অপারেশন শুদ্ধি
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৩২ এএম
প্রতীকী ছবি
জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের সর্বত্র শুরু হচ্ছে অস্ত্র জমা ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে একযোগে অভিযান। দীর্ঘদিন পর এমন সমন্বিত উদ্যোগকে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, ‘অপারেশন শুদ্ধি’। তথ্য বলছে, বেহাত সরকারি অস্ত্র, বাতিল লাইসেন্সের আগ্নেয়াস্ত্র ও অবৈধ অস্ত্রগুলো বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি)-এর সমন্বয়ে পরিচালিত হবে নতুন অভিযান। পাশপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কেউ অস্ত্রধারীদের সম্পর্কে তথ্য দিলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। তথ্যদাতার নাম-পরিচয়ও গোপন রাখা হবে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত অভিযানে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাই জননিরাপত্তা নিশ্চিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জেলা পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেসির সহায়তায় নিয়মিত রেইড ও অভিযান চালাতে বলা হয়েছে।
সভায় আলোচনায় উঠে এসেছে, কেউ যদি অবৈধ অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে প্রশাসনকে তথ্য দেন। তাহলে তাকে উপযুক্ত পুরস্কার প্রদান করা হবে। এই প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও আলোচনায় উঠে এসেছে নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ির সিদ্ধান্ত। সরকারি কর্মকর্তা ও স্বীকৃত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের বাইরে কারও নামে অস্ত্রের অনুমোদন নিরুৎসাহিত করতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অস্ত্রের অপব্যবহার নিয়ে প্রশাসন চিন্তিত। গত এক দশকে দেখা গেছে, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে কয়েকগুণ। প্রশাসনের এই অভিযানকে তারা একটি ‘প্রি-এম্পটিভ স্ট্র্যাটেজি’ হিসেবে দেখছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, বিগত এক বছরে দেশে ৭৮৩টি অবৈধ অস্ত্র এবং প্রায় ১২ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এর বেশিরভাগই ছিল অপরাধীদের দখলে কিংবা লাইসেন্স বাতিল হওয়া অস্ত্র। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য বাহিনী একযোগে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোথাও কোথাও অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলা প্রশাসক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বহু বছর পর অভিযানে এমনভাবে জেলা প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি অস্ত্রের লাইসেন্স পুনঃপরীক্ষা হচ্ছে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে স্পেশাল টিম গঠন করা হয়েছে। এই অভিযান অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সূচনা। শুধু প্রশাসন নয়, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এটি সফল হবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ সুপার বলেন, জনগণ যদি নির্ভয়ে তথ্য দেয়, তাহলে দ্রুত অভিযান পরিচালনা সহজ হবে। তারা বিশ্বাসযোগ্য তথ্যদাতাকে আর্থিক পুরস্কার, এমনকি সম্মাননাও দেবেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই ধরনের অভিযান শুধু অস্ত্র উদ্ধার নয়, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সন্ত্রাস কমাতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে তথ্যদাতার নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত না করলে বিপরীত প্রভাবও পড়তে পারে।
অপরাধ বিশ্লেষক নাজমুল কাইয়ুম বলেন, বিশ্বজুড়েই অবৈধ অস্ত্র মানে অনিশ্চয়তা। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এরা ভয়াবহ রূপ নেয়। তাই প্রশাসনের এমন পদক্ষেপ সময়োপযোগী।
মাঠের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনা জেলার একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তাদের এলাকায় আগে মাঝে মাঝেই অস্ত্রের মহড়া হতো। এখন নতুন করে অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে জেনে কয়েকজন ইতোমধ্যে অস্ত্র জমা দিয়েছেন। গ্রামে এখন আগের তুলনায় অনেকটা শান্তি ফিরে এসেছে।