প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৫ ০৯:২২ এএম
রাজনৈতিক একটি মহলের নির্দেশনায় সম্প্রতি দেশে ফিরে এক সন্ত্রাসী নাশকতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির নানামুখী তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে সে নানা যোগসাজশে অস্থায়ী জামিনও বাগিয়ে নিয়েছে।
উল্লেখ্য, ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বছর না ঘুরতেই ছলে-বলে-কৌশলে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অপতৎপরতা শুরু করেছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হলেও নানা কায়দায় তারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যার কিছু কিছু নজিরও সাম্প্রতিককালে দৃশ্যমান হয়েছে। গত মাসেই রাজধানীর একটি কনভেনশন সেন্টার থেকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের ২২ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যাদের বিরুদ্ধে সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে গোপন বৈঠক আয়োজনের অভিযোগ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই বৈঠকে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মেজর সাদিক নামে একজন সেনা কর্মকর্তাকে হেফাজতে নিয়েছে সেনাবাহিনী।
একইভাবে দেশের নানা প্রান্তে নিষিদ্ধ-ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ মিলছে। এমনকি ৫ আগস্টের পর বিদেশে পালিয়ে যাওয়া নেতাদের কেউ কেউ সাম্প্রতিককালে দেশে ফিরে এসে নানা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। একই অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগের নেতা, সন্ত্রাসী তারিকুল ইসলাম মোঘলের বিরুদ্ধেও। সম্প্রতি সে দেশে ফিরে এসে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ওই এলাকায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ কাজে স্থানীয় বিএনপিরই একটি অংশ তাকে মদদ দিচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ৫ আগস্টের পর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রূপগঞ্জে কার নেতৃত্বে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছেÑ সেই প্রশ্ন সবার মুখে মুখে। বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। জানা যায়, কাঞ্চন পৌরসভার সাবেক মেয়র ও যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলামের ভাই এবং আওয়ামী সন্ত্রাসী তারিকুল ইসলাম মোঘলই নেতৃত্ব দিচ্ছে দুই শতাধিক সশস্ত্র আওয়ামী ক্যাডারকে। আর এ কাজে মোঘলকে অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে তার অন্য তিন ভাই রফিকুল ইসলাম, সফিকুল ইসলাম এবং আমিনুল হক খোকন। এদের মধ্যে সফিকুল ইসলামের নামে খুন, গুম, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজিসহ ২০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীরা গা ঢাকা দিলেও বিএনপির একাংশের সরাসরি মদদে রূপগঞ্জে আওয়ামী সন্ত্রাসী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে মোঘল গং। যদিও বিএনপির অনেক নেতাকর্মী মনে করেন, পতিত আওয়ামী লীগের ‘ক্যানসার’ হিসেবে পরিচিত মোঘলকে এভাবে ‘পুনর্বাসনের’ সুযোগ করে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না।
সম্প্রতি রাজধানীর পার্শ্ববর্তী ৩০০ ফিট এলাকার পূর্বাচলে একের পর এক সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংঘটিত হচ্ছে, আর এসব কিছুর পেছনের মূল হোতা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে তারিকুল ইসলাম মোঘল। এলাকাটিতে ঘুরতে যাওয়া দর্শনার্থীদের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র হাতিয়ে নিচ্ছে ওই সন্ত্রাসী বাহিনীটি।
এ ছাড়াও ওই এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয় আর চাহিদামতো চাঁদা দিতে ব্যর্থ হলেই গুমের শিকার হতে হয় ভুক্তভোগীদের।
পূর্বাচল এলাকা সন্ধ্যার পরপরই জনমানবহীন হয়ে যাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে এই সন্ত্রাসী বাহিনী, আর এই বাহিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের ডন তারিকুল ইসলাম মোঘল।
গত বছর ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের কিছুদিন আগে দেশত্যাগ করলেও বর্তমানে দেশে ফিরে আবারও খুন, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, জমি দখলসহ নানা অপরাধে লিপ্ত হয়েছে একাধিক মামলার ফেরারি আসামি আওয়ামী সন্ত্রাসী মোঘল।
গত বছর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে অর্থ ও অস্ত্রের জোগানদাতা কীভাবে দেশে ফিরল এবং ইমিগ্রেশন পার হলো তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এলাকায় সাধারণের মধ্যেও এ নিয়ে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঞ্চন পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামের ভাই মোঘল এখন যুবলীগ নেতা থেকে বিএনপির ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে। অথচ তার অতীত কর্মকাণ্ড ছিল কট্টর বিএনপিবিরোধী।
রূপগঞ্জ থানা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৪ এপ্রিল প্রতারণার অভিযোগে মোঘলের নামে নারায়ণগঞ্জ আদালতে দুটি সিআর মামলা দায়ের হয়, মামলা দুটি এখনও তদন্তনাধীন রয়েছে। এ ছাড়া রূপগঞ্জ থানায় ২০২৩ সালেও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তার নামে একটি মামলা (মামলা নং-৩১৬) দায়ের হয়। তার বিরুদ্ধে বাছির হত্যা মামলা, বাদশা মেয়রকে হত্যাচেষ্টা ও আবুল বাশার মেয়রকে মারধরের অভিযোগেও রূপগঞ্জ থানায় মামলা রয়েছে। এ ছাড়াও একই থানায় তার নামে ২০০৯ সালে মারামারির অভিযোগে অপর একটি মামলা (মামলা নং-৩৯) দায়ের করেন এক ভুক্তভোগী।
স্থানীয় সূত্র জানায়, অন্তত দেড় ডজন মামলার আসামি হওয়ার পরও প্রতিবারই মোঘল থেকেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হওয়ার সুবাদে ও বড় ভাই মেয়র হওয়ার কারণেও সে প্রতিবার পার পেয়েছে। পুলিশের কাছেও পেয়েছে বাড়তি সুবিধা। অথচ একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা ছিল তার।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ভূমিদস্যুতার মাধ্যমে মোঘল এখন শতকোটি টাকার মালিক। চলাফেরা করে বিলাসবহুল গাড়িতে। বসবাসের জন্য তৈরি করেছে প্রাসাদোপম বাড়ি। বানিয়েছে চোখধাঁধানো ডিজাইনের বাগানবাড়ি। যেখানে নিয়মিত বসে আনন্দ জলসা। অথচ দৃশ্যমান কোনো আয় না থাকলেও খাসজমি দখল, অন্যের জমি জবরদখল করে বিক্রি করাই মোঘলের প্রধান কাজ।
গত সরকারের আমলে নানান অপকর্ম চালিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে মোঘল বাহিনী। স্থানীয়দের অভিযোগÑ সম্প্রতি দেশে ফেরার পর ফের আগের রূপে তাকে দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঞ্চন পৌর এলাকায় মোঘল বাহিনীর রয়েছে অবৈধ অস্ত্রের বিশাল ভান্ডার। দেশি-বিদেশি পিস্তল, শটগান, দা-ছুরিসহ নানা অস্ত্রে সজ্জিত থাকে এই বাহিনী। মোঘলের ফাঁসির দাবিতে কাঞ্চন এলাকায় বহুবার বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন হয়েছে। মোঘলের ছোট ভাই শফির বিরুদ্ধেও রয়েছে ট্রিপল মার্ডারের অভিযোগ।
সম্প্রতি মোঘল দেশে ফেরায় আতঙ্কে দিন পার করছেন স্থানীয়রা। যদিও তার ভয়ে এখনও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ অনেকেই। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, কেন্দুয়া এলাকায় তৈরি মোঘলের সুরম্য অট্টালিকা সবার নজর কাড়ে। বাইরে নামফলকে লেখা ‘তাওহিদ নূর প্রাসাদ’। হোল্ডিং নম্বর-০১৭৬০০। এই বাড়িতে এখনও বসে অবৈধ জুয়ার আসর। চলে ক্যাসিনো। দেশে ফেরার পর তাকে ওই বাড়িতে বসবাস করতে দেখা না গেলেও গভীর রাতে সেখানে তার আসা-যাওয়া রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
কাঞ্চন পৌর এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোঘলের বাহিনীতে রয়েছে অবৈধ অস্ত্রধারী দুই শতাধিক ক্যাডার। তার ক্যাডার বাহিনীর ভয়ে তটস্থ থাকেন ওই এলাকার মানুষ। মোঘলের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগেরও শেষ নেই। কাঞ্চন পৌর এলাকা ও কেন্দুয়ার মানুষ যেন এই মোঘল ‘সাম্রাজ্য’-এর প্রজা!
এই অপরাধী নানা যোগসাজশের মাধ্যমে স্থায়ী জামিন লাভেরও অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।