শাহরিয়ার জামান দীপ
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:১৭ পিএম
আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:১৮ পিএম
প্রতীকী ছবি
সাগর আহমেদ (৩৫)। থাকেন বগুড়ায়। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে কাজ করছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। হঠাৎ একটি মাধ্যমে বিদেশ গিয়ে কাজ করার সুযোগ আসে তার কাছে। কিন্তু সেখানে কমপক্ষে বিবিএ পাস চাওয়া হয়। আবেদনের জন্য সময় আছে ১ মাস। কিন্তু এ মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিবিএ পাস করা সম্ভব নয় সাগরের পক্ষে। এক বন্ধুর মারফতে খোঁজ পান অনলাইনে ‘সার্টিফিকেট লাগবে’ নামক একটি গ্রুপের। যেখানে টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট করে দেওয়া হয়। এরপর তিনি যোগাযোগ করেন সেই গ্রুপে। সেখান থেকে সাগরকে দেওয়া হয় একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। এরপর কথা চলে সে নম্বরে। ১ লাখ টাকার বিনিময়ে ঢাকার একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ সার্টিফিকেট করে দেওয়ার কথা বলা হয় সাগরকে। সময় নেওয়া হয় ৭ দিন। এজন্য অগ্রিম হিসাবে দিতে হবে ২০ হাজার টাকা। প্রস্তাবে রাজি হয়ে সাগর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেয়। পরদিন সকালে ফোন করে রেজিস্ট্রারকে দেওয়ার কথা বলে চাওয়া হয় আরও ৩০ হাজার টাকা, টাকা না দিলে কাজ আটকে যাবে বলা হয়। বাধ্য হয়ে আবার ৩০ হাজার টাকা পাঠায় সাগর। এভাবে ২ দফায় ৫০ হাজার টাকা দেয় সাগর। বলা হয়, ২ ঘণ্টার মধ্যে অনলাইনে রেজাল্ট দেখতে পারবে সাগর। কিন্তু ২ ঘণ্টা পার হয়ে ৪ ঘণ্টা হয়ে যায়, সাগরের সঙ্গে কেউ কোনো যোগাযোগ করে না। বিষয়টি নিয়ে সাগর কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে দেখতে পায় তার নম্বরটি ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের প্রতারণার খপ্পরে শুধু সাগর না প্রতিদিনই পড়ছেন কেউ না কেউ। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে মানুষকে ঠকিয়ে প্রতারণার ব্যবসা চলছে রমরমা।
গোয়েন্দারা বলছেন, চক্রটি সব ধরনের সার্টিফিকেটের কাজ করে দেওয়া হয় বলে প্রতারণা করে থাকে। এরা মূলত ২টি পদ্ধতির কথা বলে থাকে। একটি অনলাইন, আরেকটি অফলাইন। অনলাইনে খরচ বেশি আর অফলাইনে কম। একটি বিবিএ/এমবিএ সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য চক্রটি অনলাইনে জনপ্রতি ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে আর অফলাইনে এই খরচ ৫০/৬০ হাজার টাকা। ইঞ্জিনিয়ারিংসহ অন্যান্য সার্টিফিকেট অনলাইনে ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা এবং অফলাইনে ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে প্রতারক চক্র। এ ক্ষেত্রে তারা ৩/৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য থেকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দ করার সুয়োগ দেয়। প্রার্থী রাজি হলে প্রথমে অগ্রিম ১৫/২০ হাজার টাকা নেওয়া হয় অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের কথা বলে। সময় নেওয়া হয় এক দিন। কিন্তু পরের দিন বিকালেই রেজিস্ট্রারকে টাকা দেওয়া লাগবে বলে নেওয়া হয় আরও ২০/৩০ হাজার টাকা। সমস্ত টাকা নেওয়া হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। টাকা দেওয়া হলে জানিয়ে দেওয়া হয় ২ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হবে সার্টিফিকেট রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম, কিন্তু সেই ২ ঘণ্টা আর হয় না। ব্লক করে দেওয়া হয় প্রার্থীর মোবাইল নম্বর।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ভুক্তভোগীরা নানা কারণে মামলা করতে চান না। অনেকে টাকা ফেরত পেলে মামলা তুলে নেন। ফলে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে আবার একই কাজ করে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সার্টিফিকেট দিয়ে থাকি, সার্টিফিকেট লাগবে, অরিজিনাল সার্টিফিকেট, অনলাইন সার্টিফিকেটসহ আরও বেশ কয়েকটি অনলাইন গ্রুপ খুঁজে পেয়েছে গোয়েন্দারা।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া এই চক্রের এক সদস্য জানান, অনলাইন সার্টিফিকেট প্রতারক চক্রের মূল হোতা মোহাম্মদ জুনায়েদ। তিনি ছাত্রলীগের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত এবং গত কয়েক বছর ধরে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৫-২০ জন সহকারী নিয়ে ৩০-৪০টি অনলাইন গ্রুপ খুলে প্রতারণা করছেন। এসব গ্রুপে টার্গেট করা হয় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষদের। চক্রটি অন্যের নামে সিম কিনে তা হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবহার করে, যাতে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়।
আইনজীবীরা বলছেন, প্রতারণামূলক এ ধরনের মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণে দুর্বলতার কারণে আসামিরা সহজে জামিন পেয়ে যায়।
এ বিষয়ে সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলছেন, এ ধরনের প্রতারণামূলক কাজ যারা করে তাদের সাইবার জগৎ সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকে। যে গ্রুপগুলো প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে সে গ্রুপগুলো বিভিন্নভাবে বন্ধ করা হলে তারা আবার নতুন গ্রুপ খোলে। এ ছাড়া তারা হোয়াটসঅ্যাপ এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নামে যে একাউন্টগুলো ব্যবহার করছে সেগুলো অন্য নামে, অর্থাৎ প্রতারকরা নিজের পুরো পরিচয় গোপন করে এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রতারকদের খুঁজে পেতে কষ্টকর হয়।