পারভেজ খান
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৬ এএম
আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৪ ১০:৪৫ এএম
প্রতীকী ছবি
রাজধানীসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে চলছে সেনা-র্যাব-পুলিশের যৌথ অভিযান। কিন্তু এরপরও থেমে নেই দুষ্কৃতকারীদের দৌরাত্ম্য। অনেকটা প্রকাশ্যেই চলছে খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, হামলা, দখল, ধর্ষণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। শুধু অক্টোবরেই সারা দেশে অন্তত ৯০ জন খুনের শিকার হয়েছে। ছিনতাইসহ ছোটখাটো অপরাধ অনেকটাই ডাল-ভাতে পরিণত হয়েছে। অথচ এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণে বা প্রতিরোধে যাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি থাকার কথা, সেই পুলিশের মনোভাব অনেকের কাছে এখনও রহস্যজনক। একটি মহল বলছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না, তারা ঠিক কী করবে। কেননা যারা এসব অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের অধিকাংশই কোনো-না কোনোভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পালিত। আরেকটি মহলের মতে, মাঠে যেসব পুলিশ সদস্য কাজ করছেন, তারা নিজ এলাকার অপরাধজগৎ সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল নন। এলাকার অলিগলিও চেনেন কম। পাশাপাশি রয়েছে জনবল ও যানবাহন-স্বল্পতা। এসব কারণেও অনেক সময়ই তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কয়েকদিন ধরে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, লালবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। একই রকম অভিযান চলছে সারা দেশেও। সেনা সদস্যদের সঙ্গে রয়েছে পুলিশও। কিছুদিন ধরে মোহাম্মদপুরের পর ধানমন্ডিতেও একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় টনক নড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সম্পৃক্তদের। ধানমন্ডিতে জনবহুল এলাকায় অস্ত্র দেখিয়ে প্রকাশ্যে ঘটছে ছিনতাই।
গত ১৯ অক্টোবর, সন্ধ্যায় ধানমন্ডি ৮/এ সড়কের মাথায় হঠাৎ হেলমেট পরিহিত চার দুর্বৃত্ত জাপটে ধরে রাসেল নামে এক পথচারীকে। তিনি ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করলে একজন ফাঁকা গুলি করে। আশপাশের লোকজন ভয়ে সরে যায়। তখনও রাসেল তার হাতে থাকা ব্যাগটি রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। ওই অবস্থায় আরেকটি গুলি করা হলে সেটি তার কানের পাশ দিয়ে যায়। এরপর ব্যাগটি কেড়ে নিয়ে চারজন মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। ভুক্তভোগী রাসেল সাতমসজিদ সড়কের কেয়ারি প্লাজায় অবস্থিত বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার প্রতিষ্ঠান ডেল্টা ব্যুরো ডি চেঞ্জের ব্যবস্থাপক। তার ব্যাগে ছিল প্রতিষ্ঠানের ৫০ লাখ টাকা, যা ওই দুর্বৃত্তরা লুট করে নিয়ে যায়।
ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওই এলাকায় সন্ধ্যা নামলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ছিনতাই ও লুটের ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। ৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ধানমন্ডির ৮/১ নম্বর সড়কে কাকলি স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে রাইয়ান নামের এক শিক্ষার্থী। ধানমন্ডি ২৭ নম্বর ফুটওভার ব্রিজের পাশে মাঝেমধ্যেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় এমবিএর ক্লাস শেষ করে ক্যাম্পাস থেকে রিকশায় বাসায় ফেরার পথে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন আরেক শিক্ষার্থী তাসরীন শামীমা। ওই ঘটনার পর তিনি বাসা থেকে বের হতেই ভয় পাচ্ছেন। কারণ মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকায় প্রতিনিয়ত মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে বলে তিনি শুনতে পারছেন। গত ১৮ অক্টোবর রাতে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে বাসায় ফেরার পথে মগবাজার রেল ক্রসিংয়ের কাছে ছিনতাইয়ের শিকার হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিবলু হক।
মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় ছিনতাইসহ অপরাধ বেড়ে যাওয়ার কারণ কী তা জানতে চাইলে র্যাব-২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোয়াজ্জেম হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর অঞ্চলে অনেক অপরাধী বাইরে থেকে, বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ থেকে এসে অপরাধ করে থাকে। এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে র্যাবের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযানও চালানো হচ্ছে।
রাজধানীর উত্তরায়ও বেড়েছে অপরাধের ঘটনা। যৌথ বাহিনীর অভিযানে ওই এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ঠোঁটকাটা আলতাফ আটক হয়েছেন। জনপদ মোড়, দিয়াবাড়ি, আশকোনা, উত্তর খান, দক্ষিণ খান, আমবাগান এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। ওই এলাকায় ছিনতাইকারীদের দলনেতা ঠোঁটকাটা আলতাফকে গত মঙ্গলবার সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করেছে। আটক করা হয়েছে তার কয়েকজন সহযোগীকেও।
যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলতাফের নেতৃত্বেই লুট হয় উত্তরা পূর্ব থানার অস্ত্র। চাঁদাবাজি, অস্ত্র-মাদক ব্যবসা ও কিশোর গ্যাং পুষে পুরো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা আলতাফের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দশটিরও বেশি মামলা রয়েছে।
এদিকে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানান, তাদের বাহিনীর ভেতরেই এখন বহু সমস্যা বিরাজ করছে। বিগত ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনামলে পুলিশ তাদের নানাবিধ অপকর্মের কারণে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে প্রায় পুরোটাই হারিয়ে ফেলেছে। রদবদল বা বদলি করে যাকে যেখানেই আনা হোক না কেন, দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষ পুলিশকে এমনভাবে দেখতে পেয়েছে যে, এখন ওই পোশাকটাকেই যেন তারা আর সহ্য করতে পারছেন না। আবার এটাও সত্য যে, এই পোশাকের ভেতরের মানুষগুলোর অধিকাংশের কর্মক্ষেত্র বদলালেও নিজেদের খারাপ দিকগুলো পাল্টাতে পারছেন না। রাজনৈতিক মামলার সুযোগে গ্রেপ্তার ও রিমান্ড বাণিজ্য, অহেতুক হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, ঘুষ নেওয়া থেকে শুরু করে পরিবহন ও ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজিতে আবারও পুরোদমে মাঠে নেমে পড়তে দেখা যাচ্ছে তাদের। এই অবস্থায় আইনশৃঙ্খলার উন্নতিতে পুলিশের কাছ থেকে কতটুকু আশা করা সমীচীন সেই প্রশ্নও তুলেছেন এই বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা।
তারা আরও বলেন, শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিগত দিনের সব সরকারই পুলিশকে তাদের নিজস্ব হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ঘটেছে গত ১৬ বছরে। কোহিনুর-হামিদ (ছানা) বলয় থেকে শুরু করে হারুন-বিপ্লব, এদের রচিত ইতিহাসই কলঙ্কিত করেছে পুলিশ বাহিনীকে। আসলে পুলিশ সংস্কার কমিশন করে তেমন লাভ নেই, যতদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা না আসবে বা রাজনীতিবিদদের মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটবে। তার আগে এই পুলিশের কাছ থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা খুব একটা ফল বয়ে আনবে না।
অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞান বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু সালেহ দোস্তগীর বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলেই অপরাধ চক্র তার সুযোগ নিচ্ছে। আবার নতুন করে বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়ার ভয়েও অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছেন অনেক পুলিশ সদস্য। রাজনীতিতে কী ঘটতে যাচ্ছে, কোনদিকে যাচ্ছে দেশের পরিস্থিতি, কাকে ঘাটাব, কদিন পর কে ক্ষমতায় আসেÑ এমন সব অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে অনেকেই তাই হাত গুটিয়ে চুপ করে বসে আছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এসব কারণেই।
তিনি আরও বলেন, মাঠে এখন মূলত কাজ করছে র্যাব আর সেনাবাহিনী। র্যাব পরিচালনার দায়িত্বেও সেই পুলিশই। কাজেই সেনা সদস্যদের ওপরই এখন জনগণের ভরসা। কিন্তু সেনাবাহিনীকে এভাবে কতদিন এ ধরনের কাজে ব্যবহার করা উচিত হবে বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে সেটাও ভেবে দেখা দরকার।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছে চলে যাওয়ায় এখন সেগুলো বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে। এগুলো উদ্ধার না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এখন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বাড়াতে হবে প্রতিরোধমূলক টহল। নির্দলীয় লোকদের দেওয়া তথ্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে এই সাবেক আইজিপি বলেন, পুলিশে ব্যাপক রদবদল হওয়ায় যে নতুন কর্মকর্তারা পদায়ন হয়েছেন, তাদের অনেকে কখনও ওই এলাকায় দায়িত্ব পালন করেননি। বিশেষ করে মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর বিষয়ে তাদের আরও সজাগ হতে হবে।
সমাজ ও অপরাধ গবেষক সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ আগের মতো মাঠে জোরালো ভূমিকা নিতে পারছে না। তারা সব সময় একটা শঙ্কার মধ্যে আটকে থাকছে। পাশাপাশি কারাগারে থাকা দাগী ছিনতাইকারীরাও জামিনে বেরিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বভাবিক করতে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাসপেক্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেম-এসআইভিএসের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে পুলিশের তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা ছয় হাজারের মতো। ছিনতাইয়ের হটস্পটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ কামরাঙ্গীর চর বেড়িবাঁধ, শাহবাগ, রমনা, মতিঝিল, বাসাব, সবুজবাগ, ওয়ারী, নারিন্দা, খিলগাঁও, হাতিরঝিল, তেজগাঁও রেলস্টেশন, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, ভাটারা, শেরেবাংলা নগর, কলাবাগান, গাবতলী, মিরপুর মাজার রোড, রূপনগর, পল্লবী, কালসি, রামপুরা, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর (বসিলা অন্যতম), বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, উত্তরা পশ্চিম ও পল্লবী, পান্থপথ, চানখাঁরপুল, দোয়েল চত্বর, বকশীবাজার ও কাওরান বাজার এলাকা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে গত দুই মাসে ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, ডাকাতসহ ৩০৭ জন তালিকাভুক্ত পেশাদার সন্ত্রাসী (পাঁচের অধিক মামলার আসামি) গ্রেপ্তার হয়েছে। এদের মধ্যে অবৈধ অস্ত্রধারী ৬৩ জন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার আর অপরাধীদের গ্রেপ্তারের জন্য গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু করেছে। অভিযানে গত মাসের অক্টোবর মাঝামাঝি পর্যন্ত ৩১৮টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এই সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ১৭৪ জন সন্ত্রাসী। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে রিভলবার ১৯টি, পিস্তল ৭৬টি, রাইফেল ২২টি, শটগান ৩৭টি, পাইপগান আটটি, শুটার গান ৪৩টি, এলজি ৩১টি, বন্দুক ৪৮টি, একে-৪৭ একটি, এসএমজি পাঁচটি, গ্যাসগান চারটি, এয়ারগান ১০টি, এসবিবিএল ১০টি, টিয়ার গ্যাস লঞ্চার দুটি এবং থ্রি-কোয়ার্টার দুটি।