তানভীর হাসান
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:২৬ পিএম
রাজধানীতে বেড়েছে গ্রিল কেটে চুরির ঘটনা। কিছু ক্ষেত্রে আসামি গ্রেপ্তার হলেও উদ্ধার হচ্ছে না লুণ্ঠিত মালামাল। ঢাকা মহানগর পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গ্রিল কেটে চুরির ঘটনায় গত ৬ মাসে রাজধানীর ৫০ থানায় অন্তত ২৭৮টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯১টি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এসএন নজরুল ইসলাম বলেন, অনেক কর্মকর্তা চুরির মামলাগুলো সঠিকভাবে তদারকি করেন না। আর এই সুযোগে এসব ঘটনা ঘটেছে। আসামি গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মালামাল উদ্ধারে পুলিশ আগের চেয়ে বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখে। তবে কিছু কিছু ঘটনায় মালামাল উদ্ধার হয় খুবই সামান্য। কারণ চুরির পর দ্রুততার সঙ্গে মালামাল এক হাত থেকে অন্য হাতে চলে যায়।
তিনি বলেন, চোরদের একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এই ডেটাবেজ সংগ্রহ করা হয়েছে কয়েক হাজার চোরের তথ্য।
জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন অনেক অপরাধী। এর মধ্যে পেশাদার চোর ও ডাকাতও রয়েছে। মুক্তি পেয়ে তারা ফের পুরনো পেশায় ফিরছে। অতীতে বিভিন্ন থানা ও গোয়েন্দা কার্যালয়ে এই অপরাধীদের ডেটাবেজ থাকলেও পটপরিবর্তনের পর তা হারিয়ে গেছে। আবার বিভিন্ন থানায় আগুন দেওয়ায় অনেক তথ্যপ্রমাণ পুড়ে গেছে। এ কারণে চুরির পর আসামি শনাক্ত করতে পুলিশকে বেগ পেতে হচ্ছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গ্রিল কেটে চুরির ঘটনায় গত ৬ মাসে রাজধানীর রমনা জোনে ২৩, লালবাগ জোনে ১৫, ওয়ারী জোনে ৫৮, মতিঝিল জোনে ৫৫, তেজগাঁও জোনে ৪০, মিরপুর জোনে ৪১, গুলশান জোনে ২৫ ও উত্তরা জোনে ২১টি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় কতজনকে গ্রেপ্তার ও মালামাল উদ্ধারের সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে দেড় শতাধিক মামলার তদন্তে আসামিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু লুণ্ঠিত মালামালের পুরো অংশ উদ্ধার করা যায়নি। একইভাবে অন্যান্য চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯১টি। এর মধ্যে রমনা জোনে ১০১, লালবাগ জোনে ৩১, ওয়ারী জোনে ৫২, মতিঝিল জোনে ১৪৪, তেজগাঁও জোনে ৯৭, মিরপুর জোনে ৯৬, গুলশান জোনে ৭২ ও উত্তরা জোনে ৯৮টি মামলা হয়।
পুলিশের দায়িত্বশিল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাস্তবে এই পরিসংখানের বাইরেও অনেক ঘটনা রয়েছে। আইনি জটিলতার কারণে অনেকে মামলা করতে চান না। তারা থানায় লিখিত অভিযোগ করতে আগ্রহী। পুলিশ মামলার কথা বললে পরে আসবেন বলে চলে যান। তারপরও পুলিশ নিজ উদ্যোগে কিছু ঘটনার তদন্ত করে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, খালি বাসায় চুরির ঘটনা বেশি। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা ঈদের ছুটিতে বাড়ি অথবা অন্য কোনো কারণে লম্বা সময় বাসার বাইরে অবস্থানের মধ্যে চুরির ঘটনা ঘটে। সংঘবদ্ধ চোরেরা কোনো মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার পর ওসব বাসায় চুরি করে থাকে।
চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় সাংবাদিক রবিউল ইসলাম পলাশের বাসায় চুরির ঘটনায় বাড্ডা থানায় মামলা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত এবং গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ভুক্তভোগী বলেন, ১৩ এপ্রিল সকালে বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশে বের হই। রাতে ফিরে দেখি বাসার ভেতরের সব জিনিস এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। গ্রিল কেটে চোরেরা বাসায় ঢুকে একটি ল্যাপটপ, একটি আইফোন, মাটির ব্যাংকভর্তি এক লাখ টাকা, একটি স্মার্টওয়াচ ও একটি হ্যান্ডি ক্যামেরা ও পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যায়। তিনি বলেন, বাসার সিসি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু ফুটেজ পাওয়া যায়নি। ১৩ এপ্রিল বাসায় চুরি হয়েছে, সেদিনের ফুটেজ নেই। কিন্তু ১৪ এপ্রিল থেকে ফুটেজ রয়েছে। বিষয়টি রহস্যজনক।
এর আগে চলতি বছরের ১০ জুন রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় ঈদের ছুটিতে একটি বাসায় চুরির ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখে মো. আপন হোসেন ও মো. ইয়াছিন হোসেন শিপন নামে দুই চোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলার সূত্রে জানা গেছে, ৫৩/১/চ দ্বীননাথ সেন রোডের এক নারী বাসিন্দা ৬ জুন বাসায় তৃতীয় তলার দরজায় তালা লাগিয়ে সপরিবারে শরীয়তপুরে ঈদ উদ্যাপন করতে যান। ৯ জুন বাসায় এসে দেখেন, দরজার হেজবল ভাঙা। আলমারিতে থাকা ল্যাপটপ, একটি টাইটান ব্যান্ডের হাতঘড়ি, ১ লাখ ১২ হাজার টাকা, কানের স্বর্ণের দুল ৩ জোড়াসহ মোট ৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকার মালামাল লুট করে চোরচক্র। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর আসামিদের কাছ থেকে লুট হওয়া মালামালের সামান্য অংশ উদ্ধার করা হলেও বাকি অংশ উদ্ধার করা যায়নি।
গত বছরের ৩ ডিসেম্বর চিত্রনায়িকা মৌসুমী ও ওমর সানী দম্পতির বাসায় চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভাটারা থানায় মামলা করা হয়। ঘটনার দিন সকালে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন ওমর সানী। ৪০ মিনিট হাঁটাহাঁটির পর বাসায় ফিরে দেখেন তার ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন, ২২ হাজার টাকা এবং তার সহকারীর একটি মুঠোফোন চুরি হয়ে যায়। পুলিশ জানায়, এ মামলার তদন্ত চলছে।
জানতে চাইলে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কারও কোনো মূল্যবান জিনিস চুরি হলে পুলিশের অভিযানে কিছু উদ্ধার হয়। কিন্তু টাকা কিংবা স্বর্ণ চুরি হলে তা উদ্ধার হয় না। এক্ষেত্রে তিন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। চুরির পর চোর সরাসরি কিছু অংশ বিক্রি করে দেন, যাদের জানিয়ে চোর চুরি করেন তাদের চুরির ভাগ দেওয়া লাগে, আরেকটি হচ্ছে- চোরদের গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে বণ্টনের কথা শোনা যায়। অর্থাৎ ভুক্তভোগীর যে পরিমাণ মালামাল চুরি হয়েছে, তিনি সেই পরিমাণ ফেরত পান না।