এম. আর কামাল, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৪৯ এএম
নারায়ণগঞ্জে পুলিশের লুটে নেওয়া অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে আওয়ামী লীগের ক্যাডারসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত যৌথ বাহিনী। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, প্রতিপক্ষকে দমন, বাস টেম্পোস্ট্যান্ড, জমি বেচাকেনা, আবাসন কোম্পানির জমির বন্দোবস্ত করা, ঝুট সেক্টর ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে এসব অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতেও রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু গত দুই মাসে নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্ধার করেছে মাত্র ৩টি অস্ত্র। বিশেষ করে সাবেক এমপি শামীম ওসমান বাহিনীর ক্যাডারদের কাছে থাকা অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলো এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
গত বছরের পাঁচ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের দিন নারায়ণগঞ্জে দুটি থানার অস্ত্র গোলাবারুদ লুট করে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। থানা দুটি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা। কিন্তু পুলিশের লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সেভেন পয়েন্ট ৬২ মিলিমিটারের চায়না রাইফেল ৭টি, সেভেন পয়েন্ট ৬২ এসএমজি ১টি, সেভেন পয়েন্ট ৬২ এলএমজি ১টি, সেভেন পয়েন্ট ৬২ পিস্তল ৫টি, নাইন এমএম পিস্তল ৭টি, ১২ বোরের শটগান ১৬টি, ৩৮ মি.মি গ্যাসগান (সিঙ্গেল শট) ৫টিসহ মোট ৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। এ ছাড়া সেভেন পয়েন্ট ৬২ মি.মি গুলি ২ হাজার ৮৭৭টি, সেভেন পয়েন্ট ৬২ পিস্তলের গুলি ৩২৬টি, নাইন এমএম পিস্তলের গুলি ২৯১টি, ১২ বোরের শটগানের কার্তুজ (রাবার বল) এক হাজার ১৬৮টি, ১২ বোর শটগানের কার্তুজ (লিডবল) ২ হাজার ৭৩৩ টি, ৩৮ মি.মি টিয়ার শেল গ্যাস (লং রেঞ্জ) ৪০টি, ৩৮ মি.মি টিয়ার শেল গ্যাস (শট রেঞ্জ) ৮৩টি এখনও উদ্ধার হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রদত্ত অস্ত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেওয়া সব অস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং লাইসেন্সধারীদের অস্ত্র থানায় জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ইস্যু করা সব অস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত করে। সে অনুযায়ী যেসব লাইসেন্সকৃত অস্ত্র এখনও জমা হয়নি সেগুলো অবৈধ হিসেবে বিবেচিত।
পুলিশের একজনে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, খোয়া যাওয়া ছোট অস্ত্রগুলো হাত ঘুরে সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাওয়ার শঙ্কা করছি। তবে বড় অস্ত্রগুলো হয়তো পুকুর বা খালবিলে ফেলে দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানান, দুটি থানার ছোটবড় মিলিয়ে ৪২টি অস্ত্রসহ বিপুলসংখ্যক গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
জানা যায়, পলাতক সাবেক প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, শামীম ওসমানের সেনাপতি হিসেবে পরিচিত শাহ নিজাম, শাহাদাত হোসেন সাজনু, মীর সোহেল আলী, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর শাহ জালাল বাদল, কাউন্সিলর রুহুল আমিন, নিয়াজুল, জাকিরুল আলম হেলাল, জুয়েল হোসেন, কথিত সাংবাদিক রাজু আহাম্মদসহ শতাধিক ক্যাডারের কাছে ছিল লাইসেন্সকৃত অস্ত্র। পাঁচ আগস্টের পর তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও তাদের অস্ত্র থানায় বা জেলা প্রশাসনের কাছে জমা হয়নি। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শামীম ওসমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ও কথিত সাংবাদিকসহ দুই শতাধিক ক্যাডার শিক্ষার্থীর ওপর গুলিবর্ষণ করেছে। দেখা যায় ওই দিন অস্ত্র হাতে গুলি করছেন এবং মহড়া দিচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, শামীম ওসমানের সেনাপতি শাহ নিজাম, শাহাদাত হোসেন সাজনু, নিয়াজুল, জাকিরুল আলম হেলাল, জুয়েল শামীম ওসমানের শেলক তানভীর আহমেদ টিটু, নারায়ণগগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম রাফেল, ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজুল ইসলাম কবীর, জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি শুভ্র, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসনাত রহমান বিন্দু কথিত সাংবাদিক রাজু আহম্মেদসহ বেশ কয়েকজনকে।
চলতি বছরে গত ১০ জুন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা মাঝিপাড়া এলাকায় স্থানীয় লোকজনের হাতে আটক হয় ছাত্রলীগ নেতা সাব্বির। তাকে ছাড়িয়ে আনতে যান সাবেক ছাত্রদল নেতা জাহিদুল ইসলাম। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধলে ছাত্রদল নেতা জাহিদুল ইসলাম তার সঙ্গে থাকা অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মামুন নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হয়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত জাহিদুল ইসলাম ও রাসেল ফকিরকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করে র্যাব। কিন্তু তার ব্যবহৃত অস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত ২৪ ডিসেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার সঙ্গে কথাকাটাকাটির জের ধরে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে নিহত হয় কাঞ্চন পৌরসভা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল মিয়া (৩০)। ওই দিন সংঘর্ষের ঘটনায় প্রকাশে অস্ত্রের মহড়া দেয় সন্ত্রাসীরা।
২৯ মার্চ রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় যুবদল কর্মী হাসিব (৩২)। এতে আরও তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়।
১১ এপ্রিল রূপগঞ্জের দাউদপুরে ব্যবসা-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে খুন হন যুবদল কর্মী শান্ত সরকার। ওই দিনের ঘটনায় ব্যবহার হয় আগ্নেয়াস্ত্র। সংঘাত, সংঘর্ষ ও খুনখারাবিতে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটলে অস্ত্রগুলো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
গত ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের ঝুটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও দখলকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও ছাত্রদল নেতার অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে কমপক্ষে ১০-১২ জন আহত হয়। ওই সময় সোহাগ নামের এক যুবককে পিস্তল হাতে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। কিন্তু ঘটনার পর প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ অস্ত্র হাতে গুলি ছোড়া যুবক সোহাগকে গ্রেপ্তার বা তার ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি। সোহাগ সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী দক্ষিণপাড়া এলাকার মজিবুর রহমানের ছেলে।
গত ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে বন্ধন পরিবহনের দখল নিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ১২ জন আহত হয়। দুপুর দেড়টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলার সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে গুলিবর্ষণ করতে দেখা যায় নগরীর মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী রাসেলকে। সেই সন্ত্রাসীর ছবি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করতে। কিন্তু প্রশাসন তাকে খুঁজে পাচ্ছে না বলে জানান।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ জানান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দায়ভার আইনশৃখলা বাহিনীর। এই অবস্থায় নির্বাচন হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটুকু মোকাবিলা করতে পারবে তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমাদ জানান, প্রয়োজনীয় সংস্কার, গণহত্যার বিচার দৃশ্যমান হওয়ার পরই আমরা নির্বাচন চাই। কারণ এখন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। বিশেষ করে রাইফেল ক্লাবের অস্ত্র, ১৯ জুলাই প্রদর্শিত অস্ত্রসহ কোনো অস্ত্রই উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মিনিমাম ভালো হয়নি।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ র্যাব-১১ (সিও) লে. কর্নেল এইচএম সাজ্জাত হোসেন জানান, পাঁচ আগস্ট পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্রসহ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে র্যাব তৎপর।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানান, পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্রসহ অস্ত্রধারী ক্যাডারদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারে জেলার প্রতিটি থানাকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া আছে। তিনি বলেন, পুলিশ অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করছে।