× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শত শত গোপন বন্দিশালা

বিবিসি

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৫ ০৯:২৬ এএম

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৫ ১০:৫৫ এএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বহুল আলোচিত আয়নাঘর নামে কক্ষগুলোতে বন্দিদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। এসব অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রাকৃতিক আলো-হাওয়াবিহীন কক্ষগুলোকে করে তোলা হয়েছিল জীবন্ত কবর। অভিযোগ রয়েছে এখানে বৈদ্যুতিক শকসহ নানাভাবে বন্দিদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন চালিয়ে বিরুদ্ধ রাজনীতির কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার চেষ্টা চালানো হতো। থামিয়ে দেওয়া হতো ভিন্নমত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সব চেষ্টা।

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে সামনে আসে আয়নাঘর। একে একে উন্মোচিত হতে থাকে আয়নাঘর সম্পর্কে নানা তথ্য। দীর্ঘদিন গোপন বন্দিশালায় মানবেতর জীবন কাটানো ছয়জন বন্দির সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে গতকাল বুধবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে। 

বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের খুব কাছে একটি গোপন রহস্যময় নির্যাতন কক্ষের সন্ধান দেন আইনজীবী মীর আহমেদ বিন কাসেম। গুমের শিকার হয়েও ভাগ্যক্রমে ফিরে আসা মীর কাসেমের স্মৃতিচারণার সহায়তা নিয়ে তদন্তকারী দলটি খুঁজে পেয়েছে গোপন এ কারাগার। আট বছর বন্দি মীর আহমেদের চোখ বেশিরভাগ সময় বেঁধে রাখা হতো। এ অবস্থায় শোনা কিছু শব্দের কথা মনে করতে পারেন তিনি। যার মধ্যে উড়োজাহাজ অবতরণের শব্দ অন্যতম। সেই সূত্রই তদন্তকারী দলকে বিমানবন্দরের কাছে একটি সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। সেখানে তদন্তকারীরা ওই ঘাঁটির প্রাঙ্গণে থাকা প্রধান ভবনের পেছনে অপেক্ষাকৃত ছোট, সুরক্ষিত, জানালাবিহীন ইট ও কংক্রিটের একটি অবকাঠামো দেখতে পান। যেখানে বন্দিদের আটকে রাখা হতো।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কারাগারটিতে নতুন ইট বাঁধানো একটি প্রবেশপথের সন্ধান পাওয়া যায়; যা ছিল মূলত পেছনে লুকিয়ে থাকা জিনিস আড়াল করার একটি চেষ্টা। প্রবেশপথটি দিয়ে ভেতরে ঢুকলে, সরু করিডোর। ডানে-বাঁয়ে ছোট ছোট ঘর। চারপাশটা মিশমিশে অন্ধকার।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছের ওই গোপন কারাগারসহ যারাই এমন কারাগারগুলো চালাত, তাদের একটি হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ইউনিট র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।’ 

সাত মাস হলো মুক্তি পাওয়া আহমেদ বিন কাসেম বিবিসিকে বলেন, ‘আমার মনে হতো, আমাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। বাইরের জগৎ থেকে আমি ছিলাম পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।’

তিনি যে কক্ষে ছিলেন, সেটিতে প্রাকৃতিক আলো আসার কোনো দরজা-জানালা ছিল না। কক্ষটিতে থাকার সময় তিনি দিন-রাতের পার্থক্য বুঝতেন না।

দীর্ঘদিন তার বন্দি থাকা কক্ষটি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘টর্চলাইটের আলোয় দেখা গেল, কক্ষটি এত ছোট যে, স্বাভাবিক আকৃতির একজন মানুষের সেখানে সোজা হয়ে দাঁড়ানো কঠিন। ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। কিছু দেয়াল ভেঙে গেছে এবং ইট ও কংক্রিটের টুকরা মাটিতে ছড়িয়ে আছে। এটি যে অপরাধীদের (গুম করার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট) অপরাধের প্রমাণ ধ্বংস করার শেষ চেষ্টা, বোঝাই যায়।’

বিবিসির সঙ্গে আলাপে আরও পাঁচ ব্যক্তি বলেছেন, তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং হাতকড়া পরিয়ে কংক্রিটের তৈরি অন্ধকার কক্ষে রাখা হয়েছিল। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ তাদের ছিল না। তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছে।

৩৫ বছর বয়সি আতিকুর রহমান রাসেল বলেন, ‘গত জুলাইয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ যখন তীব্র আকার ধারণ করেছিল, তখন পুরান ঢাকার একটি মসজিদের বাইরে এক দল লোক তার দিকে এগিয়ে আসে। তারা নিজেদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।’ ওই লোকগুলো রাসেলকে বলেছিলেন, ‘তাকে তাদের সঙ্গে যেতে হবে।’

রাসেলকে কোথায় রাখা হয়েছিল এ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানার কোনো উপায় ছিল না।’

তবে চলতি বছরের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তিনটি আটককেন্দ্র পরিদর্শন করতে দেখার পর, তার মনে হয়েছে তাকে ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় রাখা হয়েছিল।

বিভিন্ন জায়গায় বন্দি থাকলেও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা অদ্ভূত রকমভাবে প্রায় একই রকম।

৭১ বছর বয়সি ইকবাল চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, তাকে বলা হয়েছিল ‘যদি আপনি কখনও কোথায় ছিলেন বা আপনার সঙ্গে কী ঘটেছিলÑ তা নিয়ে মুখ খোলেন এবং আপনাকে যদি আবার নিয়ে যাওয়া হয়, তবে আর কেউ আপনাকে খুঁজে পাবেন না বা দেখতে পাবেন না। আপনি এই দুনিয়া থেকে গায়েব হয়ে যাবেন।’

নিজের ওপর হওয়া নির্যাতন প্রসঙ্গে ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘আমাকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, মারধর করা হয়েছে। ইলেকট্রিক শকের কারণে এখন আমার একটি আঙুল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আমার পায়ের জোর কমে গেছে, শরীরের জোরও কমে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি এখনও আতঙ্কিত।’

২৩ বছরের রহমতুল্লাহও আতঙ্কে ভুগছেন। তিনি বলেন, ‘তারা আমার জীবন থেকে দেড় বছর কেড়ে নিয়েছে। ওই সময়টা আর কখনই ফিরে পাব না।’

রহমতুল্লাহ আরও যোগ করেন, ‘তারা আমাকে এমন এক জায়গায় রেখেছিল, যেখানে কোনো মানুষেরই থাকা উচিত নয়।’

বিবিসির পক্ষ থেকে আরও সাবেক দুই বন্দির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তারা হলেনÑ মাইকেল চাকমা ও মাসরুর আনোয়ার। তাদের দেওয়া তথ্যে গোপন বন্দিশালা এবং সেগুলোর ভেতরে তাদের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল, সেসব নিয়ে ধারণা লাভের চেষ্টা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য একটি বেসরকারি সংস্থা ২০০৯ সাল থেকে গুম হওয়া মানুষের তালিকা তৈরি করছে। তাদের তালিকা অনুযায়ী, অন্তত ৭০৯ জন গুম হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫৫ জন এখনো নিখোঁজ। গুমের ঘটনা নিয়ে তদন্ত করতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে একটি কমিশন গঠন করা হয়। ওই কমিশনের কাছে গুমের শিকার হয়েছেন দাবি করে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬৭৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। আরও মানুষ অভিযোগ নিয়ে আসছেন।

তবে এটা প্রকৃত সংখ্যা নয়। ধারণা করা হয়ে থাকে, মোট সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

এসব গোপন কক্ষে নির্যাতন করার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১২২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তবে কাউকে এখনও গ্রেপ্তার করা হয়নি।

গোপন কারাগার পরিদর্শনকালে বিবিসি প্রতিনিধির সঙ্গে থাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এটা (বিচার) সম্ভব এবং একদিন অবশ্যই হবে।’ বিবিসিকে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তারা অবর্ণনীয় কষ্ট করেছেন।’

চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেছেন, ‘(এটি) বন্দিশালাগুলোর একটি। দেশজুড়ে আমরা এমন ৫০০, ৬০০, ৭০০-এর বেশি সেলের সন্ধান পেয়েছি। এতে বোঝা যায়, এটি (গোপন কারা নেটওয়ার্ক) ছিল বিস্তৃত ও পদ্ধতিগত।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা