× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাবেক মন্ত্রী আব্দুস শহীদের দুর্নীতির খেরোখাতা

সাদিকুর রহমান সামু, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার)

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৪ ১৫:৪৫ পিএম

সাবেক মন্ত্রী আব্দুস শহীদের দুর্নীতির খেরোখাতা

মৌলভীবাজার-৪ (কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল) আসনের ৭ বারের এমপি সদ্য সাবেক কৃষিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ ড. আব্দুস শহীদ। এ ছাড়াও এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ছিলেন মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। দীর্ঘ এ সময়ে জেলা ও উপজেলার রাজনীতিতে শহীদ পরিবারের ছিল একক আধিপত্য। নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে তিন ভাই ও বড় মেয়েকে দলীয় বিভিন্ন পদে আসীন করেছেন। এ ছাড়াও মৌলভীবাজারসহ নিজ উপজেলা কমলগঞ্জে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের ইশারা ছাড়া বাস্তবায়িত হতো না সরকারি কোনো প্রকল্প। অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে দেশ ও বিদেশে বানিয়েছেন সম্পদের পাহাড়। অভিযোগ আছে, আব্দুস শহীদ বিধি লঙ্ঘন করে গ্রামের বাড়িতে নিয়েছেন গ্যাস সংযোগ।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্মাতক শেষ করে ১৯৭৩ সালে কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর ১৯৯১ সালে প্রথম আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদে হুইপ, ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও সর্বশেষ প্যানেল স্পিকার এবং ২০২৪ সালে ৭ মাসের কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী করতে তিন ভাই ও বড় মেয়েকে দলীয় পদ-পদবি দিয়ে নিয়ে আসেন জনসম্মুখে। প্রভাব খাটিয়ে ছোট ভাই ইমতিয়াজ আহমদ বুলবুলকে কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইফতেখার আহমদ বদরুলকে রহিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মোসাদ্দেক আহমদ মানিককে বানান কমলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। বড় মেয়ে উম্মে ফারজানা ডায়নাকে পদ দেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদকের। উদ্দেশ্য ছিল আগামীতে সংসদ নির্বাচনে তাকে প্রার্থী করার। এজন্য রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে মেয়েকে নিজের সঙ্গেই রাখতেন আব্দুস শহীদ। এসব নিয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝে অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছিল। বলা চলে সংসদ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত শহীদ পরিবারের ছিল একক আধিপত্য।

আব্দুস শহীদ জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বে থাকাকালে জেলাজুড়ে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল ছিল চরমে। প্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসীন আলীর সঙ্গে তার দলীয় দ্বন্দ্ব ছিল অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। সে সময় দলের একটি বড় অংশকে কোণঠাসা করে রাখেন তিনি। এজন্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও দলীয় কোন্দল সৃষ্টির মূল কারিগর হিসেবেই নিজ জেলার রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে তার পরিচিতি। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের মামলা-হামলায় দমন নিপীড়নেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন বলে জানান স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, শুধু জেলা শহরেই নয়, আব্দুস শহীদ নিজের স্বার্থে কমলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও দ্বন্দ্ব তৈরি করে রাখেন। তিনি সাবেক কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা, কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক রফিকুর রহমান অনুসারীদের কোণঠাসা করে রাখেন। এমনকি রফিকুর রহমানের বিপক্ষে গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও মন্ত্রিত্বের প্রভাব খাটিয়ে নিজের ছোট ভাই বুলবুলকে চেয়ারম্যান বানিয়েছেন। শহীদের ক্ষমতার দাপটে তার বিরুদ্ধে কোনো নেতাকর্মীর কথা বলার সাহস ছিল না।

মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ ও তার দোসরা আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় প্রায় ৭৬টি মামলা দিয়েছে। অনেক মামলায় কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গলের নেতাকর্মীদের আসামি করেছে। পুলিশ দিয়ে আমাকে ও নেতাকর্মীদের নির্যাতন করিয়েছে। নির্বাচনী এলাকার জনগণের পাশে, নিজ বাড়িতে, সামাজিক ও রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানে, এমনকি ঈদেও আমাকে এলাকায় আসতে দেওয়া হয়নি। পুলিশের হয়রানি, গ্রেপ্তার আতঙ্কÑ এসবের মধ্য দিয়েও দলের কার্যক্রম চালাতে হয়েছে।’

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ মেয়াদে এমপি ও মন্ত্রী থাকার পরও নিজ নির্বাচনী এলাকা মৌলভীবাজার-৪ আসনের দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন কাজ করেনি আব্দুস শহীদ। বলা হয়, তার ও তার পরিবারের সদস্যদের ইশারা ছাড়া বাস্তবায়িত হতো না সরকারি কোনো প্রকল্প। ক্ষমতার দাপটে বেশ নীরবেই চলত তার টাকা উপার্জনের নানা ফন্দিফিকির। আর এভাবেই তিনি দেশে ও বিদেশে বানিয়েছেন সম্পদের পাহাড়।

অবৈধ সম্পদ গড়ায় আব্দুস শহীদের বিরুদ্ধে অভিযোগেরও নেই কোনো অন্ত। জলমহাল, সরকারি-বেসরকারি নানা প্রকল্প, বালুমহাল, এমনকি শ্রীমঙ্গলের ভূনবীর, মির্জাপুরসহ অন্যান্য ইউনিয়নের অবৈধ বালু উত্তোলন থেকে কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল্যবান সেগুনগাছ বিক্রি এবং বৈধ-অবৈধ ছোট-বড় সব কাজের বড় অংশের টাকার ভাগ যেত আব্দুস শহীদ ও তার ভাইদের কাছে। এর ব্যত্যয় হলেই করা হতো নানা হয়রানি। এভাবেই তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এ ছাড়া লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশে ‘সাবারী টি প্ল্যান্টেশন’ নামে চা-বাগান গড়ে তুলে উদ্যানের ৭-৮ একর পাহাড়ি জমি দখলে নেন। সরকারি খরচে ওই বাগানে বিদ্যুৎ সংযোগসহ স্থাপন করেন বেশ কয়েকটি ডিপ টিউবওয়েল। কাঁঠালকান্দিতে ১০-১৫ একর পাহাড়ি এলাকায় গড়ে তোলেন বাগান বাড়ি ‘সাবারী ফার্মহাউস’। সেখানে সরকারি খরচে ডিপ টিউবওয়েল ও সৌরপ্ল্যান্ট নির্মাণ করেন। শুধু তাই নয়, শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরে বাইক্কা বিলের পাশে প্রায় ২০ একর জমির বিশাল মৎস্য খামার গড়ে তোলেন তিনি।

জেলা বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অনেক বছর ধরে ক্ষমতাবান সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ অবৈধভাবে লাউয়াছড়া বনের জমি দখলে রেখেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সবখানেই তার একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। সে কারণে ২০১৮ সাল থেকে বন বিভাগ একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও বনের জমি উদ্ধার করতে পারেনি। ২০১৮ সালে প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিমাপ শুরুর পর ওপরের নির্দেশে বন বিভাগ এ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সাবেক কৃষিমন্ত্রীর দখলে কী পরিমাণ জমি রয়েছে, তা ডিমারকেশনের (সীমানা চিহ্নিতকরণ) পর নিশ্চিত হয়ে বলা যাবে। তবে আমরা লাউয়াছড়া স্টুডেন্ট ডরমিটরির পাশে অবস্থিত প্রায় ৬ একর জমি আব্দুস শহীদের দখল থেকে উদ্ধার করেছি। সেখানে বন্য প্রাণীর খাদ্যোপযোগী নানা জাতের গাছের চারা রোপণ করেছি।’

আব্দুস শহীদের সম্পদের বিবরণও বেশ দীর্ঘ। কমলগঞ্জের মাঝেরছড়ায় কয়েক শ বিঘা টিলাজুড়ে লেবুবাগান, রাজধানীর উত্তরা ১০নং সেক্টরে ফ্ল্যাট, ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের জগদীশপুর পেট্রোল পাম্প, ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় ঘরসহ জমি ও দোকান, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের দিলবরনগরে প্রায় ১০ একর জমিতে লেবু বাগান, শ্রীমঙ্গল শহরের কলেজ রোডে পাঁচতলা ভবন, মৌলভীবাজার সড়কে হাউজিং এস্টেটে জায়গা, কমলগঞ্জ উপজেলা সদরে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন বাড়ি। যেখানে অবৈধ গ্যাস সংযোগসহ গ্রামের বাড়িতে সরকারি খরচে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে সোলার লাইট স্থাপন ও পুকুর খনন করেন আব্দুস শহীদ। ২০১২ সালে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি তার চাহিদানুযায়ী বিধি লঙ্ঘন করে গ্রামের বাড়িতে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে গ্যাসলাইন স্থাপন করে দেয়। এ ছাড়া লোকমুখে প্রচলিত আছে তার নামে-বেনামে কানাডা, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে বেশ কয়েকটি বাড়ি রয়েছে।

জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির শ্রীমঙ্গল আঞ্চলিক বিতরণ কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক গৌতম কুমার দেব বলেন, ‘চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে আমি এখানে দায়িত্বে রয়েছি। আমার জানামতে সাবেক কৃষিমন্ত্রীর বাড়িতে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি। চাহিদানুযায়ী বিধি লঙ্ঘন করে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে গ্যাসলাইন স্থাপনের বিষয়টি জানা নেই।’

গত ২৯ অক্টোবর একাধিক হত্যা মামলায় ঢাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন আব্দুস শহীদ। এ সময় তার বাসায় পাওয়া যায় নগদ দেশি-বিদেশি কয়েক কোটি টাকা ও স্বর্ণালংকার। এমন খবরে জেলাজুড়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদকে নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। তার গ্রেপ্তারের খবরে নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষরা আনন্দ মিছিল করে। এ সময় অবৈধভাবে উপার্জিত তার সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনাসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা