প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৫ ০৯:৫৩ এএম
রাজধানীর পুরান ঢাকায় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে ব্যবসায়ী
সোহাগ নৃশংসভাবে খুন হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
শিক্ষার্থীরা। এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে গতকাল শনিবার বিক্ষোভ করেছে সারা
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকেও ওঠে প্রতিবাদের
ঝড়। এদিকে মিটফোর্ডে
ব্যবসায়ী সোহাগকে হত্যা এবং সারা দেশে চাঁদাবাজি, দখলদারি, হামলা-হত্যার প্রতিবাদে
মশাল মিছিল করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
এদিন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভে অর্ধশতাধিক
শিক্ষার্থী অংশ নেন। ‘ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থী সমাজ’-এর ব্যানারে
এ বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভ চলাকালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘কণ্ঠে আবার লাগা
জোর, চাঁদাবাজের কবর খোঁড়, ‘চাঁদাবাজ চাঁদা তোলে, ইন্টেরিম কী করে?’, ‘চব্বিশের হাতিয়ার
গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘কে দিলোরে জানোয়ার, মানুষ মারার অধিকার’ বলে স্লোগান দেন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) শিক্ষার্থীরাও দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভ
করেছেন। এ সময় ইডেন কলেজ, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভ করেন।
ঢাবি প্রতিবেদক জানান, ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যা ও দেশব্যাপী বিএনপির অব্যাহত
চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীরা। গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়ায় এ বিক্ষোভ
মিছিল হয়।
ঢাবি শিক্ষার্থী এবি জুবায়ের বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে আমরা দেশকে গোছানোর
চেষ্টা করেছি। এ পথে একমাত্র বাধা হয়েছে একটি মাত্র দল। সোহাগকে গত পরশু দিন (বুধবার)
হত্যা করা হয়েছে। আজ (শুক্রবার) ভিডিও সামনে এসেছে। একজন ব্যবসায়ী চাঁদা দেয়নি বলে
যুবদল নেতা পাথর মেরে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। আমরা কি নতুন করে আবার প্রস্তরযুগে ফিরে
গেলাম?’ তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনার দলকে আপনি সামলান। আওয়ামী লীগের
পথ অনুসরণ করবেন না। যদি করেন, তাহলে আওয়ামী লীগের মতো পরিণতি হবে।’
জাবি প্রতিবেদক জানান, সোহাগ হত্যা ও সারা দেশে অব্যাহত চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসবাদের
বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা।
গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় ‘সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য’ ব্যানারে মিছিলটি অনুষ্ঠিত হয়।
জবি প্রতিবেদক জানান, ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যা ও দেশব্যাপী অব্যাহত বিএনপির
চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের
(জবি) শিক্ষার্থীরা। গত শুক্রবার রাত ৯টায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে
থেকে এ বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি রায়সাহেব বাজার ও তাঁতীবাজার অতিক্রম করে মিটফোর্ড
হাসপাতালের সামনে গিয়ে পৌঁছে।
ঢাকার বাইরে গত শুক্রবার রাতে সোহাগ হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে জাতীয় কবি
কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি),
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি), মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি), বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে
বিক্ষোভ করেছেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। এসব বিক্ষোভে হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির
দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকেও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া
শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম তার ফেসবুকে লেখেন, ‘সোহাগের মতো একজন ব্যবসায়ীকে যেভাবে নির্মমভাবে
হত্যা করা হলো, তা শুধু ভয়ংকর নয়, এটা আমাদের রাজনৈতিক অসভ্যতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। আমরা
এর বিচার চাই!’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুজাহিদ হাসান লিখেছেন, ‘আজ একজন সোহাগ
খুন হয়েছে, কাল হয়তো আমরা কেউ হব। রাজনীতি যদি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে না পারে,
তবে সে রাজনীতি ব্যর্থ।’ এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমজুড়ে আরও দেখা গেছে
#JusticeForSohag এবং #WeWantJustice হ্যাশট্যাগে হাজারো পোস্ট। কেউ কেউ প্রোফাইল পিকচার
বদলে প্রতিবাদী ছবি দিয়েছেন, কেউ আবার প্রতিবাদী ভিডিও বানিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন
প্লাটফর্মে।
গত বুধবার রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়
ভাঙ্গারি পণ্যের ব্যবসায়ী সোহাগকে। হত্যার আগে ডেকে নিয়ে তাকে পিটিয়ে এবং ইট-পাথরের
টুকরা দিয়ে আঘাত করে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র
করা হয়। তার শরীরের ওপর উঠে লাফাতেও দেখা যায়। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার
করার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর
আলম চৌধুরী ও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এ ঘটনায় যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের
নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার কথা জানা গেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এ মামলার দুজনকে বহিষ্কারের
কথা জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী যুবদল। হত্যা মামলার আরও দুই আসামিকে নিজেদের সংগঠন থেকে
বহিষ্কার করেছে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল।
সোহাগ হত্যার
প্রতিবাদে বৈষম্যবিরোধীদের মশাল মিছিল
মিটফোর্ডে ব্যবসায়ী
সোহাগকে হত্যা এবং সারা দেশে চাঁদাবাজি, দখলদারি, হামলা-হত্যার প্রতিবাদে মশাল মিছিল
করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় মিছিলটি শাহবাগ মোড় থেকে
শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে শহীদ মিনারে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে
শেষ হয়।
এ সময় ‘চাঁদাবাজদের
ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘চাঁদাবাজদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘দালালি
না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ, ‘যেই হাত মানুষ মারে, সেই হাত ভেঙে দাও’, ‘আবু সাইদ মুগ্ধ,
শেষ হয়নি যুদ্ধ’ইত্যাদি স্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র
আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ বলেন, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা এখনও ঘরে ফিরে যায়নি। হাসিনার
আমলে মিডিয়াগুলোকে কব্জা করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখন হাসিনা চলে গেলেও মিডিয়াগুলো
কোল পরিবর্তন করে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের কোলে স্থান করে নিয়েছে। মিটফোর্ডের হত্যা
বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পশ্চাৎগামী ধারারই অংশ, যেখানে
ছাত্র রাজনীতিকে চাঁদাবাজি ও খুনের পৃষ্ঠপোষক বানানো হয়েছে। আমরা বিএনপিকে স্পষ্ট
করে বলে দিতে চাই, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নাম করে যারা সন্ত্রাসে মদদ দেয়,
তাদেরও প্রতিরোধ করা হবে।
সংগঠনের সাধারণ
সম্পাদক হাসান ইনাম বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে, এই দেশের মানুষ দখলবাজদের
বিরুদ্ধে কতটা সোচ্চার হতে পারে। মুখোশধারী চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে, নিপীড়নের রাজনীতির
বিরুদ্ধে আজ সেই ঐক্য আবার গড়ে তুলতে হবে। ছাত্রসমাজকে এই সংগ্রামে সম্মিলিত হতে হবে।
এর আগের দিন বেলা
১১টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র
আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ বলেন, ‘প্রতিটি খুন, প্রতিটি হামলা, মামলার ঘটনার পেছনে
একটি রাজনৈতিক ইন্ধন জড়িত। রাজনৈতিক শেল্টার ছাড়া এই ঘটনাগুলো আসলে ঘটছে না। এই রাজনৈতিক
শেল্টার, এই রাজনৈতিক শক্তি আসলে এ ধরনের হায়েনাদের, এ ধরনের দানবদের তৈরি করছে।’
তিনি বলেন, ‘গতকাল
(বুধবার) একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, সোহাগ নামের এক ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে
হত্যা করা হয়েছে। সেই লাশের ওপর নৃত্য করা, এগুলো আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময় শোনা গেছে।
বাংলাদেশে সেই আইয়ামে জাহেলিয়াত ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র চলমান।’
তিনি অভিযোগ করে
বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে
নানাবিধ ষড়যন্ত্র করছেন। সেই ষড়যন্ত্রে পা দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এখনও দেখা যাচ্ছে,
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে যখন মিছিল হয় তখনও তাদের শিবির, জঙ্গি, অপচেষ্টাকারী, বিএনপি-বিরোধী,
বাংলাদেশ-বিরোধী, হাসিনাপন্থি, ছাত্রলীগ, সাবেক ছাত্রলীগ নানাবিধ ট্যাগের মাধ্যমে বিতর্কিত
করা হচ্ছে। এই ট্যাগিংপন্থা হলো শেখ হাসিনার স্টাইল।’
বিএনপি নেতৃত্বের
অনেকেই স্বৈরাচারী শাসনামলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছিলেন
বলেও অভিযোগ তোলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নতুনভাবে
কাউকে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে দেওয়া হবে না।