শাহরিয়ার জামান দীপ
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১০:০০ এএম
গত ২ অক্টোবর রাতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য আসে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসছে মাদকের একটি বড় চালান। ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের একটি বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসে অভিযান পরিচালনা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। অভিযানে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও কয়েক হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। যদিও কুরিয়ারটিতে বিদেশি ওষুধ ছিল বলে বলা হয়েছিল। এর সঙ্গে জড়িত ১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে চালানটি ঢাকায় এসেছে। ঢাকার মোহাম্মদপুর, গুলশান এবং বনানীর কিছু জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল এই চালানটির।
কয়েকদিন আগে রাজধানীর টঙ্গী থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ইতালিতে পাচারের সময় সাড়ে ছয় কেজি ভয়ংকর মাদক কিটামিন জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সেখানেও বলা হয়েছিল, বিদেশি চকলেট আছে কুরিয়ারটিতে। এভাবেই মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রাজধানীতে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আসছে মাদক। শুধু তাই নয়, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিদেশেও মাদক পাচার হচ্ছে, তেমনি একইভাবে বিদেশ থেকেও দেশে মাদক আসছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ঝুঁকি কম হওয়ায় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করছেন কারবারিরা। এখানে তারা সঠিক নাম এবং ঠিকানা ব্যবহার করছে না। কাট আউট পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অর্থাৎ যিনি মাদক পাঠাচ্ছেন তার সঙ্গে যিনি গ্রহণ করছেন তার যেমন কোনো যোগাযোগ নেই তেমনি গ্রহণ করার পর মাদকগুলো কোথায় যাবে তাও জানেন না গ্রহণকারী। এ কারণে গ্রহণকারীকে গ্রেপ্তার করা গেলেও মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ডিএনসি মহাপরিচালক হাসান মারুফ জানান, দীর্ঘদিন ধরেই কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে পাচার কার্যক্রম চালাচ্ছে মাদক চক্র। এ বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অস্বাভাবিক ওজন এবং সন্দেহজনক কিছু মনে হলেই কুরিয়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে বলা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সহায়তায়ও করছে তারা। এই চক্রের সদস্যরা বিদেশে অবস্থান করে স্থানীয় সদস্যদের দিয়ে কাজ করাচ্ছে।
সর্বশেষ এমডিএমএ, কিটামিন, ব্ল্যাক কোকন, এলএসডিসহ যেসব নতুন মাদক দেশে এসেছে সবই আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের মাধ্যমে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মাদক পাচার হচ্ছে। বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী মাদক চক্রে জড়িয়ে দেশি-বিদেশি পাচারকারীদের সহায়তা করছেন। এ ছাড়াও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মাদক বিক্রয়ের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যেসব গ্রাহক মাদক অর্ডার করে থাকে তাদেরকেও কুরিয়ারের মাধ্যমে ডেলিভারি দেওয়া হয়। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ডেলিভারি হয় ইয়াবার। এরপর রয়েছে মদসহ অন্যান্য মাদক।
কুরিয়ার সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (সিএসএবি) সভাপতি এবং সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের স্বত্বাধিকারী হাফিজুর রহমান পুলক বলেন, যারা নিয়ম মেনে কুরিয়ার সার্ভিস পরিচালনা করছেন, তারা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা মেনেই কাজ করছেন। মাদক পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের ধরিয়েও দেওয়া হচ্ছে। আগের থেকে কুরিয়ার সার্ভিসে মাদকের ডেলিভারি অনেক কমে এসেছে। প্রত্যেকটি পণ্যের চেকিং বাড়ানোর পাশাপাশি সিটিটিভি মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া কোনো পণ্য সন্দেহজনক মনে হলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বেশিরভাগ মাদকই আসে বাইরের দেশ থেকে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য মাধ্যম থেকে কুরিয়ার সার্ভিসকে নিরাপদ মনে করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। সে কারণে কুরিয়ারে মাদক ডেলিভারি বেড়েছে। এই সমস্যার সমাধান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একার পক্ষে সম্ভব না। এগিয়ে আসতে হবে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও।