ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৪৫ এএম
জুয়াড়িদের জন্য দুঃসংবাদ। জুয়া খেলার শাস্তি হিসেবে অনেক গুণে বাড়ছে জেল-জরিমানা। শিগগিরই আসছে সংশোধিত নববিধান। দেড়শ বছরের পুরনো ‘দ্য গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট ১৮৬৭’ বা ‘বঙ্গীয় প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭’ বাতিল করে হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রচলিত আইনে অপরাধীর শাস্তি একেবারেই কম। ফলে আইনটি যুগোপযোগী করে অধ্যাদেশ হিসেবে জারির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে অনলাইন জুয়াকে। ইতোমধ্যে অধ্যাদেশের খসড়া ভেটিংয়ের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ে। ভেটিং শেষে শিগগিরই অনুমোদনের জন্য তোলা হবে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে।
জানা গেছে, নতুন অধ্যাদেশে শাস্তির পরিমাণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই হাজার গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। অনলাইন অ্যাপ ও সাইটে পরিচালিত জুয়ার জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পুরনো আইনে অনলাইন জুয়ার প্রসঙ্গ ছিল না।
ব্রিটিশ আমলে তৈরি আইনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল মেলা, আসর বা প্রকাশ্য জায়গায় জুয়ার আসর বন্ধ করা। কিন্তু বর্তমানে জুয়ার ধরন পাল্টেছে। এখন জুয়া প্রবেশ করেছে অনলাইন বেটিং, ক্যাসিনো সংস্কৃতি, মোবাইলভিত্তিক অ্যাপস, আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটেসহ ডিজিটাল জগতে। বঙ্গীয় প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭’-এর ধারা ৩-এ সর্বোচ্চ শাস্তি তিন মাস কারাদণ্ড অথবা ২০০ (দুশ) টাকা অর্থদণ্ড, ধারা-৪ অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি এক মাস কারাদণ্ড অথবা ১০০ (একশ) টাকা অর্থদণ্ড এবং ধারা-১১ অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি এক মাস কারাদণ্ডসহ ৫০ টাকা অর্থদণ্ড করার বিধান ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যা বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে নতুন খসড়ায় তা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা ৬ মাসের কারাদণ্ড করা হচ্ছে। এ ছাড়াও অনলাইন প্লাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণ ও সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচি সংযুক্ত করে নতুন ‘জুয়া আইন, ২০২৫’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খসড়াটি অনুমোদনের জন্য আগামী উপদেষ্টা পরিষদে উত্থাপন হতে পারে। এটি অনুমোদন পেলে অধ্যাদেশ আকারে জারি হবে।
এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আইনটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। অনলাইন গেমস বা বেটিং সাইটের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে গেলে ফাঁক থেকে যেত। এ কারণেই নতুন আইনের প্রয়োজন।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইন ও বিধি শাখার এক পরামর্শকের মাধ্যমে নতুন আইনের খসড়া প্রস্তুত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০২৪ সালের ৬ মে খসড়াটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়। গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ২৫ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চিঠি দিয়ে খসড়াটি অধ্যাদেশ আকারে প্রেরণের অনুরোধ জানানোর পর ১ জুন ২০২৫ খসড়াটি আবার পাঠানো হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খসড়া আইনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা যুগোপযোগী করা হয়েছে। পুরনো আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে। জানা যায়, প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ‘নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ’ অথবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জুয়া, অনলাইন জুয়া বা পাতানো খেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরের বা বাইরের যেকোনো ওয়েবসাইট, অ্যাপ্লিকেশন বা অন্য কোনো অনলাইন প্লাটফরম অথবা কোনো বিজ্ঞাপন বা প্রচারমূলক বিষয়ের প্রচার বন্ধ বা নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দিতে পারবে।
অধ্যাদেশে বলা আছে, কেউ ‘আর্থিক ঝুঁকিপূর্ণ খেলার’ অপরাধ করলে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে কেউ ঘোড়দৌড় বা ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াইজাতীয় আয়োজন করলে প্রাণিকল্যাণ আইন অনুযায়ী তাকে অনধিক ৬ মাসের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। ‘দূরবর্তী জুয়া’ ও ‘অনলাইন জুয়ার’ অপরাধে অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বাজি ধরার অপরাধে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান করেছে সরকার। পাতানো খেলা বা ম্যাচ ফিক্সিং এবং ‘স্পট ফিক্সিংয়ের’ অপরাধ করলে অনধিক ৩ তিন বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
কোনো ব্যক্তি লটারির অপরাধ করলে অনধিক ২ বছরের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। লটারির শর্ত ভঙ্গ করলে অনধিক ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান থাকছে অধ্যাদেশে। হাউজি খেলা কিংবা আয়োজন করলে অনধিক ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ। আর হাউজির শর্তভঙ্গে অনধিক ৩ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড গুনতে হবে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘১৮৬৭ সালের আইনে ডিজিটাল অপরাধের উল্লেখ না থাকায় অনলাইন জুয়ার বিষয়ে তা প্রয়োগের সুযোগ ছিল না। নতুন আইনে অনলাইন বেটিং, ক্যাসিনো ব্যবসা ও অ্যাপভিত্তিক জুয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। শুধু আইনের খসড়া করাই যথেষ্ট নয়। আদালত, পুলিশ, টেলিযোগাযোগ খাত ও পরিবার সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
জুয়া শুধু অর্থ হারানোর খেলা নয়, এটি সমাজের জন্যও এক বড় হুমকি উল্লেখ করে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ আবু তোহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুয়ার কারণে পরিবারে কলহ, বিচ্ছেদ, সন্তানের অবহেলা বাড়ছে। অনলাইন বেটিংয়ে জড়িয়ে অর্থের অভাবে তরুণদের কেউ কেউ চুরি, প্রতারণা বা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ও কর্মজীবী তরুণদের মধ্যে আসক্তি বাড়ছে।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নতুন আইনে শুধু দমন নয়, প্রতিরোধও যুক্ত হচ্ছে। তরুণদের সচেতন করতে সামাজিক প্রচারণা ও পরিবারভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।’