× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সরকারি হাসপাতাল যেন দালালের বাণিজ্যিক জগৎ

মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:১০ পিএম

সরকারি হাসপাতাল যেন দালালের বাণিজ্যিক জগৎ

পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতাল মানেই ভরসার প্রতীক। সেখানেই তারা খুঁজেন কম খরচে সঠিক চিকিৎসা। কিন্তু খুলনার হাসপাতালগুলোতে সেই ভরসা আজ হুমকির মুখে। খোলা আকাশের নিচে, ভিড়ের মধ্যে, অসহায় রোগীদের কাছে সরকারি হাসপাতাল নয়, দালালদের বাণিজ্যিক জগৎ হয়ে গেছে।

সাতক্ষীরার আসাবুর আলী স্ত্রীকে নিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (খুমেক) এসেছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে সঠিক চিকিৎসা পাবেন। কিন্তু আউটডোরে ডাক্তার দেখানোর পর হাতে দেওয়া প্রেসক্রিপশন এবং একটি কাগজে লেখা নম্বরই যেন ছিলেন বিপদের সংকেত। ফোন করার সঙ্গে সঙ্গেই হাজির হয় এক বহিরাগত যুবক। হাতে সিরিঞ্জ, তুলা এবং ছোট্ট ব্যাগ। হাসপাতালের বেডেই স্ত্রীর রক্ত সংগ্রহ করে টাকা নেন নগদে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট হাতে পেলেন আসাবুর। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় সরকারি হাসপাতালের ল্যাবের নাম রিপোর্টে নেই। বরং লেখা রয়েছে শহরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম। পরে বুঝলেন, সরকারি হাসপাতালই ভিজিট করার পরও বেসরকারি ক্লিনিকের ফাঁদে পড়েছেন।

আসাবুর আলী কণ্ঠ ভারী হয়ে বললেন, গরিব মানুষের জন্য বানানো হাসপাতালে এসেও বেসরকারি ক্লিনিকের ফাঁদে পড়লাম। চিকিৎসা নয়, প্রতারণার শিকার হলাম।

শুধু খুমেক নয়, খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতাল ও খুলনা জেনারেল হাসপাতালেও একই চিত্র। প্রতিদিন ভোর থেকে হাসপাতালের গেট, করিডোর এবং ওয়ার্ডে অবস্থান নেয় শতাধিক দালাল। অসহায় রোগী ও তার স্বজনদের কম খরচে সব টেস্ট এবং ‘ভালো ডাক্তার দেখানোর’ প্রলোভনে তারা সহজে ফাঁদে ফেলে।

যশোরের গৃহিণী হাফিজা খাতুন বলেন, গরিবের হাসপাতালে এসেছিলাম কম খরচে চিকিৎসা নেব বলে। কিন্তু এখানে আরও বেশি খরচ হলো। কমিশনের ফাঁদে পড়ে নাজেহাল হয়ে পড়লাম।

খুমেক হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা মাত্র ৫০০। অথচ প্রতিদিন ভর্তি হন দেড় হাজারের বেশি রোগী। করিডোর, বারান্দা, এমনকি মেঝেতেও মানুষ শুয়ে থাকে। শয্যার চরম সংকট রোগীদের অসহায় অবস্থায় ঠেলে দেয়। আর সেই সুযোগে সক্রিয় হয় দালাল চক্র। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিনের এই লেনদেনের অংশ কমিশন হিসেবে পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা কর্মচারীর কাছে। এ কারণেই দালালদের হাসপাতালের ভেতরে অবাধ চলাফেরা বন্ধ হয় না।

একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মচারী স্বীকার করেছেন, আমাদের সঙ্গে কিছু ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীর যোগসাজশ আছে। তারা রোগী পাঠায়, আমরা কমিশন দেই। এভাবেই ব্যবসা চলে।

 শহরের বিভিন্ন ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই কোনো না কোনো দালালের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। যেমন ২০০ টাকার টেস্টে ৫০ টাকা, ৩০০ টাকার টেস্টে ৮০ টাকা কমিশন দেওয়া হয় দালালকে।

গত দুই বছরে জেলা প্রশাসন, র‌্যাব, পুলিশ, দুদক ও ভ্রাম্যমাণ আদালত ৪০টির বেশি অভিযান চালিয়েছে। ২০২৩ সালে ৮৫ জন, ২০২৪ সালে ৬০ জন এবং ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে অন্তত ২৫ জন দালাল আটক হয়েছেন। কেউ পেয়েছেন তাৎক্ষণিক কারাদণ্ড, কেউ অর্থদণ্ড। সম্প্রতি দুদকের অভিযানে কয়েকজন দালাল এক মাসের সাজাও পেয়েছেন। কিন্তু মূল চক্র অটুট।

খুমেক হাসপাতালের আশপাশে অন্তত ৩৫০ জন দালাল সক্রিয়। হাসপাতালের আশপাশে শতাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে, অনেকই চলছে নকল কাগজপত্রে।

নিয়ম অনুযায়ী ১০ শয্যার ক্লিনিকে কমপক্ষে ৩ জন ডাক্তার, ২ জন নার্স ও ৩ জন সুইপার থাকার কথা। অথচ অধিকাংশ ক্লিনিকেই নেই স্থায়ী ডাক্তার। কাজ চালানো হয় চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসক দিয়ে। অস্ত্রোপচারের সময় ডাক্তার অনুপস্থিত থাকায় একাধিক দুর্ঘটনার কথাও রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন।

বাগেরহাটের আলমগীর হোসেন বলেন, স্ত্রীকে নিয়ে মেডিকেলে এসেছিলাম। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে এক নারী ভালো ডাক্তার দেখানোর আশ্বাস দিয়ে পাশের ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করিয়ে ৪ হাজার টাকার একটি বিল ধরিয়ে দিল।  পরে সরকারি ডাক্তার জানালেন, এসব পরীক্ষার কোনো দরকারই ছিল না। শুধু অর্থই নয়, স্ত্রীর শরীরও খারাপ হলো।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, যেখানে গরিব মানুষ চিকিৎসার শেষ আশ্রয় খুঁজতে আসে, সেই জায়গাটাই যদি দালালচক্র দখল করে নেয়, তবে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থা টিকবে কীভাবে? দালালদের ঠেকাতে হলে হাসপাতালের প্রবেশপথে কঠোর নিরাপত্তা, সিসিটিভি নজরদারি এবং কমিশন বাণিজ্যে জড়িত চিকিৎসক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

নাগরিক নেতা সরদার আবু তাহের অভিযোগ করেন, সরকারি হাসপাতালগুলো রোগী ধরার ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হচ্ছে মহাখরচের বেসরকারি হাসপাতালে যেতে।

খুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. আইনুল ইসলাম বলেন, আমি যোগদানের পর এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছি। দালালদের উচ্ছেদ ও অনিয়ম দূর করতে কয়েকটি কমিটি গঠন করতে যাচ্ছি। প্রশাসন ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। শিগগিরই এর সুফল পাবে রোগীরা।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ শুধু আর্থিক প্রতারণা নয়। এটি এক গভীর মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। গরিব রোগীরা হাসপাতালে আসেন শেষ আশ্রয়ের খোঁজে। কিন্তু এখানে এসে তারা পাচ্ছেন বিভ্রান্তি, অতিরিক্ত খরচ ও অপ্রয়োজনীয় টেস্টের চাপ।

যশোরের সুলতানা আক্তার বলেন, প্রথমবার খুলনা মেডিকেলে এসেছি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক নারী আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল পাশের ক্লিনিকে। মনে হলো, হাসপাতালটা যেন এক অচেনা গোলকধাঁধা।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রধান ভরসা খুমেক হাসপাতাল। কিন্তু যখন এই হাসপাতালে দালাল সিন্ডিকেট রোগী ভাগাভাগি করে নেয়, তখন সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় দাঁড়াবে? সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যে গভীর সংকটে পড়েছে, খুলনার ঘটনা তার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কমিশন বাণিজ্যের এই ক্যানসার বন্ধ না হলে সরকারি হাসপাতালগুলো ধীরে ধীরে মানুষের কাছে আরও অবিশ্বাস্য হয়ে উঠবে। এটি শুধু স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নয়, সামাজিক আস্থা ও মানবাধিকারের সাথেও সরাসরি জড়িত।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা