সাংবাদিক তুহিন হত্যা
রেজাউল করিম, গাজীপুর
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৫ ২২:৪৮ পিএম
নিহত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন। প্রবা ফটো
পেশাদারিত্বই যেন কাল হয়ে দাঁড়াল সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের। সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবের ভিডিও ধারণ ও সত্য উন্মোচনের ইচ্ছাকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে চিরতরে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ঘাতকদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এখনও একজনকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
গত বৃহস্পতিবার রাত ৭টার দিকে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় বাদশা নামে এক যুবককে ধারালো অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করছিল সন্ত্রাসীরা। সেই ঘটনা শত শত মানুষ দেখছিলেন, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেননি। তবে আসাদুজ্জামান তুহিন সেটির ভিডিও ধারণ করেছিলেন। এটি দেখে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। হত্যার পরেও কয়েক মিনিট ঘটনাস্থলে অস্ত্র উঁচিয়ে বীরদর্পে অবস্থান করে। তবে মূল ভিকটিম বাদশা এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দাড়িওয়ালা ও মাথায় ক্যাপ পরা ফয়সাল ওরফে কেটু মিজান চাপাতি হাতে দৌড়াচ্ছে। তার সঙ্গে শাহজামাল, বুলেট ও সুজনসহ আরও কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, চিহ্নিত আসামিদের গ্রেপ্তারে একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুরের চৌরাস্তা এলাকায় একাধিক ‘ফিটিংস পার্টি’ রয়েছে। তারা চাঁদাবাজি ও ছিনতাই করে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার কিছু আগে এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলেন বাদশা মিয়া নামে এক চাকরিজীবী। টাকা তোলার সময় ফিটিংপার্টি তাকে অনুসরণ করে। তাদের এক নারী সদস্যকে বাদশার পেছনে লেলিয়ে দেয় এবং সিনক্রিয়েট করে। পরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিমপাড় থেকে অস্ত্র হাতে বাদশাকে ধাওয়া করে ফিটিং পার্টির সদস্যরা। এ সময় সাংবাদিক তুহিন সেটি দেখে ভিডিও করেন। ভিডিও করায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে আমরা পাঁচজনকে সনাক্ত করতে পেরেছি। কিন্তু এখনও তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। ঢাকা ও ঢাকার বাহিরে তিনটি জায়গায় আমাদের টিম অভিযান চালাচ্ছে। তিনি বলেন, এই ঘটনায় দুই ভিকটিম দুজন, একজন হলেন বাদশা মিয়া। তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও ভিকটিম বাদশার সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি ভিডিও করায় সাংবাদিককে হত্যা করা হয়।
এদিকে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে তাদের মিলিয়ে শনাক্তকরণের কাজ চলছে। আটককৃতরা সবাই ছিনতাইকারী বলে জানা গেছে।
তুহিন হত্যার ঘটনায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছে গাজীপুরের সাংবাদিক ইউনিয়ন। শুক্রবার (৮ আগস্ট) সকালে গাজীপুর প্রেস ক্লাবের সামনে এই প্রতিবাদ সভায় তুহিনকে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান স্থানীয় সাংবাদিকরা। এ সময় গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি ও ছিনতাইকারীদের মদদদাতাদেরও চিহ্নিত করার দাবি জানান তারা।
সাংবাদিক তুহিনকে যেখানে কুপিয়ে হত্যা করা হয়Ñ তার পাশেই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর চান্দনা মসজিদ মাঠে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নেমেছিল। পরে সাংবাদিকের মরদেহ বেলা ৩টার দিকে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে সাংবাদিক তুহিনের হত্যার ঘটনায় তার ভাই মো. সেলিম গাজীপুর মেট্রোপলিটনের বাসন থানায় মামলা করেছেন। তিনি বলেন, আমার ছোটভাই একজন সৎ সাংবাদিক, তাকে হত্যা করেছে, এর বিচার চাই। ওর দুটি ফুটফুটে ছোট সন্তান রয়েছে। ওদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে। ওদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে।
সাংবাদিক তুহিন হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে এনসিপি ও গণঅধিকার পরিষদ। এ ছাড়াও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে বাসন থানায় যান। এ সময় পুলিশকে উদ্দেশ করে তারা বলেন, এদেরকে গ্রেপ্তার করতে না পারলে আপনাদের থানায় দায়িত্ব পালনের দরকার নেই।