আলোচিত হত্যা মামলা ৩
পারভেজ খান, সাইফ বাবলু ও সুজন কৈরী
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৪৩ এএম
মুহম্মদ খিজির খান
২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর গোপীবাগে পীর লুৎফর রহমান ফারুকসহ ছয়জন, ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট রাজাবাজারে বেসরকারি টেলিভিশনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নূরুল ইসলাম ফারুকী এবং ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর বাড্ডায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও রহমানিয়া খানকায়ে শরিফের পীর খিজির খান খুন হন। দীর্ঘদিন কেটে গেলেও এসব হত্যাকাণ্ডের কোনোটির তদন্ত, কোনোটির বা বিচারকাজ শেষ হয়নি আজও। প্রশ্ন উঠেছেÑ এসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার আর তদন্ত কি আলোর মুখ দেখবে আদৌ? এই যে দীর্ঘসূত্রতা, তার পেছনেও কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে কি নাÑ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আয়োজন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও রহমানিয়া খানকায়ে শরিফের পীর ছিলেন মুহম্মদ খিজির খান। ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় মধ্যবাড্ডায় নিজের বাড়ির দোতলায় তাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। পুলিশের দাবি, হত্যা মিশনে জেএমবি ও ডাকাত দলের সমন্বিত গ্রুপ অংশ নেয়। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলা প্রথমে বাড্ডা থানা পুলিশ, পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে হস্তান্তর করা হয়। এরই মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে মামলাটির। তবে মামলার বাদী এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। নিহত খিজিরের স্ত্রী এখনও নামাজ শেষে কান্নাকাটি করেন হত্যার বিচার চেয়ে। সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিনই বিভিন্নভাবে স্মরণ করেন তাকে। বিচার নিয়ে হতাশ পরিবারের প্রতিটি সদস্য।
খিজির খান হত্যা মামলা তদন্ত চলাকালে ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাহফুজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে পুরোনো অন্তত সাতটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার যোগসূত্র মিলেছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে গোপীবাগে কথিত পীর লুৎফর রহমানসহ একসঙ্গে ছয়জনকে গলা কেটে হত্যা এবং ২০১৪ সালে পূর্ব রাজাবাজারে মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যা মামলাও রয়েছে। খিজির খান হত্যা মামলার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে ছয় খুনের মামলার কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর খিজির খান হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী জেএমবি। তবে ঘটনা ভিন্ন দিকে নিতে পেশাদার ডাকাত সদস্যদের জড়িত করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে পীরপন্থি খিজির খান ‘শিরক’ করতেন বলে মনে করত জেএমবি। এজন্যই নিষিদ্ধ সংগঠনটি তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।
ডিবি পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, খিজির খান হত্যা মামলার তদন্ত করতে মাঠে নেমেই আরও কিছু মামলা নিয়েও অনেক অজানা রহস্য বেরিয়ে আসে। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত গ্রুপটি আরও অন্তত চারজন পীরকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। খিজির খান হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের গ্রেপ্তার করায় তাদের পক্ষে আর সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা এবং বর্তমানে বরিশালের পুলিশ সুপার এসএম নাজমুল হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, খিজির খান হত্যা মামলার তদন্ত শেষে ২০১৬ সালেই ৬ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। মামলার পলাতক কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টাও পুলিশ অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে জেএমবি নেতা তরিকুল ইসলাম ওরফে মিঠু, আলেক ব্যাপারী, দেওয়ান শামসুজ্জামান, শিপন আহম্মেদ বাবু, আবদুল গফফার ও ডাকাত সর্দার মোস্তফা আহমেদ রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের নামেই চার্জশিট হয়েছে। মিঠু ও রাসেল খিজির হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মধ্যে মিঠু গোপীবাগে পীর লুৎফর রহমানসহ ছয় খুনের ঘটনায়ও নিজেকে জড়িত থাকার তথ্য দেন জবানবন্দিতে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, জেএমবির দুই দুর্ধর্ষ জঙ্গি মিঠু ও গফফারের ওপর পীর ও মাজারপন্থিদের হত্যার দায়িত্ব ছিল। তাদের গ্রুপে ‘পরিকল্পনা ও নির্দেশদাতা’ বলে দুটি স্তর আছে। মিঠু ২০০৫ সালে দেশব্যাপী সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ মামলায় কারাগারে গিয়ে পরে জামিনে বের হয়ে আসেন। কারাগারে অনেক জেএমবি নেতার সঙ্গেও বৈঠক হয় মিঠুর। সেখানেও হয় নানান পরিকল্পনা। জেএমবির টার্গেট পূরণ করত এরা, আর বিনিময়ে মিলত নগদ টাকা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা। এছাড়া মাজার বা পীরদের আস্তানায় বেশি পরিমাণে টাকা বা স্বর্ণালংকার থাকার কারণেও তারা জেএমবির সঙ্গে ডাকাতিতে অংশগ্রহণে আগ্রহ দেখায়।
মধ্যবাড্ডায় খিজির খানকে যে বাসায় হত্যা করা হয়েছিল, সম্প্রতি ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা ভবনটিতে রঙের কাজ চলছে। ভবনের মেইন গেট খোলা থাকলেও ভেতরের কলাপসিবল গেট বন্ধ। নিচে দারোয়ান রয়েছেন। ভবনের বিপরীত পাশে ডেইলি শপিং নামের একটি সুপারশপ রয়েছে। তার পাশেই রয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং ও ফোন রিচার্জের দোকান। ওই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয় স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। খিজির খানের হত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ওইদিন লোকজনের জমায়েত ও চিৎকার শুনে তিনি খিজির খানের বাসায় গিয়েছিলেন। মানুষ হিসেবে বেশ ভালো ছিলেন খিজির খান। এটুকু বলার পরই তিনি থেমে যান। এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
খিজির খানের বাড়ির দারোয়ান দুলাল মিয়া বলেন, ঘটনার সময় তিনি ছিলেন পাশের একটি গলির বাসিন্দা। খিজির খানের বাড়িতে তখন মোখলেস নামের আরেকজন দারোয়ান ছিলেন। তিনি মারা গেছেন। পরে তিনি এই বাড়ির দারোয়ান হিসেবে যোগ দেন।
দুলাল বলেন, ঘটনার পরপরই লোকজনের চেঁচামেচি ও দৌড়াদৌড়ি দেখে তিনিও খিজির খানের বাসায় গিয়েছিলেন। ওই সময় যা দেখেছিলেন সেটা প্রকাশ করতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাসার দ্বিতীয় তলায় খিজির খানকে গলা কেটে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এতটা নির্মমভাবে কাউকে মারতে পারে কোনো মানুষ?
সরেজমিন আরও দেখা যায়, এখনও ভবনের দ্বিতীয় তলায় দরবার শরিফ রয়েছে। প্রতি বৃহস্পতিবার মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয় সেখানে। লোকসমাগমও হয় প্রচুর। বাসার ভেতরে ঢুকতে চাইলে দারোয়ান আটকে দেন। পরে ফোনে কথা বলার পর খিজির খানের ছোট ছেলে আশরাফুল ইসলাম নিচে নেমে আসেন। তিনিই খিজির খান হত্যা মামলার বাদী।
আশরাফুল বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মার সঙ্গে আছেন তারা। বড় ভাই মতিউল ইসলামও তাদের সঙ্গেই থাকেন। নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানিতে কর্মরত আছেন তিনি।
খিজির খানকে হত্যার সময় বাসায় ছিলেন না জানিয়ে আশরাফুল বলেন, ঘটনার পর বাড্ডায় থানায় বাদী হয়ে মামলা করেছি। প্রথম দিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যোগাযোগ রাখলেও বর্তমানে মামলার অগ্রগতির বিষয়ে কিছুই জানি না। আমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেন না। মামলাটি সর্বশেষ কী অবস্থায় আছে, সে বিষয়েও অবগত নই।
ঘটনার পর থেকে মা খুব কষ্টে আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিনই মাগরিবের নামাজের পর কান্নাকাটি করে হত্যাকারীদের বিচার চান। কিছুদিন আগে তার চোখে অপারেশন হয়েছে। এমন কোনোদিন নেই যে, বাবার কথা পরিবারে আলোচনা হয় না। প্রতিদিন যখন পরিবারের সদস্যরা একত্র হন, তখন কোনো-না কোনো বিষয়ে বাবার কথা উঠে আসে। তখন খুবই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন সবাই।
মামলার বিষয়ে আশরাফুল বলেন, এটা অসহনীয় একটা বিষয়। একটা মামলার তদন্ত শেষ করতে এত দীর্ঘ সময় লাগে তা আমার কল্পনাতেও আসেনি। আমি জানি না মামলার চার্জশিট হয়েছে কি না? সর্বশেষ অবস্থা কী? আমার সঙ্গে প্রথমদিকে তদন্ত কর্মকর্তা যোগাযোগ করলেও গত কয়েক বছর ধরে কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই। মামলার অগ্রগতির বিষয়ে এক প্রকার অন্ধকারে আছি। কেউ কোনো আপডেট জানাচ্ছেন না। আমি চাই দ্রুত বিচারটি শেষ হোক। এতে আমরা শান্তি পাব। আমার বাবাকে হত্যা করে খুনিরা ঘুরে বেড়াবে তাতো হয় না। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ধর্মীয় মতবাদ নিয়ে বিরোধের জের ধরেই জেএমবি সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ড চালায় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তার সঙ্গে আছে ডাকাতির অভিযোগও। তারা মিলে মিশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
(শেষ)