সাইফ বাবলু
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:১৯ পিএম
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ছত্রছায়ায় ঢাকায় হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যমে অর্থ পাচার এবং স্বর্ণ চোরাচালান চক্র গড়ে ওঠে। ২০১৭ সাল থেকে এ চক্রটি স্বর্ণ চোরাচালানের পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাইরে হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে। ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমত্যাচুত হওয়ার পর শেখ সেলিম পালিয়ে গেলেও বহাল তবিয়তে অর্থ পাচার ও স্বর্ণ চোরচালান অব্যাহত রেখেছে শেখ সেলিমের নিয়ন্ত্রণাধীন চক্রটি।
এই চক্রের প্রধান হিসেবে কাজ করছে গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা মনীন্দ্র নাথ বিশ্বাস নামের স্বর্ণ ব্যবসায়ী। প্রতারণার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক নাগরিকের পৌনে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মামলা করার পর তদন্তে নেমে এমন চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডি জানিয়েছে রাজধানীর তাতি বাজারে মনীন্দ্র নাথের চোরাই স্বর্ণ কেনা বেচার চেম্বার (ব্যবসা প্রতিষ্ঠান) রয়েছে। সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ স্বর্ণ কেনাবেচার অন্তরালে মনীন্দ্র নাথের নেটওয়ার্কে অন্তত ১০ থেকে ১২ জন হুন্ডি ব্যবসায়ী সক্রিয় রয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার থেকে এ চক্র অবৈধ স্বর্ণ ক্রয় করার ব্যবসা শুরু করে। এসব স্বর্ণ তাঁতীবাজারে মনীন্দ্র নাথের কারখানায় গলিয়ে বার (বিস্কুট আকৃতি) করে সেগুলো সাতক্ষীরার সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করে। চক্রের দলনেতা মনীন্দ্র নাথ আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শেখ সেলিমের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিষয়টি জানলেও কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, বলছে, গোলাপগঞ্জে বাড়ি হওয়ায় এবং শেখ সেলিমের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে মনীন্দ্র নাথ শুধু স্বর্ণ পাচারের নেটওয়ার্কই গড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবসার অন্তরালে হুন্ডি করে অর্থ পাচারকারী চক্রের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এ চক্র যুক্তরাষ্ট থেকে ২ বছর আগে এক মার্কিন নাগরিকের পৌনে ৩ কোটি টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়। ওই ঘটনায় তখন অভিযোগ করা হলেও শেখ সেলিমের প্রভাবের কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। তবে দুই বছর পর অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা সিআইডির এসআই এসআই মো. মাজহারুল ইসলাম বাদী একটি মামলা করেন।
সিআইডি জানিয়েছে, কথিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী মনীন্দ্র নাথের নামে অস্তিত্বহীন কিছু ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ৯০টি ব্যাংক হিসাবের অস্তিত্ব পেয়েছে সিআইডি। আর এসব ব্যাংক হিসাবে ৬০৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকারও বেশি পাচারের প্রমাণ পেয়েছে। পাশাপাশি দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থেকে অবৈধভাবে আসা বিপুল পরিমাণ চোরাই স্বর্ণ সংগ্রহ করে সেগুলো কারখানায় গলিয়ে ভারতে পাচারেরও তথ্য মিলেছে। এ ঘটনায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর মনীন্দ্র নাথসহ ৬ জনের নামে একটি মামলা হয়েছে।
সিআইডির পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের সঙ্গে আর্থিক প্রতারণা, হুন্ডি কার্যক্রম পরিচালনা ও স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে প্রায় ৬০৮ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে ৬ ব্যক্তির নামে মামলা হয়। অভিযুক্তরা হলেন- মনীন্দ্র নাথ বিশ্বাস, ওয়াহিদুজ্জামান, মো. গোলাম সারওয়ার আজাদ, মো. তরিকুল ইসলাম ওরফে রিপন ফকির, রাজীব সরদার এবং উজ্জ্বল কুমার সাধু। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাত আরও ৭ থেকে ৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি।
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ডেবোরাহ জনস্টন রামলোর এক নারীর কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ২ লাখ ২২ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ২ কোটি ৭০ লাখ ১৬ হাজার ৩৫১ টাকা হাতিয়ে নেয়। ওই নারী ঘটনাটি এফবিআইকে জানালে তারা বিষয়টি বাংলাদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসকে অবগত করে। এরপর ওই নারীর কাছ থেকে নেওয়া অর্থ মনীন্দ্র নাথের ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার প্রমাণ মেলে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইউ) মাধ্যমে জানার পর অনুসন্ধানের জন্য সিআইডির কাছে পাঠানো হয়। পরে সিআইডি এই ঘটনায় মামলা করে। তবে আসামিদের গ্রেপ্তার করা যায়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বর্ণ চোরাচালন ও হুন্ডি ব্যবসার কারণে মনীন্দ্র নাথসহ আসামিদের যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত ছিল। তারা কোকারিজসহ বিভিন্ন সামগ্রী আমদানিকারক পরিচয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও মূল বিষয় ছিল অর্থ পাচার। হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার করতে গিয়ে মার্কিন নাগরিক ডেবোরাহ জনস্টনের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। ওই মার্কিন নাগরিক নিজেও হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে ২ বছর আগে মনীন্দ্র নাথ ও তার সহযোগীরা ২ কোটি ৭০ লাখ ১৬ হাজার টাকা নেয়। বাংলাদেশে আসার পর টাকা আর ফেরত না দিয়ে আত্মসাৎ করে। এরপর ওই নারী তাদের দেশে এ ঘটনায় এফবিআইয়ের কাছে অভিযোগ করে। এফবিআইয়ের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে তাদের প্রতারণার প্রমাণ মেলে।
সূত্র জানিয়েছে, এ অভিযোগের অনুসন্ধান করতে গিয়ে সিআইডি মনীন্দ্র নাথের ৯০টি ব্যাংক হিসাব পায়। পাশাপাশি তার সহযোগী ও মামলার আসামিদেরও একাধিক ব্যাংক হিসাব পাওয়া যায়। এর মধ্যে মনীন্দ্র নাথের ব্যাংক হিসাবে হুন্ডির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অর্থ লেনদেন হয়েছে। মনীন্দ্র নাথ তার সহযোগীদের নামে বেনামে ব্যাংক হিসাবে খুলে ওইসব হিসাবে অর্থ পাচার করত।
সিআইডি জানিয়েছে, প্রতারণা ও হুন্ডি কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে অভিযুক্তদের নামসর্বস্ব আইনক্স ফ্যাশন, ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ, জামান এন্টারপ্রাইজ ও নোহা এন্টারপ্রাইজ নামে ব্যাংক হিসেবে খোলার প্রমাণ মিলেছে। সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, স্বর্ণ চোরাচালান ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির গড়ে তোলেন মনীন্দ্র নাথ বিশ্বাস। তার সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পাশাপাশি শেখ সেলিমের সঙ্গে মনীন্দ্র নাথের যোগসূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।