প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৫ ১০:৪৩ এএম
প্রতীকী ছবি
স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্ধশত বছরের বেশি সময় ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা ঝিনাইদহের ইতিহাসে চরমপন্থি নেতা, ক্যাডার ও সন্ত্রাসীদের জীবনের শেষ পরিণতি অস্বাভাবিক মৃত্যু। এ পর্যন্ত কারও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। এদের জীবনের করুণ পরিণতি খেজুরের পাটি বা চাটাইয়ে জড়িয়ে লাশ হয়ে বাড়ি ফেরা।
এ পর্যন্ত ঝিনাইদহে প্রতিপক্ষ ও দলীয় কোন্দলে দেড় সহস্রাধিক চরমপন্থি খুন হয়েছে বলে পুলিশের তথ্য ও নানা পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের দিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে গোপন রাজনীতি ও শ্রেণিশত্রু খতমের ‘আদর্শ’ ছড়িয়ে পড়ে। জাসদ গণবাহিনী, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি, সর্বহারা, শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন (গণমুক্তি ফৌজ), হক গ্রুপ, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিÑ এম-এল, এম-এল লাল পতাকা, এম-এল জনযুদ্ধ ও এম-এল যোদ্ধা, জনযুদ্ধসহ বিভিন্ন নামের পাশাপাশি বিভক্ত চরমপন্থি নেতাদের নামেও নিষিদ্ধ সংগঠন সক্রিয় হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পরপর সিরাজগঞ্জ, পাবনা, যশোর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, বগুড়া, রাজশাহী, রাজবাড়ী, নওগাঁয় মার্ক্স-লেনিন বা মাওবাদী আদর্শের অনুসারী গোপন দলের ঘাঁটি ছিল। কিন্তু ভাঙন, নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া এসব দলের কর্মকাণ্ড দিনে দিনে কমে আসে। আদর্শগত অবস্থান থেকে সরে গিয়ে অনেক সংগঠনের সদস্যরা জড়িয়ে পড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।
২০০৪ সালে র্যাব গঠিত হওয়ার পর তাদের অভিযানের মুখে এসব চরমপন্থি সংগঠন আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ২০০৫ সালে র্যাবের সঙ্গে কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা মোফাখখার চৌধুরী নিহত হন। ২০০৮ সালে নিহত হন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এম-এল লাল পতাকা) নেতা ডা. মিজানুর রহমান টুটুল ও এম-এল জনযুদ্ধে আবদুর রশীদ মালিথা বা দাদা তপন। র্যাব-পুলিশের অভিযানের মুখে কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে গেছেন। কেউ আত্মসমর্পণ করে আনসার বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন।
সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৪ মার্চ মেহেরপুর সদর উপজেলায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে চারজন সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী নিহত হয়।
২০০৯ সালের ১০ আগস্ট তৎকালীন গণবাহিনী নেতা ওবায়দুল ওরফে লাল তিনজনকে হত্যা করে তাদের কাটা মাথা কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের মেইন গেটে ঝুলিয়ে রাখে। সঙ্গে রেখে যায় চিরকুট। কয়েকদিনের মধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় গেটে আরেকজন গণমুক্তি ফৌজ ক্যাডারের কাটা মাথা রেখে যায় গণবাহিনী।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আধিপত্য বিস্তার ও শত শত কোটি টাকার টেন্ডারকে কেন্দ্র করে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
সূত্র বলছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে চরমপন্থিদের ব্যবহার করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। সে সময় চরমপন্থিদের গুলিতে নিহত হন কয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা জামিল হোসেন বাচ্চু। ১৫ আগস্ট ভেড়ামারায় একটি কাঙালি ভোজ অনুষ্ঠানে ব্রাশফায়ারে নিহত হন ভেড়ামারা আওয়ামী লীগের নেতা মেহেরুল ইসলাম ও তার বন্ধু বান্দা ফাতাহ মোহন।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার চরমপন্থিদের দমনে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। র্যাব-পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান চরমপন্থি সংগঠনের অনেকে। এসব সংগঠনের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা ভারতে পালিয়ে যান।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ভারতে পলাতক থাকা অবস্থায় প্রতিপক্ষের হামলায় দুই চরমপন্থি নেতা নিহত হন। তবে পরবর্তীতে গণমুক্তিফৌজ নেতা আমিনুল ইসলাম মুকুল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির নেতাদের যোগসাজশে কুষ্টিয়ার প্রায় সব অফিসের ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ বাস্তবায়ন করেন।
সূত্র জানায়, এই চরমপন্থি নেতা কখনও ভারতে, কখনও নেপালে, আবার কখনও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেন। এদিকে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেকটা ব্যাকফুটে চলে গেছেন মুকুল। এরই মধ্যে ভারত থেকে দেশে ফিরেছেন জাসদ গণবাহিনী নেতা কালু।
সূত্র বলছে, মুকুলের মতো কালু এবার কুষ্টিয়ার ঠিকাদারি কাজ, তামাকের ব্যবসা, হাট-ঘাটের দখল নিতে চাইছেন। এ কারণেই তিনি মানুষ খুনের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন।
কে এই ভয়ংকর কিলার কালু
গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঝিনাইদহের শৈলখুপায় রামচন্দ্রপুর শ্মশানঘাটে তিনজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০০৩ সালে এই একই স্থানে পাঁচজনকে হত্যা করে চরমপন্থিরা। এই ঘটনার পরপরই জাসদ গণবাহিনীর পক্ষে কালু পরিচয়ে হত্যার দায় স্বীকারের বার্তা দেওয়া হয় স্থানীয় সাংবাদিকদের মোবাইলে। এরপরই প্রশ্ন উঠে আসেÑ কে এই কালু?
চরমপন্থি নেতা কালুর সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ইবি থানাধীন আব্দালপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ইছাহক আলী মাস্টার। তবে স্থানীয়রা জানান, বহু বছর ধরে কালুর সঙ্গে তার পরিবারের যোগাযোগ নেই। তিনি জাসদ গণবাহিনীর সামরিক প্রধান।
নব্বই দশকে কুষ্টিয়া অঞ্চলের চরমপন্থি শাহিন-মুকুল বাহিনীর সদস্য ছিলেন এই সন্ত্রাসী। তাদের মধ্যে শাহিন ক্রসফায়ারে নিহত হন। আর মুকুল দেশের বাইরে থেকে বাহিনী পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, চরমপন্থি সংগঠনের আড়ালে এই সন্ত্রাসী কালু একের পর এক মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছেন। ১৯৯৮ সালে মিরপুর উপজেলার কলাবাড়িয়ায় পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বের জানান দেন কালু। একই বছর আলামপুর ইউনিয়নের দহকুলা গ্রামের তমছের ও মানা নামে দুজনকে প্রকাশ্যে নওয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গুলি করে হত্যা করেন তিনি। একই বছরে ঝিনাইদহ শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে নিজ গ্রামের রায়হান ও মজিদ মিয়াকে দিন-দুপুরে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করে এই চরমপন্থি সন্ত্রাসী।
১৯৯৯ সালে কুষ্টিয়া সদরের কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের জোতপাড়া গ্রামের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা শুকুর মালিথাকে গুলি ও গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০০২ সালে পূর্ব আব্দালপুরের তাছের নামে এক ব্যক্তিকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। দুটি হত্যাকাণ্ডেই উঠে আসে এই ভয়ংকর কিলার কালুর নাম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদার জানান, ২০০৯ সালের ৮ আগস্ট তিনজনকে হত্যা করে তাদের মাথা একটি ব্যাগে ভরে কুষ্টিয়া গণপূর্ত কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঝুলিয়ে রেখে যান কালু।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম আব্দালপুরের চেয়ারম্যান আনুকে ভারতে শ্বাসরোধ ও গলা কেটে হত্যা করেন জাসদ গণবাহিনীর সামরিক শাখার প্রধান এই কালু। এরপর থেকেই আতঙ্ক হিসেবে কালুর নাম কুষ্টিয়া ও আশপাশের জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
সূত্র জানায়, কালু বেশ কয়েক বছর ধরে ভারতে পালিয়ে ছিলেন। ভারতীয় পুলিশের হাতে আটক হয়ে তিনি কিছুদিন পশ্চিমবঙ্গের দমদম কারাগারে বন্দিও ছিলেন। এই ভয়ংকর সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন ভারতে আত্মগোপনে থেকে সম্প্রতি এলাকায় ফিরেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
চরমপন্থিদের ঝিনাইদহকেন্দ্রিক তৎপরতা
সেভেন মার্ডার, ফাইভ মার্ডারসহ বিভীষিকাময় নানা হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর ঝিনাইদহে সম্প্রতি ঘটে গেল ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা।
চরমপন্থি সংগঠনের নেতা আব্দুর রশিদ মালিথা ওরফে দাদা তপন, মীর ইলিয়াস হোসেন দিলিপ, ডা. মিজানুর রহমান টুটুল, আনোয়ার হোসেন দেব- বিভিন্ন চরমপন্থি সংগঠনের নেতাদের বাড়ি ঝিনাইদহে। এ ছাড়া কমরেড আব্দুল হক, কমরেড মোফাখখার চৌধুরীসহ বামপন্থি তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে পরিচিত অনেকের বিচরণক্ষেত্র ছিল এই জেলা।
অস্ত্র ছিনতাই, পুলিশের ক্যাম্প লুট, প্রতিপক্ষের অস্ত্র ভাণ্ডার লুট, সম্মুখযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যন্ত পল্লীগুলোতে। আশির দশকের শেষ দিকেও সেভেন মার্ডার, ফাইভ মার্ডার, ট্রিপল মার্ডারসহ চরমপন্থি গ্রুপগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ঝিনাইদহে রক্তের হোলিখেলা চলতে থাকে।
১৯৯৮ সালে ঝিনাইদহে প্রথম ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা শুরু হয়। তখন থেকে ঝিনাইদহে একের পর এক চরমপন্থি নেতা ও ক্যাডার নিহত হতে থাকে।
১৯৯৯ সালের দিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার সুযোগে আত্মসমর্পণ শুরু হয়। ওই সময় গণমুক্তিফৌজ, গণবাহিনীর ক্যাডারদের অনেকে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। তবে বিপ্লব কমিউনিস্ট পার্টি ও পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি আত্মসমর্পণে সাড়া দেয়নি। আন্ডারওয়ার্ডে চলতে থাকে রেষারেষি। আবার গরম হয়ে ওঠে ঝিনাইদহের আন্ডারওয়ার্ড। খুনের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে তারা।
খুলনা অঞ্চল থেকে জনযুদ্ধের আব্দুর রশিদ ওরফে দাদা তপন শক্তি সঞ্চয় করে ঝিনাইদহে ভর করেন। অস্ত্রের শক্তি এবং হত্যার দিক থেকে তার নেতৃত্বাধীন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এম-এল জনযুদ্ধ তখন ছিল দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। তারা মানুষ খুনের পর পত্রপত্রিকায় ফ্যাক্সের মাধ্যমে দায়িত্ব স্বীকার করে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। সে সময় ‘আমি আবীর হাসান বলছি’ ডায়লগ দিয়ে মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়ানো হতো।
দাদা তপন ঘোষণা দিয়েও মানুষ খুন করতেন। দক্ষিণাঞ্চলের ভয়ংকর চরমপন্থি সংগঠন ‘জনযুদ্ধ’ ঝিনাইদহ শহরে একের পর এক হত্যা ও বোমা হামলায় নাজুক পরিস্থিতির জন্ম দেয়। ২০০০ সালের ১৬ জুন ঝিনাইদহ শহরের পাগলাকানাই এলাকার একটি দোকানে বসে থাকা অবস্থায় শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলনের প্রধান মীর ইলিয়াস হোসেন সঙ্গী আলফাজসহ খুন হয়।
চুয়াডাঙ্গার লাল্টু বাহিনী
২০০০ সালের আগে চরমপন্থিদের ব্যাপক দৌরাত্ম্য ছিল সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গায়। পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি, লাল পতাকা, লাল্টু বাহিনী, সিরাজ বাহিনীÑ এ রকম নামের চরমপন্থি সংগঠনের খুন-খারাবি, চাঁদাবাজিতে ঘুম হারাম ছিল এ এলাকার মানুষের। সে সময় চাঁদা না দিলে ধরে এনে জ্বলন্ত ইটভাটায় ফেলে দিত লান্টু বাহিনী।
১৯৯৫ সালে দামুড়হুদা উপজেলার দলকা-লক্ষ্মীপুর বিল নিয়ে লাল্টু বাহিনীল থ্রি মার্ডার, এরপর লাল্টু বাহিনীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে ১৯৯৬ সালে সবুজ বাহিনীর হাতে বিষ্ণুপুর গ্রামে এইট মার্ডারের ঘটনা স্মরণ করে আজও ভয়ে শিউরে ওঠে এলাকাবাসী।
এভাবে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে প্রায়ই দিনই দুই-একজনকে খুন করে স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় হত্যার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেওয়া হতো এসব চরমপন্থি সংগঠনের পক্ষ থেকে।
২০০৭ সালে এ জেলায় পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে যায়। চরমপন্থি অধ্যুষিত এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিপুলসংখ্যক চরমপন্থি অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। এরপর চলে ক্রসফায়ার। এই ক্রসফায়ারে নিহত হন রানা, তপন, সবুজ, রুহুলের মতো আতঙ্কিত চরমপন্থি নেতারা। দেশের বাইরে মারা যান সিরাজ বাহিনীর সিরাজ। একসময় পরিস্থিতি বদলে যায়। অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। অনেকে গা-ঢাকা দেয়। অনেকেই আবার ফিরে এসেছে স্বাভাবিক জীবনে।
বিল-বাঁওড়ের কর্তৃত্ব নিয়ে একের পর এক খুন
ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ট্রিপল মার্ডারের নেপথ্যে হরিণাকুণ্ডুর নারায়ণকান্দি গ্রামের বিশাল বাঁওড় আলোচনায় উঠে এসেছে। ১০৮ হেক্টর জমির ওই বাঁওড়ে বছরে কয়েক কোটি টাকার আয় হয়।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, মৎস্যজীবী লীগ নেতা পরিচয়ে হানেফ বাঁওড়ে মাছ ধরা ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে এলাকার বিবদমান একাধিক গ্রুপের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ইতোমধ্যে বাঁওড়ে তিন দফায় মাছ ধরার তারিখ পরিবর্তন করা হয় এই বিরোধের কারণে। সেই সূত্র ধরেই হানেফকে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে ফোনে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তাদেরকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার এই বাঁওড় নিয়ে গত ৩০ বছরে অর্ধশত মানুষ খুন হয়েছেন। ২০০৫ সালে এই বাওড়কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বে খুন হন তৎকালীন উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও পৌরসভার প্রশাসক আজিজুর রহমান মণ্ডল। তাকে ওই বছরের ১৯ অক্টোবর হরিণাকুণ্ডু থানার সামনে একটি চায়ের দোকানে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়।
২০১৭ সালে বাঁওড়টির মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি জিয়ার রহমান জিয়াকে বাঁওড়ের মাঝখানে নৌকার ওপর গলা কেটে হত্যা করে এটি দখলে নেন হানেফ আলী। এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে তখন চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেঁপে ওঠে আন্ডারওয়ার্ল্ডও।
জেলা মৎস্য অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গার চারটি উপজেলায় সরকারি বিল আছে ৫৪টি। বাঁওড় রয়েছে ১০টি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় বিল ১৮টি, বাঁওড় ২টি। আলমডাঙ্গা উপজেলায় বিল ৭টি, বাঁওড় ১টি। দামুড়হুদা উপজেলায় বিল আছে ৯টি আর বাঁওড় ৪টি। জীবননগর উপজেলায় বিল রয়েছে ১৯টি আর বাঁওড় ৩টি।
এই বিল-বাঁওড়গুলো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘জাল যার জলা তার’ নীতিতে কথিত মৎস্যজীবী সমিতির নামে নামমাত্র মূল্যে ইজারা নিয়ে দখলে রেখে মাস চাষ করতেন স্থানীয় এমপি ও তার ক্যাডাররা। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর এসব বিল-বাঁওড়ের দখল নিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের ঝিনাইদহ প্রতিনিধি আব্দুর রহমান মিল্টন, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জহুরুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি রেজাউল করিম লিটন ও মেহেরপুর প্রতিনিধি মেহেরাব হোসেন অপির পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।