× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রশ্নফাঁসের মামলা

আবেদের ফাইল হিমাগারে

তানভীর হাসান

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:৪১ পিএম

আবেদের ফাইল হিমাগারে

প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আলোচিত চরিত্র আবেদ আলীর মামলা তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দায়েরকৃত এই মামলার প্রধান আসামি আবেদ আলী ছাড়া বাকি ১৭ আসামি জামিন নিলেও তা বাতিলেরও আবেদন করা হয়নি। আর এই সুযোগে দেশ ছেড়েছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত। ফলে মামলার বর্তমান কার্যক্রমের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। 

২৫ বিসিএসের অনেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, সরকারের পুলিশ ও অ্যাডমিন ক্যাডারের অনেকে এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। যাদের সবাই আবেদ আলীর ক্যাডার হিসেবে চেনেন। এ কারণে আগামীতে তাদের প্রভাবেই এই মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

এদিকে সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার পদের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ২০১৪ সালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় দায়েরকৃত মামলাটি সিএসএম আদালত থেকে বিচারিক পর্যায় এলে তা আমলি আদালতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে মামলাটি এজাহার সঠিকভাবে হয়নি। ফলে ওই মামলা থেকেও আবেদ আলী গংয়ের পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চলতি মাসের শুরুতে মামলাটি বিচারসংশ্লিষ্ট আদালতবহির্ভূত হওয়ায় তা আমলি আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনে বিচার করার সুযোগ নেই। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি সাইবার ক্রাইম) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন কুমার সাহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ৫ আগস্টের পর তিনি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন। এই মামলায় জামিনে থাকা ১৭ আসামির বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আদালতে জামিন বাতিলের আবেদন করা হবে। 

জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির ঘটনায় সৈয়দ আবেদ আলীসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। পরে তার কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সিআইডির পাশাপাশি অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। কিন্তু বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতার কারণে সেই আলোচিত ঘটনা আড়ালে চলে যায়। তবে তদন্তের শুরুতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত সাতটি চক্র শনাক্ত করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সে সময় সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের তৎকালীন উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) নিপ্পন চন্দ্র চন্দ গত বছরের জুলাই মাসে ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছিলেন। এদের মধ্যে ১৭ জনকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। বাকি ১৪ জন পলাতক। বর্তমানে আবেদ আলী ছাড়া বাকি সবাই জামিনে মুক্ত। 

আটককৃতরা পুলিশকে জানিয়েছে, তারা ৩৩তম বিসিএস থেকে সর্বশেষ ৪৫তম বিসিএস পরীক্ষাসহ নন-ক্যাডার নিয়োগের একাধিক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস করেছেন। এই চক্রটি ২০০২ সালেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। ওই সময় ব্যপক আলোচনায় আসে ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ বিসিএসের এর প্রশ্ন ফাসের ঘটনা। বিষয়গুলো ২০২৪ সালের মামলায় তদন্তে উঠে আসে। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তারা, এই চক্রের সঙ্গে কারা কারা জড়িত, কীভাবে তারা প্রশ্ন ফাঁস করত, কারা কীভাবে প্রশ্ন সংগ্রহ করতÑ এমন তথ্য জানার চেষ্টা করেন । 

মামলার সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে চক্রটি মোট কত অর্থ লেনদেন করেছে, লেনদেনকৃত অর্থের সুবিধাভোগীদের শনাক্তকরণ, মামলার আলামত জব্দকরণ নিয়ে কাজ করে সিআইডির সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগ। তবে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর মামলার তদন্ত কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই । 

এই মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেনÑ পিএসসির উপ-পরিচালক আবু জাফর, উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী পরিচালক আলমগীর কবির, অডিটর প্রিয়নাথ রায়, ডেসপাস রাইডার খলিলুর রহমান, অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম ও অবসরপ্রাপ্ত ড্রাইভার সৈয়দ আবেদ আলী। পিএসসির বাইরে নারায়ণগঞ্জের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের নিরাপত্তা প্রহরী শাহাদাত হোসেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মেডিকেল টেকনিশিয়ান নিয়ামুন হাসান, নোমান সিদ্দিকী, আবু সোলায়মান মো. সোহেল, জাহিদুল ইসলাম, মামুনুর রশীদ, সাখাওয়াত হোসেন, সায়েম হোসেন, লিটন সরকার ও সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামকেও তখন আটক করা হয়। 

এদিকে মামলার তদন্ত করতে ১৭ ডিসেম্বর রাজধানীর আগারগাঁও থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মোহাম্মদ আব্দুল আজিম ও রুপম চন্দ্র দাশকে। গেল বছরের ২৬ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে মজনু মিয়া (৫৮) নামের আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তার তথ্যের ভিত্তিতে আকরাম হোসেন নামের আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় । 

তার দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, সে বিগত বছরগুলোতে বিশেষ করে বিসিএস ২০১২-২০১৭ প্রিলিসহ পিএসসির বিভিন্ন গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের পূর্বে প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয় বলে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া মোস্তফা ও হামিদুল তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জানিয়েছেন। তারা ২০১৪ সালে শেরেবাংলা থানায় দায়ের করা আরেকটি মামলার আসামি। 

আবেদ আলী আলোচনায় আসেন ২০১৪ সালে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়ের নন-ক্যাডার গোপনীয় শাখার সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেছিলেন। তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ৩০ আগস্ট তৎকালীন শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক শরীফ রফিকুল ইসলাম সৈয়দ আবেদ আলীসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর চাকরি হতে অপসারণ করা হয়। 

মামলার নথি অনুযায়ী ২০১৪ সালের ২২ এপ্রিল পিএসসির নিজস্ব ভবনে সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার পদের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাজশাহীর মতিহারে বাড়ি পরীক্ষার্থী আব্দুর রহমান শাহিনকে লিখিত পরীক্ষার জন্য বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান ও টেকনিক্যাল বিষয়ের চারটি খাতা প্রদান করা হয়। তখন ওই পরীক্ষার্থী জানান, পরীক্ষা চলার দুই ঘণ্টা পর কেয়ারটেকার তারেক তাকে লিখিত উত্তরসহ এসব খাতা দেন। এদিকে চলতি মাসের শুরুতে মামলাটির বিচার সংশ্লিষ্ট আদালতবহির্ভূত হওয়ায় তা পাঠানো হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনে বিচার করার সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে মামলাটির বিচার শুরু হয়েছিল। অভিযোগ গঠন শুনানিতে সতর্ক থাকলে ১১ বছর পর মামলাটি রায়ের পর্যায় থেকে ফেরত যেত না।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৮ জুলাই আবেদ আলী ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করেছিলেন সিআইডির উপপরিদর্শক নিপ্পন চন্দ্র দাস। এই মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামি মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে বলেন ‘তার বড় ভাই আতিকুল ইসলাম ২০০২ সালের পর থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত হয়। বিশেষ করে তার একমাত্র মামা দোদুল মাস্টারের শ্যালক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মাহফুজুর রহমান যখন পিএসসির সদস্য নির্বাচিত হন, তখন থেকে তিনি চাকরির পরীক্ষার জন্য নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াত শুরু করেন এবং বিজি প্রেস ও পিএসসিকেন্দ্রিক একটি চক্রের সন্ধান পান।

মামলার নথি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, পুরোপুরি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় ২৫তম বিসিএসে। এক/এগারো সরকার বিষয়টি নিয়ে কাজ করার আগেই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। ওই সময় পিএসসির মেম্বার ছিলেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মাহফুজুর রহমান। আর তার ড্রাইভার ছিলেন সৈয়দ আবেদ আলী। তার নেতৃত্বে একটি গ্রুপ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির প্রশ্ন ও উত্তরপত্র সরবরাহ করতেন। ২৫তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়া পাঁচজনের কাস্টমার জোগাড় করে দেওয়ার দায়িত্বে ছিল। ২০০৯ সালে পিএসসির সদস্য অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান ১৩ বছরের সাজা দেন ঢাকার ঢাকা মহানগর বিশেষ জজ আদালত। এরপর আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে জামিনে বের হয়ে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। সরকার পরিবর্তনের পর আবেদ আলী চক্রের মামলার তদন্ত কার্যক্রমে স্থবিরতা আসে। 

সূত্রমতে, প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে বিসিএসসহ বিভিন্ন নিয়োগে নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা তৈরি কাজ শুরু করা হলেও সেই প্রক্রিয়াও বন্ধ করা হয়েছে অজানা হাতের ইশারায়। সর্বশেষ ৭ অক্টোবর আনিসুর রহমান নামের এক ব্যক্তিকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। আর চলতি বছরের ৩০ জুলাই আলোচিত আবেদ আলীর প্রশ্নফাঁস মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জুয়েল চাকমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা