তানভীর হাসান
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৫ ১৫:৫৩ পিএম
প্রতীকী ছবি
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত মানি এক্সচেঞ্জগুলো ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধী চক্র। অপ্রত্যাশিতভাবে এসব প্রতিষ্ঠান ঘিরে বেড়েছে ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণের ঘটনা। পেশাদার অপরাধীরা বড় অঙ্কের টাকা লেনদেনের খবর পাওয়া মাত্রই হানা দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে মানি এক্সচেঞ্জের কর্মচারীদেরও কেউ কেউ অপরাধীদের কাছে আগাম তথ্য সরবরাহ করছেন। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান হন্ডির টাকা পরিবহন করায় এড়িয়ে চলছে পুলিশি সহায়তা। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা থেকে ছিনতাইকারীরা একটি মানি এক্সচেঞ্জের ৫ লাখ রিয়াল লুট করে। অবশ্যই এরই মধ্যে পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, উদ্ধার করেছে প্রায় আড়াই লাখ রিয়াল। তবে এর আগেও রাজধানীর মিরপুর, ধানমন্ডি ও গুলশানে এ ধরনের আরও ৬টি ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ৬২৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লাইসেন্সধারী ২২৫টি মানি এক্সচেঞ্জ ঘিরে বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা। অবৈধ বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে দেশব্যাপী বৈধ মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছিনতাই, ডাকাতি এবং হয়রানি বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশি টহল ও নজরদারি বাড়ানো, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করাসহ নানা দাবি তুলে ধরেছেন সংগঠনের নেতারা। সম্প্রতি তারা এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষে দাবি করা হয়, গত কয়েক মাসে ঢাকার ৬টি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় আসামি ধরা পড়লেও টাকা ফেরত পাচ্ছেন না তারা। এসব কারণে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো নানা হুমকির মুখে পড়ছে বলেও তারা জানান।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মানি এক্সচেঞ্জগুলো ঘিরে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে ডিবির যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ছিনতাইকারীরা মানি এক্সচেঞ্জ ঘিরে তৎপর থাকে। তাদেরও সোর্স নিয়োগ করা থাকে। ওই সোর্সের মাধ্যমেই তারা টাকা পরিবহনের আগাম খবর পেয়ে যাচ্ছে। মোটা অঙ্কের টাকা পরিবহনের ক্ষেত্রে বারবার জনসাধারণকে পুলিশের সহায়তা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও অনেকে তা মানছেন না। এ কারণে অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে।’
জানা গেছে, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলোর একটি গ্রুপ মানি এক্সচেঞ্জ এলাকায় অবস্থান করে এবং যারা বেশি টাকা বহন করে তাদের টার্গেট করে। মানি এক্সচেঞ্জার থেকে টাকা নিয়ে কেউ বের হলে সেই তথ্য তারা তাদের সহযোগী মোটরসাইকেলে অবস্থানকারী গ্রুপকে দেয়। এর পর সুবিধাজনক স্থানে ফাঁকা গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।’
সূত্রমতে, গত কয়েক মাসে শুধু মিরপুর থেকেই তিন মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা লুটে নিয়েছে সন্ত্রাসীরা। প্রথমে জিসান, পরে প্রাণ, সবশেষ মাহমুদ মানি এক্সচেঞ্জের মালিকের ওপর গুলি ছুড়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ছিনতাইয়ের এসব ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ভাইরাল হলে টনক নড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর।
জানা গেছে, গত ২৭ মে সকাল সাড়ে ৯টায় মিরপুর ১০ নম্বর স্টেডিয়ামসংলগ্ন আব্দুল বাতেন রোডের মুখে আগে থেকেই ওঁতপেতে থাকা সন্ত্রাসীরা মাহমুদ মানি এক্সচেঞ্জের মালিক জাহিদুর রহমানকে ছুরিকাঘাত ও পরে গুলি ছুড়ে ২২ লাখ টাকা ছিনতাই করে পালিয়ে যায়। এর তিন সপ্তাহ আগে গত ৩ মে রাতে অস্ত্রধারীরা প্রাণ মানি এক্সচেঞ্জের মালিক থেকে ছিনিয়ে নেয় ৫০ লাখ টাকা।
প্রাণ মানি এক্সচেঞ্জের মালিক আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘এ ঘটনার পর কয়েক দিন পুলিশি তৎপরতা ছিল। পরে তা থেমে গেছে। এমনকি এ ঘটনায় অভিযোগ দেওয়া হলেও এখনও মামলা হয়নি। কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি।’
এর আগে গত ১৫ জানুয়ারি রাতে মিরপুরে আরেকটি মানি এক্সচেঞ্জের ৭৪ লাখ টাকা ছিনতাই হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জিসান মানি এক্সচেঞ্জের কর্মচারীরা রাতে টাকা নিয়ে মালিকের বাসায় যাচ্ছিলেন। সেসময় সনি সিনেমা হলের উল্টো পাশে আড়ংয়ের সামনে তিন মোটরসাইকেলে ৯ জন অস্ত্রধারী গুলি ছুড়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।
জানা গেছে, এসব ঘটনার আগে ও পরে ধানমন্ডির ডেন্টা ব্যুরো ডি চেঞ্জ লিমিটেড, গুলশান-২-এর সিটি মনিটারি এক্সচেঞ্জ প্রা. লিমিটেড ও গুলশান-১-এর রাতুল মানি চেঞ্জারের মোটা অঙ্কের টাকা লুট হয়। এসব ঘটনায় পুলিশ এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার ও টাকা উদ্ধার করতে পারেনি।
গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক সূত্রমতে, বেশিরভাগ ঘটনার তদন্তে টাকার উৎসে হন্ডি কানেকশন পাওয়া গেছে। এ কারণে মালিকপক্ষও তদন্তে সহযোগিতা করছে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে টাকা পরিবহনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকেও তথ্য ফাঁস হয়েছে। পুলিশ বলছে, প্রতিটা ঘটনার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে। দ্রুতই আসামি গ্রেপ্তার এবং টাকা উদ্ধার করাও সম্ভব হবে।
এদিকে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বিপরীতে এসেনসিয়াল ড্রাগ অফিসের সামনে একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের ৫ লাখ রিয়াল লুট হয়; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় কোটি টাকা। বিষয়টি নিশ্চিত করে তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, ‘অস্ত্রের মুখে ওই প্রাইভেটকারটি জিম্মি করে টাকা লুট করা হয়। গাড়িতে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির তুহিন নামে এক কর্মচারী। এ ঘটনায় মানি এক্সচেঞ্জের মালিক ঠান্ডু মিয়া পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগ যৌথভাবে অভিযানে নামে।’
তিনি বলেন, ‘তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদে অস্ত্রের মুখে জিম্মি নাটকের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে রাতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে তুহিনসহ মোট ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার রিয়াল।’
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব প্রকৌশলী গৌতম দে বলেন, ‘সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত ৭টি মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হলেও এখন পর্যন্ত ছিনতাইকৃত অর্থ উদ্ধার হয়নি।’
বাংলাদেশ ব্যাংকে বারবার লিখিতভাবে অবৈধ প্রতিষ্ঠানের তালিকা জমা দিলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সরকারকে অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।