তানভীর হাসান ও শাহরিয়ার জামান দীপ
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৫ ০০:২৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীতে সিসা বারের আড়ালে চলছে ভয়ংকর মাদক ইয়াবা ও গাঁজা সেবন। এ ছাড়া রাত গভীর হলেই সেখানে চলে অসামাজিক কার্যক্রম। খদ্দেরের তালিকায় সমাজের ধনির দুলাল-দুলালিরা। খোদ রাজধানীর গুলশান-বনানী ও ধানমন্ডিতে দিনের পর দিন এসব কর্মকাণ্ড চলে এলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিকার। সম্প্রতি বনানীর একটি সিসা বারে যুবক খুন হওয়ার পর টনক নড়ে প্রশাসনের। ওই ঘটনার পর থেকে বন্ধ রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় থাকা সিসা বার। এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানে একযোগে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ের উপপরিচালক শামীম আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘৩৬০ ডিগ্রি’ সিসা বারের আগের নাম ছিল ‘অ্যারাবিয়ান কোজি’। যা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে বন্ধ হয়ে যায়। দুই দফা মামলা দেওয়া হয় তাদের নামে। পরে কৌশলে নতুন নামে একই ধরনের অবৈধ ব্যবসা শুরু করে মালিকপক্ষ।
তিনি বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বল্পতার কারণে অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। তারপরও আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজধানীর গুলশান-বনানী ও ধানমন্ডি এলাকায় ৩০ থেকে ৪০টি সিসা বার রয়েছে। এগুলোর তালিকাও সব সংস্থার কাছে আছে। এখানে সিসার হুক্কার ভেতরে গাঁজাও সেবন করা হয়। পাশাপাশি নিয়মিত ইয়াবার আসর বসানো হচ্ছে। এছাড়া রাত গভীর হলে চলে অসামাজিক কার্যক্রম। খদ্দেরের তালিকায় রয়েছে পয়সাওয়ালা পরিবারের সন্তানরা।
তিনি বলেন, সিসা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ‘খ’ শ্রেণির মাদক কন্ট্রোল আইটেম। এটাকে আবার নিকোটিন-জাতীয় মাদকও বলা চলে। সাধারণ সিসার ফ্লেভারে শূন্য দশমিক ২ শতাংশের ওপরে নিকোটিন পাওয়া গেলেই তাকে মাদক হিসেবে গণ্য করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অন্তত ২৩টি অভিযানে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নিকোটিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ‘সিসা’ বা ‘হুক্কা’ সামাজিকভাবে বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী দেশে সিসা বার পরিচালনার কোনো বৈধ অনুমতি নেই। তবুও শহরের অভিজাত এলাকায় লাইটিং ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার আড়ালে চলে এসব বার। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীÑ এমনকি চাকরিজীবী তরুণদেরও যাতায়াত থাকে এসব স্থানে। অধিকাংশ সিসা বার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। নামমাত্র খাবারের আড়ালে বসে নেশার আসর। শুধু ফ্লেভারযুক্ত তামাক নয়, সিসার সঙ্গে মেশানো হয় ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলের নির্যাস কিংবা লিকুইড কোকেন।
গত ১৪ আগস্ট ভোরে বনানীর একটি বহুতল ভবনে ‘৩৬০ ডিগ্রি’ নামে একটি সিসা বারের সিঁড়িতে কথাকাটাকাটির জেরে রাব্বি নামের এক তরুণ খুন হন। এ ঘটনায় সিসা বার নিয়ে নতুন করে শুরু হয় বিতর্ক।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সিসার ফ্লেভারে রয়েছে নিকোটিন। ‘লেডি কিলার’, ‘লাভ সিক্সটি সিক্স’, ‘হ্যাভানা লাইট’, ‘অরেঞ্জ মিন্ট’ ও ‘স্ট্রবেরি’- সব ফ্লেভারেই মেলে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নিকোটিন।
বাংলাদেশ বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেজর (অব.) জাহাঙ্গীর আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আরব দেশের আদলে দেশে সিসা বার চালুর আলোচনা থাকলেও অনুমোদন মেলেনি। অথচ আবাসিক ভবনেও গড়ে উঠছে সিসা বার। এর দায় পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরেরও রয়েছে। আইনে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সিসা বারগুলো অবাধে চলছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, বাংলাদেশে সিসা বার পরিচালনার কোনো বৈধ অনুমতি নেই, তাই লাইসেন্স নিয়ে চালানোর প্রশ্নই আসে না। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সিসা বার বন্ধের এখতিয়ার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হলেও অবৈধ কার্যক্রম চললে পুলিশ অভিযান চালায়।
এ বিষয়ে র্যাব-১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান জানান, শিগগির অবৈধ সিসা বারের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কোনোভাবেই এই অবৈধ কার্যক্রম করতে দেওয়া হবে না।
সিসা ক্ষতিকারক মাদক কি না- এ বিষয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর মধ্যে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যেসব বারে সিসার মধ্যে নিকোটিনের পরিমাণ শূন্য দশমিক ২-এর নিচে, সেসব বারে অভিযান চালানো যাবে না। এর চেয়ে বেশি পরিমাণের নিকোটিন থাকলে অভিযান পরিচালনা করা যাবে। পরিমাণগত সমস্যার কারণে সিসা বারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালানো নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ অনুযায়ী, সিসাকে মাদকদ্রব্যের ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ আইনে সিসা বার পরিচালনা ও সেবন সম্পর্কিত অপরাধ প্রমাণ হলে ন্যূনতম এক বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া নগদ অর্থদণ্ডেরও বিধান রাখা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অরূপ রতন চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সিসা মূলত হারবাল ড্রাগ। এর মাধ্যমে তরুণদের কোকেন, হেরোইন ও ইয়াবার মতো মাদকে টেনে নেওয়া হয়। তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মনে করছে এটি তাদের সামাজিক অবস্থান বৃদ্ধি করে। শুধু উচ্চবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরাও এই ফাঁদে পড়ছে। সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং মাদকের অপব্যবহার নিয়ে প্রচারণার মাধ্যমেই তরুণ সমাজকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই ইস্যুতে অপরাধ বিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সিসা যুবসমাজকে গ্রাস করছে, এখনই পদক্ষেপ না নিলে এগুলো মাদক ও গ্যাং কালচারের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হবে।