এমএ ইউসুফ আলী, রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৩৪ পিএম
রাঙ্গাবালীতে এলজিইডির সড়ক নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে কাদামাটি মিশে থাকা বালু-পাথর। ঢালাইয়ে ব্যবহার হচ্ছে জমাট বাঁধা সিমেন্টও। প্রবা ফটো
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে এলজিইডির একটি সড়ক নির্মাণে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্মাণকাজের শুরু থেকেই ঠিকাদারের লোকজন নকশা বহির্ভূতভাবে কাজ করার পাশাপাশি নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছে। সবার চোখের সামনে ঠিকাদার কাজে গরমিল করে টাকা লোপাট করছে বলেও দাবি স্থানীদের। তবে সব দেখেও না দেখার ভান করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ এবং শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় রাঙ্গাবালী উপজেলার কাছিয়াবুনিয়া (খালগোড়া) লঞ্চঘাট বাজার থেকে বাহেরচর বাজার (উত্তর কাজির হাওলা মোহসেনিয়া দাখিল মাদ্রাসা) পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার আরসিসি সড়ক নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৫ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার ২০৯ টাকায় কাজটি পায় বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজটি করছে দশমিনা উপজেলা সদরের বাসিন্দা জুয়েল মোল্লা। এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শুরু হওয়া এই কাজের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৪৫ শতাংশ। ৬০০ মিটার সড়ক আরসিসিকরণ কাজ শেষ হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় নির্মাণের শুরু থেকে মানসম্মত কাজ হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত যতটুকু কাজ হয়েছে তার পুরোটাতেই অনিয়ম হয়েছে। কাজ শেষ হতে না হতেই পাথর উঠে যাচ্ছে বলেও দাবি করেন স্থানীয়রা। ফলে সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়ে জনমনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামলে এর প্রমাণও পাওয়া যায়। সড়ক নির্মাণকাজ চলাকালীন সেখানে গিয়ে দেখা যায় ঢালাই চলছে। কিন্তু এই ঢালাইয়ে ব্যবহৃত পাথর ও বালুতে মিশে আছে কাদামাটি। এই কাদামাটি মিশে থাকা বালু-পাথর দিয়েই ঢালাই দেওয়া হয়। ঢালাইয়ে ব্যবহার করা হয় জমাট বাঁধা চাক চাক হয়ে যাওয়া সিমেন্টও। তা দিয়েই চলছিল ঢালাইয়ের কাজ।
আর অকোপটে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চলার কথা স্বীকারও করেন নির্মাণ শ্রমিকরা।
শুধু নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হয়নি ঠিকাদার! রড সাশ্রয় করতে নকশাবহির্ভূত কাজ করার প্রমাণও মিলেছে অনুসন্ধানে। নকশা অনুযায়ী, দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থে ৭ ইঞ্চি পর পর ঢালাইয়ের জন্য ১০ মিলি রড দিয়ে জালি করার কথা। কিন্তু রড সাশ্রয় করতে ঘনত্ব কমিয়ে দুই ইঞ্চি ফাঁকা বেশি দিয়ে ৯ ইঞ্চি পর পর রড বেঁধে জালি করা হয়েছে। সেই জালির ওপর ঢালাই দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সরাসরি স্বীকারোক্তি দেন কাজের মূল রাজমিস্ত্রি আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ঠিকাদারের নির্দেশনা অনুযায়ী রডের জালি বেঁধেছি।
ঠিকাদারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজটির দেখভালের জন্য দায়িত্ব থাকা উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের মধুখালী গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিনকে হাতেনাতে এমন প্রমাণ ধরিয়ে দিলেও কৌশলে তিনি সব এড়িয়ে যান।
সবশেষে প্রাক্কলন (এস্টিমেট) না মেনে দুই ইঞ্চি করে রডের ঘনত্ব কমিয়ে জালি বেঁধে ঢালাই হচ্ছেÑ এমনটা দেখালে তিনি বলেন, ‘আমি ৮ ইঞ্চি বাই ৮ ইঞ্চি রড বাঁধতে বলেছি।’ নিয়ম অনুযায়ী আপনিও এক ইঞ্চি ঘনত্ব কমাতে বললেন কেন প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাকে ইঞ্জিনিয়ার এভাবে বলেছেন।’
সড়ক নির্মাণকাজের সাব-ঠিকাদার জুয়েল মোল্লা মোবাইলে বলেন, আমি বলছি ডিজাইন অনুযায়ী কাজ করতে। ডিজাইনের বাইরে কাজ করতে নিষেধ করেছিলাম। পাথর যেখানে রাখছি, সেখানে জোয়ারের পানি উঠে। অন্য কোনো জায়গা পাইনি। আপনার কথা সব সঠিক আছে। পরবর্তী সময় এরকম আর হবে না। আমি আপনাকে ওয়াদা দিলাম।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান বলেন, ঠিকাদার আমাদের জানিয়ে কাজ শুরু করার কথা। কিন্তু আমাকে না জানিয়েই কাজটি শুরু করে দিয়েছে। বিষয়টি শুনে আমার প্রতিনিধি গিয়ে কাজটি বন্ধ করেদিয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা ইউএনও রাজীব দাশ পুরকায়স্থ বলেন, সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি জেনে আমি প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছি। উনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে সতর্ক করে দিয়েছেন।