× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মাদকাসক্তি নিরাময়ের নামে আসলে কী হচ্ছে

শাহরিয়ার জামান দীপ

প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৩ এএম

মাদকাসক্তি নিরাময়ের নামে আসলে কী হচ্ছে

৪০ বছর বয়সি ফিরোজ আহমেদ (ছদ্মনাম), পেশায় ব্যবসায়ী। জড়িয়েছিলেন ইয়াবার নেশায়। শুরুতে বুঝতে না পারলেও কিছুদিনের মধ্যেই পরিবারের সদস্যদের চোখে ধরা পড়ে ফিরোজের অস্বাভাবিকতা। মাদকাসক্তির বিষয়ে টের পেয়ে তাকে জোর করে একটি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানের পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘ওখানে নিজের কাজ নিজে করতে হতো। অনেক সময় স্টাফদের কাজও করে দিতে হতো। ভাতের থালা থেকে বাথরুম পরিষ্কার, সবই করিয়ে নিত। কাজে ভুল হলে চলত মারধর। আর কেউ নেশায় ছটফট করলে তাকেও বেদম পেটানো হতো।’

মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের এই অ-ব্যবস্থাপনা শুধু রাজধানীতেই নয়, সারা দেশেই। ১৯৯৮ সালে ঢাকায় প্রথম মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠানে যথাযথ মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতারিত হচ্ছেন মাদকাসক্ত রোগী ও তাদের পরিবার। নিরাময় কেন্দ্রের নামে কোথাও কোথাও চলে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে আটকে রেখে নির্যাতন। যেন মারধর করাই তাদের একমাত্র চিকিৎসা। নির্মমতার কথা প্রকাশ পেলে রোগীদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়ে। অভিযোগ রয়েছে কোনো কোনো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র মাদক সেবনের নিরাপদ আশ্রয়ও। অনেকগুলোতে বসে জুয়ার আসর। আর চিকিৎসার নামে চলা বিভিন্ন অপকর্ম তো রয়েছেই। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে রোগীদের ওপর যৌন নিপীড়নও চলে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। ফলে দিন দিন অপরাধের অভয়াশ্রম হয়ে উঠছে নিরাময় কেন্দ্রগুলো। অভিযোগ রয়েছে, নিরাময় কেন্দ্রগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের (মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর) সঠিক তদারকিও নেই।

জানা যায়, দেশে মাদকাসক্ত রোগীদের চিকিৎসায় সরকারিভাবে চারটি এবং বেসরকারিভাবে ৪০০টি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৯৯টি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সঠিক চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকা এবং নানা অভিযোগ ওঠায় গত ১৬ বছরে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের কারণে ৮১টি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্র বাতিল করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে বন্ধ করে দেওয়া হয় চাঁদপুরের ‘অর্পণ’ নামে মাদক নিরাময় কেন্দ্র। জানা যায়, ২০২৪ সালে অনুমোদন পাওয়ার পর থেকেই নানা অভিযোগ ছিল প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। তাদের বারবার সতর্ক করা হলেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। এজন্য নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি থাকা রোগীদের মধ্যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। তারা ওই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে কেন্দ্রের ভেতরে ভাঙচুর চালায় এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

এদিকে গত ২৩ মে কুমিল্লা ঢুলিপাড়ায় অবস্থিত নিউ যত্ন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এক যুবকের মৃত্যু হয়। যুবকের পরিবারের সদস্যদের দাবি, ‘প্রতিষ্ঠানটিতে রোগীদের ওপর চিকিৎসার নামে নির্যাতন চালানো হতো। এই নির্যাতনেই মারা গেছেন তাদের পরিবারের সদস্য।’ এ ছাড়া গত ২১ জুন রাজশাহীতে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নির্যাতনে এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। প্রতিদিনই এমন শত শত অভিযোগ উঠছে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে।

তবে নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি রোগীদের মারধরের বিষয় নাকচ করে বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র নতুন দিগন্তের স্বত্বাধিকারী তানভীর আহমেদ সুমন বলেন, ‘কোনো নিরাময় কেন্দ্রেই রোগীকে মারধর করা হয় না। অনেক সময় রোগীর স্বজনরা জোর করে তাদের ভর্তি করানোর ফলে রোগী বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেন না। তারাই নিরাময় কেন্দ্র থেকে চলে যাওয়ার জন্য নানান বাহানা করেন।’ 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৫ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি নিরাময় কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, মনোবিদ, নার্স, ওয়ার্ড বয় ও সুইপার থাকতে হয়। রোগীদের সরবরাহ করা খাবারের তালিকা, মানসিক বিনোদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের সুবিধা, প্রয়োজনীয় শৌচাগার, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধপত্র, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজিক্যাল ল্যাব এবং রোগীদের কাউন্সেলিংয়ের জন্য ক্লাসরুম থাকার বিধান রয়েছে।

অথচ সরেজমিনে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের ২টি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র পরিদর্শনে দেখা যায়, বাইরে ফিটফাট হলেও ভেতরে যেন এসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে। ধূমপানমুক্ত পরিবেশের কথা বলা হলেও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই যত্রতত্র ধূমপান করছেন। 

বারান্দা এবং কমন স্পেসের জন্য ৮০ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ রাখার কথা বলা হলেও সেই জায়গা রাখা হয়নি, এমনকি বারান্দাই পাওয়া যায়নি একটি প্রতিষ্ঠানে। অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হলেও তেমন কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। একটি প্রতিষ্ঠানে ২টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা ফায়ার এক্সটিংগুইশার পাওয়া গেলেও তা মেয়াদ পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। সার্বক্ষণিক চিকিৎসক এবং মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ থাকার কথা বিধিমালায় থাকলেও পাওয়া যায়নি কোনো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞকে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২জন নার্স থাকার কথা বলা হলেও তাদেরও দেখা মেলেনি। এ ছাড়াও একই ফ্লোরে নারী এবং পুরুষ রোগী না রাখার বিধানও অমান্য করা হচ্ছে। রোগীদের যেই পরিবেশে রাখার কথা তা তো নেই-ই, নেই বিনোদনের কোনো ব্যবস্থাও। 

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে এখন চলছে বাণিজ্য। টাকার বিনিময়ে রোগী ভর্তি করা হলেও আদতে কোনো চিকিৎসা নেই। খুব প্রয়োজন হলে কখনও-সখনো বাইরে থেকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ আনা হয়। আর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসার আগেই সব ম্যানেজ করা হয়, যাতে লাইসেন্সের সমস্যা না হয়।’

অথচ মাদকসেবীদের নিয়মিত চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে সে ব্যবস্থা নেই। এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এ মোহিত কামাল বলেন, ‘একজন মাদকাসক্তকে মাদক থেকে মুক্ত করতে প্রথমেই তাকে একটি ভালো পরিবেশ দিতে হবে। কোনো মাদকাসক্ত রোগীই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকতে চায় না। পরিবেশ ভালো না থাকলে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এজন্য নিরাময় কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ ঠিক করতে হবে, সঙ্গে বাড়াতে হবে সুযোগ-সুবিধা।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেকে শর্ত পালন করলেও বেশিরভাগই নিবন্ধনের শর্ত শতভাগ মানছেন না। রোগীদের সঙ্গে কথা বললে তারাও অনেক সময় কোনো অভিযোগ দিতে চান না। ফলে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান শর্ত মানছে না বা অমান্য করছে- প্রতিনিয়ত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে তেমন নিরাময় কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।’

একইভাবে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলো নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর উল্লেখ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ কার্যালয়ের পরিদর্শক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি মাসে একবার কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করা হয়। ভর্তি রোগীদের কোনো অভিযোগ থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ছাড়াও যে কেউ চাইলে নাম-পরিচয় গোপন করে অভিযোগ পাঠাতে পারেন।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা