তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৬ এএম
দালাল না ধরলে মিলছে না যশোর টিটিসি সেন্টারের তাকামুল সনদ। দালালকে মোটা অঙ্কের টাকা দিলেই পাওয়া যায় তাকামুল সনদ। আর যদি কেউ দালাল না ধরে পরীক্ষা দেন, তাহলে তিনি পাস করতে পারবেন না। নির্ঘাত তিনি ফেল করবেন। ফলে সনদ না মেলায় সৌদিগামী শ্রমিকদের অপেক্ষায় থাকতে হয় মাসের পর মাস।
সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, যশোর টিটিসির জব রিপ্লেসমেন্ট রুমে ইন্সট্রাক্টর মামুনুর রশিদ ও জব রিপ্লেসমেন্ট দেলোয়ার হোসেন নামে টিটিসি সেন্টারের দুই কর্মকর্তা দালালদের মাধ্যমে পাওয়া টাকার ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত। রুমে ঢুকায় তারা টাকা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন।
এর কিছু সময় পর মামুনুর রশিদকে পরীক্ষা কেন্দ্রের কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। টাকা লেনদেনের ব্যাপারে ইন্সট্রাক্টর মামুনুর রশিদের মোবাইল ফোনে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
টাকা লেনদেনের বিষয়ে জব রিপ্লেসমেন্ট অফিসার দেলোয়ার হোসেনের কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘তাকামুল সনদ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। এটা মামুনুর রশিদ সাহেব ভালো বলতে পারবেন।’
মনিরামপুর থেকে যশোর টিটিসিতে পরীক্ষা দিতে আসা বিদেশগামী শ্রমিক ইমন বলেন, আমি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছি। আমি এর আগে ৫০০ ডলারের বিনিময়ে রেজিস্ট্রেশন করে দুবার পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু প্রতিবারই আমাকে ফেল দেখানো হয়েছে। এবার ট্রাভেলস এজেন্সির মাধ্যমে তাকামুল সনদের জন্য ২৫ হাজার টাকা চুক্তিতে পরীক্ষা দিয়েছি। তাই পাস করেছি। অথচ এর আগের দুবার ভালো পরীক্ষা দিয়েও পাস করতে পারিনি। কিন্তু এবার খারাপ পরীক্ষা দিয়েও পাস করলাম।
যশোর নিউমার্কেট এলাকার প্রান্ত নামে এক পরীক্ষার্থী বলেন, দালাল ছাড়া এখানে কেউই পাস করে না। যারা কম্পিউটারের মাউস একটু ধরতে পারেন, তারা কম্পিউটারে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর অনায়াস দিতে পারেন। আর বাকি সব প্র্যাকটিক্যালে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
দালাল না ধরে আসা পরীক্ষার্থীদের প্র্যাকটিক্যালে উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে ঘাবড়ে দেওয়া হয়। আর এসব স্ক্রিনশট ‘ব্যাড’ লিখে তারা সৌদিতে পাঠান এবং তাদের ওয়েবসাইটে ফেল দেখানো হয়। আর যারা কিছুই পারেন না। কিন্তু দালাল ধরে পরীক্ষা দিতে আসেন, তাদের পাস নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। সৌদিতে তাদের স্ক্রিনশট ‘গুড’ বলে পাঠিয়ে দেন প্রশিক্ষকরা।
এতে অদক্ষ শ্রমিকরা সহজে তাকামুল সনদ পেয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে দক্ষ ও শিক্ষিত শ্রমিকরা সনদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নড়াইল থেকে আসা আব্দুল আল মামুন বলেন, এখানে সবকিছু দালালের মাধ্যমে কাজ হয়। দালাল না ধরলে কেউ পাস করেন না। অনেকে আছে নিজের নাম সই করতে পারেন না। এমনকি কম্পিউটারের মাউস জীবনে কখনও ধরেননি। তারা পাস করে যাচ্ছেন। অথচ দক্ষ ও শিক্ষিতরা ফেল করছেন। আসলে পাস ও ফেল নির্ভর করছে দালালের ওপর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২৫ সাল থেকে যশোর, খুলনাসহ দেশের বিভাগীয় শহরে টিটিসি সেন্টারগুলোয় ১২৫ মার্কের তাকামুল পরীক্ষার প্রশ্ন ৩টি ধাপে বিভক্ত হয়ে থাকে। যেমনÑ কম্পিউটার টেস্ট, প্র্যাকটিক্যাল টেস্ট এবং ভাইভা। অনলাইনে (১৫×২=৩০) ১৫টি প্রশ্ন থাকে, তার মধ্যে কমপক্ষে পাঁচটি প্রশ্ন কম্পিউটার মাউসের মাধ্যমে টিক দিয়ে ১০ নম্বার পেলেই পাস। বাকিগুলোর উত্তর সঠিক না হলেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। অনলাইনে হওয়ায় শুধু এই ১০ নাম্বার সৌদি কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে। আর বাকি ১১৫ নম্বার টিটিসি সেন্টারের প্রশিক্ষকদের হাতে রয়েছে। তাই চাইলেই যেকোনো বিদেশগামী শ্রমিককে পাশ অথবা ফেল অনায়াসেই সম্ভব।
বিদেশগামী শ্রমিকরা দালাল ছাড়া অনায়াসে কম্পিউটার টেস্টে উত্তীর্ণ হলেও প্র্যাকটিক্যাল ও ভাইভা টেস্টের তাদের জোর করে ফেল দেখানো হয়।
এ বিষয়ে যশোর টিটিসির অধ্যক্ষ গাজী ইকফাত হোসেনে বলেন, এসব অনিয়ম আমি একা রুখতে পারব না। এরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক এসব কাজে জড়িত। আগেই আমি এ ব্যাপারে সতর্ক করেছি। যদি সংবাদ মাধ্যম আমার পাশে থাকে, আশা করি এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি সৌদি আরবের শ্রমবাজারে ঢুকার ক্ষেত্রে দেশটির সরকার বিদেশি শ্রমিকদের জন্য ‘তাকামুল’ বা স্কিল সার্টিফিকেশন সনদ বাধ্যতামূলক করেছে। এখন শুধু পাসপোর্ট আর মেডিকেল রির্পোটই যথেষ্ট নয়। ‘তাকামুল’ নামের এ পেশাগত দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় পাস করাটা বাধ্যতামূলক। এই পরীক্ষায় পাস না করলে ভিসা বাতিল ও চাকরি দুটোই বাতিল হতে পারে। ফলে এ নিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে নতুন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এ সনদ ছাড়া এখন সৌদি আরবে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। আর এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছেন যশোরসহ দেশের প্রতিটি টিটিসি সেন্টারের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
যশোর টিটিসি সেন্টারের কর্মকর্তারাও এই সনদকে পুঁজি করে এজেন্সি ও অসাধু দালালদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ।