তানভীর হাসান
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১৭ পিএম
প্রতীকী ছবি
খুনের পর লাশ ফেলা হচ্ছে রাজধানীর চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীতে। এতে লাশ পচে-গলে বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। আবার লাশের সঙ্গে ভারী কিছু বেঁধে দিয়েও নদীতে তলিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। উদ্দেশ্য আলামত নষ্ট করে হত্যাকারী নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। ফলে বেশিরভাগ ঘটনায় নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা দুরূহ হয়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। এতে জনমনে ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক।
গত ৬ মাসে এই তিন নদী থেকে লাশ উদ্ধারের সঠিক পরিসংখ্যান নৌ-পুলিশের না থাকলেও প্রতিদিনই পড়ে ৩টি লাশ পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো তালিকাও করা হচ্ছে না। সর্বশেষ গত ২৩ আগস্ট শনিবার এক দিনেই বুড়িগঙ্গা নদী থেকে ৪টি লাশ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। তাদের সবাইকেই হত্যার পর লাশ ফেলে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপর একটি সূত্রমতে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে শুধু মেঘনা নদী থেকেই ৪৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর মধ্যে অন্তত ২৭ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে সূত্র দাবি করেছে। এর আগে ২০২২ থেকে ২৪ সালের আগস্টের আগ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদী থেকে ৬৭৫টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ৪৯৫টি লাশ শনাক্ত হয়েছে। ১৮০টি অশনাক্ত অবস্থায় দাফন করা হয়েছে। লাশ উদ্ধারের এসব ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে ৭৭টি। তবে ৫ আগস্টের পর কোনো পরিসংখ্যান করা হয়নি বলে সূত্র দাবি করেছে।
জানা গেছে, ২৩ আগস্ট শনিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন মাদারীপুর টিনের মসজিদ ঘাট এলাকা থেকে অজ্ঞাত নারী (৩০) ও পুরুষের(৩৫) মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশের সদস্যরা। মরদেহ যাতে ভেসে উঠতে না পারে সেজন্য ৫০ কেজি ওজনের চালের বস্তার সঙ্গে হাত বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পচে-গলে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। একই দিন দুপুরে বুড়িগঙ্গায় আধ ঘণ্টার ব্যবধানে ভাসমান অবস্থায় নারী ও শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, তারা সম্পর্কে মা ও ছেলে। এদের মধ্যে নারীর বয়স অনুমানিক ৩৫ বছর ও শিশুটির বয়স ৩/৪ বছর । নিহত নারীর পরনে সালোয়ার-কামিজ ও গলায় বোরকার হাতা দিয়ে ফাঁস লাগানো ছিল। উদ্ধারকৃত শিশুটির গলায় ওড়না দিয়ে প্যাঁচানো অবস্থায় ছিল। ধারণা করা হচ্ছে শ্বাসরোধে তাদেরকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। একই দিন চার মরদেহ উদ্ধারের পর ফের আলোচনায় আসে লাশের ডাম্পিং জোন হিসেবে খ্যাত বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা-মেঘনা নদী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ-পুলিশের এসপি (অপারেশন) মুক্তা ধর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নিহত ৪ জনের পরিচয় জানার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এগুলো হত্যাকাণ্ড। সে বিষয়টি মাথায় রেখেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, দ্রুতই খুনিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, সাধারণ হত্যাকারী নিজেকে আড়াল করতেই লাশ ফেলে নদীতে। কিন্তু একটা পর্যায়ে তারা গ্রেপ্তার হন এবং বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়। সম্প্রতি নৌ-পুলিশ এ ধরনের অন্তত অর্ধডজন মামলার তদন্ত শেষ ও আসামি গ্রেপ্তার করেছে। গত ৬ মাসে কতগুলো লাশ উদ্ধার করা হয়েছেÑ এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি নৌ-পুলিশের মিডিয়া শাখায় যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন। এ বিষয়ে মিডিয়া শাখায় যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো তথ্য দিতে রাজি হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরেও এ-সংক্রান্ত কোনো তালিকা নেই।
জানা গেছে, প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই তিন নদী থেকে লাশ উদ্ধার করা হচ্ছে। বেশিরভাগ ঘটনারই কোনো রহস্যভেদ হচ্ছে না। কারণ পচে-গলে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় লাশের পরিচয় শনাক্ত করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। ফলে বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফন করা হচ্ছে অনেককে। দাফনের আগে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রাখছে মেডিকেল সংশ্লিষ্ট ফরেনসিক বিভাগ। নিখোঁজ কোনো মানুষের সন্ধানে কেউ এলে তখন সেই নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত করা হয়ে থাকে। তবে তার সংখ্যা খুবই কম। কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘রাতে নৌ-পুলিশের টহল দেখাই যায় না। দিনে তারা শুধুমাত্র ট্রলার ও বাল্কহেড আটকে অনৈতিক সুবিধা নিতে ব্যস্ত থাকে। এ কারণে হত্যাকারীরা নির্ভয়ে লাশ ফেলে চলে যাচ্ছে। বেশিরভাগ ঘটনায় দেখা যায়, ভিকটিমের বাড়ি অন্য কোনো জেলায়’।
নৌ-পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের নদীপাড়ে এক সময় আলোক বাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ঘাট ছাড়া অন্য কোনো স্থান থেকে নৌকা বা ট্রলার না ছাড়ার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। থমকে গেছে আলোকবাতি স্থাপনের কাজ। যত্রতত্র থেকে ছাড়া হচ্ছে নৌ-যান। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতনের কোনো নির্দেশনা নেই। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরাও আগ বাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে না। এ কারণে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদী থেকে লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মনিরুল হক ডাবলু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সম্প্রতি নদী থেকে লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেড়ে গেছে। যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩টি। বেশিরভাগ ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, অন্য কোথাও খুনের পর লাশ ফেলা হচ্ছে নদীগুলোতে। এ কারণে খুনিদের ধরতে বেগ পেতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আসলে নদী এবং নদীতীরবর্তী অঞ্চলের অপরাধ পয়েন্টগুলোকে সার্ভিলেন্সের আওতায় নিয়ে আসা উচিত। এজন্য নৌ-পুলিশের পাশাপাশি টুরিস্ট পুলিশ ও কোস্ট গার্ড বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। অপরাধীরা নিজেদের আড়ালে রাখতেই নদী ও বনাঞ্চল বেছে নেয়। নদীতে বিশেষ করে লাশ স্রোতে ভেসে অন্যত্র চলে যায়। লাশ পচে বিকৃত হয়ে যায় এবং আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার বেশি সম্ভাবনা থাকে। এতে খুনি পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।