়ের করা হবে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দুই খুনিকে শনাক্ত করা গেছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যেই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে পুরান ঢাকা এলাকার শতাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে খুনিদের সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া গেছে। এখন খুনিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে এর নেপথ্যে কারা আছে তা বেরিয়ে আসবে।
জানা গেছে, এর আগে ২০২৩ সালেও মামুনকে একবার গুলি করা হয়। কিন্তু তখন তিনি প্রাণে বেঁচে যান। সে সময় হুকুমের আসামি হিসেবে অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের নাম সামনে আসে। কিন্তু এবার খুনিরা মিশন সাকসেস করে। তবে এবার অভিযোগ উঠেছে, ভাই টিপু হত্যার প্রতিশোধ নিতে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ। এমন পরিস্থিতিতে আলোচিত দুটি বিষয় প্রাধান্য দিয়েই তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। যদিও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ করেনি। রহস্যজনক কারণে মামুনের পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে কথা বলতেও রাজি নন। যদিও আফতাবনগরে তার প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, শোকাহত হওয়ায় হয়তো কথা বলতে চাইছেন না।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিপু হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জোসেফ ও তার ভাই হারীছের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ছিল মামুনের। ওই হত্যাকাণ্ডের ‘প্রতিশোধ’ নিতেই জোসেফের পরিকল্পনা ও নির্দেশে খুন হয়ে থাকতে পারেন মামুনÑ এমনটা ধারণা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। টিপু হত্যার পর যোসেফের চলাফেরা, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাম্প্রতিক সময়ের গতিবিধিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তদন্ত তদারক একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এরই মধ্যে রনি ও ফারুক ওরফে কুত্তা ফারুককে হেফাজতে নিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের নাম রনি ও ফারুক বলে দাবি করা হলেও এর আড়ালে অন্য কোনো নাম আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। খুন করার পর তারা ঢাকার পার্শ্ববর্তী একটি সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টার আগেই তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে গতকাল রাতে গোয়েন্দা কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই দুজন (রনি ও ফারুক) লম্বু ইব্রাহিম ও কামাল ওরফে কিলার কামাল নামেও পরিচিত।
ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে তদন্ত শুরু হলেও এখনও বলার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি। সন্দেহের তীর জোসেফ ও ইমনের দিকে হলেও শুটাররা শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার ন্যাশনাল হাসপাতালের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ঘটনাস্থলটি এখনও চারদিক থেকে ঘিরে রাখা হয়েছে। সেখানে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা এ নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তারা বলেছেন, ঘটনার সময় যিনি ডিউটিতে ছিলেন, তাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। পাশে ডিউটিতে যারা ছিলেন, তাদেরও এ বিষয়ে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে একটি ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি ইমরান হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আদালত থেকে বেরিয়ে হাসপাতালের সামনের রাস্তায় ডাব খাচ্ছিলেন মামুন। ওই সময়ই তাকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলি ছোড়া হয়। যার একটি গুলি তার হাতে লাগে। এ অবস্থায়ও দৌড়ে হাসপাতালের ভেতর ঢোকেন তিনি। ভেতরে ঢুকতেই হাসপাতালের ওপরের একটি কাচে গুলি ছুড়ে সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় তারা। এ সময় হাসপাতালের রাস্তায় পড়ে যান মামুন। তখনই তাকে লক্ষ্য করে দুই থেকে তিনটি গুলি ছোড়া হয়। গুলিগুলো তার ঘাড়ে, বুকে ও কানের নিচে লাগে। আমরা ভেতর থেকে দৌড়ে এসে তাকে হাসপাতালে নিই। কিন্তু এখানে চিকিৎসক না থাকায় ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালের সামনের ফুটপাতে বসা হকাররাও কথা বলতে রাজি হননি। হাসপাতাল গেটের ডানপাশের চায়ের দোকানি বলেছেন, ঘটনার পরপরই সবাই কথা বললেও এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্ব জানার পর কেউই কথা বলছেন না। তিনিও বলেন, আমিও কিছু দেখিনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘাতকরা পালিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, ন্যাশনাল হাসপাতালের ঠিক বিপরীতেই আদালত এলাকার পুলিশ সদস্যরাও মুখে কুলুপ এঁটেছেন। গতকাল দায়িত্বে থাকা একাধিক সদস্য এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
স্বজনদেরও মুখ বন্ধ
ঘটনার দিন সোমবার রাতে মামুনের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে শোকাহত হওয়ার কথা জানিয়ে তারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। পরিবার চাইছে পুলিশ দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করুক, তবে তারা গণমাধ্যম বা বাইরের কারও সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী নন। গতকাল মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও দিনভর পরিবারের প্রায় সব সদস্যের ফোনই ছিল বন্ধ।