আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৫ ১০:০৯ এএম
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে গত শুক্রবার কয়েকজন বন্ধু ও এক নারীসহ আড্ডায় মগ্ন ছিলেন আলোচিত সন্ত্রাসী আলী আকবর। হঠাৎ করে চারটি মোটরসাইকেলে করে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি তাদের দিকে ছুটে আসে। মুহূর্তেই তারা অস্ত্র উঁচিয়ে আকবরকে লক্ষ করে গুলি ছোড়ে। পালানোর চেষ্টা করলেও তার শরীরে একে একে চারটি বুলেট বিদ্ধ হয়। এ সময় পাশে থাকা এক পথচারী ও একটি শিশুও আহত হয়।
তবে ঘটনার চেয়েও বেশি বিস্ময় সৃষ্টি করেছে আকবরের সঙ্গে থাকা নারীর আচরণ। গুলির মুহূর্তে তিনি হামলাকারীদের একটি মোটরসাইকেলের ওপর চেপে চলে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুরো ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। আকবরকে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে এক ধরনের কিলিং মিশন। আকবরকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তবে বাঁচানো যায়নি। ঘটনার দুদিন পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। আকবর চট্টগ্রামে ‘ঢাকাইয়া আকবর’ নামে বেশি পরিচিত।
এদিকে ঘটনার আগেই নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন আকবর। একটি টিকটক ভিডিওতে তিনি বলেছিলেন, ‘গনি কন্ট্রাকটরের ছেলে বড় সাজ্জাত খান এবং হাবীব খানের’ বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে তার জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। আকবরের ভাষ্য অনুযায়ী, এ কারণেই তাকে হত্যা করা হতে পারে।
আন্ডারওয়ার্ল্ডে চট্টগ্রামের ‘নতুন যুদ্ধ’
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে এমন পরিকল্পিত কিলিং মিশন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত ৯ মাসে অন্তত চারটি ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। সব ঘটনার পেছনে ঘুরেফিরে উঠে আসছে ‘এইট মার্ডার’-এর আসামি সাজ্জাত খানের নাম। ঢাকাইয়া আকবর মৃত্যুর আগে যে হাবীব খানের নাম তার টিকটক ভিডিওতে বলে গেছেন সেই হাবীব খানও এইট মার্ডারের আসামি ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এইট মার্ডারের সেই সন্ত্রাসী চক্র। যার জের ধরে একেরপর এক কিলিং মিশন পরিচালিত হচ্ছে। যার শিকার হচ্ছে তাদের বিপরীত বলয়ে থাকা আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেকটি চক্র। যার নেতৃত্বে আছেন সারোয়ার হোসেন। যিনি একসময় সাজ্জাত খানের শিষ্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে সংঘটিত ‘এইট মার্ডার’ মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন সাজ্জাত খান, হাবীব খানসহ আরও কয়েকজন শিবির ক্যাডার। ওই ঘটনায় ছাত্রলীগের ছয়জনসহ আটজন নিহত হয়েছিলেন। বিচারিক আদালতে সাজ্জাত খানসহ চারজনের মৃত্যুদণ্ড হয়, বাকি তিনজন হন যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত। কিন্তু ২০১৪ সালে হাইকোর্ট সাজ্জাত খানসহ চারজনকে খালাস দেয়।
খালাসের পর দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করলেও, সাজ্জাত খান ‘ম্যাক্সন’ নামের আরেকজনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। পরে দ্বন্দ্বের জেরে ভারতে খুন হন ম্যাক্সন। ধারণা করা হচ্ছে, এরপর থেকেই নিজের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাজ্জাত খান শুরু করেন একের পর এক কিলিং মিশন।
দুই বলয়ের সংঘর্ষ : সাজ্জাত বনাম সারোয়ার
এই কিলিং মিশনের মূল পটভূমি হিসেবে ধরা হচ্ছে সাজ্জাত খানের সঙ্গে তার একসময়কার শিষ্য সারোয়ার হোসেনের দ্বন্দ্ব। সারোয়ার বর্তমানে আরেক সন্ত্রাসী বলয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন এবং বেশ কিছু তরুণ অনুসারীকে নিয়েই চট্টগ্রামে সক্রিয়।
২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরীর অনন্যা আবাসিক এলাকা সংলগ্ন অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে মাসুদ কায়সার (৩২) ও মোহাম্মদ আনিসকে (৩৮) গুলি করে হত্যা দিয়ে এই ‘যুদ্ধের’ সূচনা হয়। নিহত দুজনই ছিলেন সারোয়ার হোসেনের ঘনিষ্ঠ। এরপর ২১ অক্টোবর চান্দগাঁও এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তাহসিনকে। তিনি ইট-বালুর ব্যবসায়ী এবং সারোয়ার ঘনিষ্ঠ বলয়ে ছিলেন।
২০২৪ সালের ২৯ মার্চ আরেকটি ভয়াবহ হামলার শিকার হন সরোয়ার নিজেই। নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে তার প্রাইভেটকার লক্ষ করে গুলি চালানো হয়। এ সময় তার দুই সহযোগী নিহত হলেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান সরোয়ার। পরে গ্রেপ্তার হওয়া এক আসামির জবানবন্দিতে উঠে আসে, এলাকাজুড়ে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণসহ পাঁচটি কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা এ হামলা চালান।
গত সোমবার আকবর হত্যার ঘটনায় পতেঙ্গা থানায় তার স্ত্রী রূপালী বেগম বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২-৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার পর রাতেই অভিযান চালিয়ে র্যাব-৭ চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানাধীন সিডিএ এলাকা থেকে সাজ্জাত খানের বড় ভাই ওসমান আলী ও ভাগনে মো. আলভীনকে গ্রেপ্তার করে।
এ বিষয়ে র্যাব-৭ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া) এ আর মোজাম্মেল জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত সোমবার রাত সোয়া ১১টায় চান্দগাঁও থানাধীন সিডিএ এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। পরে তাদের পতেঙ্গা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে অনেকেই মুখ খুলছেন না। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে এখন দুটি প্রধান বলয়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছেÑ একপক্ষে সাজ্জাত খান, অন্যপক্ষে সারোয়ার হোসেন।
নগরবাসীর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, বারবার এমন কৌশলী ও স্পষ্টভাবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে হুমকির মুখে ফেলছে। হানি ট্র্যাপ, প্রকাশ্যে গুলি, জবানবন্দি, ভিডিও বার্তাÑ সবকিছু মিলিয়ে এটি কেবল একটি খুন নয়, বরং বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।