সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১১:৪৫ এএম
মো. নূরুউদ্দিন ভূঁইয়া বাদল। প্রবা ফটো
অভিনব উপায়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জালিয়াতি করে সরকারি চাকরি করছেন মো. নূরুউদ্দিন ভূঁইয়া বাদল ওরফে মো. বাদল মিয়া নামের একজন ব্যক্তি। প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বয়স, বাবা-মায়ের নামসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে বাংলাদেশ রেলওয়ের গেটকিপার পদে চাকরি নিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি কিশোরগঞ্জের গচিহাটা স্টেশনের আউটার রেলক্রসিংয়ে গেটকিপারের দায়িত্ব পালন করছেন।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বাদলের নামে দুটি ভিন্ন জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে। একটি কার্ডে জন্ম তারিখ ১৫ জুন ১৯৮০ এবং জন্মস্থান ময়মনসিংহ, যেখানে পেশা হিসেবে বেসরকারি চাকরি উল্লেখ রয়েছে। অন্যকার্ডে জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্ম তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮৭ এবং পেশা ব্যবসায়ী। ৭ বছর কমানোর পাশাপাশি বাবা-মায়ের নামেও আনেন ভিন্নতা। নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারে তার দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র এখনও সচল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ৩ বছর অস্থায়ীভাবে চাকরির পর শূন্যপদে আবেদনের ভিত্তিতে চাকরি স্থায়ীকরণ করা হয়। বাদল ৩ বছর পূর্ণ না করেই আবেদন করে। তিনি চাকরি স্থায়ীকরণ করার জন্য আরেকটি জাতীয় পরিচয়পত্র বানিয়ে রেল দপ্তরে জমা দেন। ২০২০ সালের দিকে তার চাকরি স্থায়ীকরণ করা হয়।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ২০০৭-০৮ সালে নেওয়া অনেক ভোটারের আঙুলের ছাপ মানসম্পন্ন না হওয়ায় পুনঃনিবন্ধনের সময় অনেকেই দ্বিতীয়বার ভোটার হতে পেরেছেন। দ্বিতীয় জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েই তারা চাকরিতে বহাল রয়েছেন। বাদলও এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারে তার দুটি এনআইডি সক্রিয় রয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, শুধু বাদলই নন রেলওয়ে, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসক কার্যালয়সহ বহু সরকারি দপ্তরে তথ্য গোপন করে চাকরি নিয়েছেন অনেকে। উচ্চ মাধ্যমিক পাস হওয়া সত্ত্বেও বয়স কমাতে কেউ কেউ অষ্টম শ্রেণির সার্টিফিকেট ও জন্মসনদ দিয়ে আবেদন করেছেন। এদের অনেকে নিয়োগের সময় ঘুষ বা তদবিরের আশ্রয়ও নিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মরত কয়েকজন বলেন, সরকারি চাকরি নামের সোনার হরিণ ধরতেই তারা তথ্য জালিয়াতি করেছেন। অনেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পাস হওয়া সত্ত্বেও বয়স কমাতে ৮ম শ্রেণির সার্টিফিকেট ও জন্মসনদ দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। কিন্তু বেতন ওঠাতে জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করায় আটকে গেছেন। এ থেকে বাঁচতে কেউ টাকা দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করেছেন, আবার কেউ দুইবার ভোটার হয়েছেন।
জাতীয় নাগরিক কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাফায়েতুল্লাহ হিমেল বলেন, তথ্য গোপন ও জালিয়াতি করে সরকারি চাকরি নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যারা চাকরির শুরুতেই মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে দুর্নীতিপ্রবণতা দেখা দেয়। তাই নিয়োগকারীদের উচিত, চাকরিপ্রার্থীদের সব নথিপত্র কঠোরভাবে যাচাই করা।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের সার্ভারের দুর্বলতা দূর করে, যারা দ্বিতীয়বার ভোটার হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতির বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাদল কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, তার উপরের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে বলতে পারবেন।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে (পূর্ব) অঞ্চলের প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তা জোবেদা আক্তার বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। আপনার মাধ্যমে জানলাম, খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রেলওয়ে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফুয়াদ হাসান আনন্দ বলেন, এটা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের বিষয়। প্রথম আপনার মাধ্যমেই শুনলাম। বিষয়টি যদি সত্য হয় তাহলে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।