প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৪ ১৫:৩২ পিএম
আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৪ ১৬:২৮ পিএম
মহিউদ্দিন আহমেদ মহি। ছবি : সংগৃহীত
তিন বছরের জন্য নিয়োগ পেয়ে এক যুগ ধরে সমবায় ব্যাংক লুটেছেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ মহি। ২০০৯ সালে যুবলীগ নেতা ছিলেন তিনি। ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। এরপর আরও তিনবার অর্থাৎ মোট ১২ বছর চেয়ারম্যান পদ দখলে রাখেন। যদিও সমবায় সমিতি আইনে ব্যাংকের চেয়ারম্যানের তিন মেয়াদের বেশি থাকার সুযোগ নেই। সে হিসেবে চেয়ারম্যানের পদ থেকে তার ২০১৮ সালেই বিদায় নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে ২০২২ সালে তিনি সমবায় ব্যাংক থেকে বিদায় নেন। এরপর তিনি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের (দক্ষিণ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন।
দীর্ঘ সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ দখলে রাখার কারণ ছিল অর্থ আত্মসাৎ। তিনি ব্যাংকটির রক্ষক না হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। গ্রাহকের গচ্ছিত স্বর্ণ চুরি, কেনাকাটা ও অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ আত্মসাৎ এবং ব্যাংকের চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও নিজ এলাকার লোকজনকে চাকরি দিয়ে তাদের নামে কোটি কোটি টাকা ঋণ করে তা আত্মসাৎ করেন।
সম্প্রতি সমবায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ব্যাংকটির এক প্রতিবেদনে তার স্বর্ণ চুরির বিষয়টি উঠে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার ও সমবায় উপদেষ্টা হাসান আরিফ বিষয়টি জনসম্মুখে আনেন এবং তদন্ত করে বিচারের আশ্বাস দেন। এরপর থেকে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে এবং গ্রাহকের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। তারা অনেকেই ব্যাংকে গিয়ে নিজেদের গচ্ছিত স্বর্ণ দেখতে চান।
গত রবিবার কুমিল্লার কোটবাড়িতে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) এক অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা বলেন, ‘সমবায় ব্যাংকের অবস্থা দেখতে গিয়ে জানলাম, ১২ হাজার ভরি (দুদকের মামলায় ৭ হাজার ৩৯৮ ভরি) সোনার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারাই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সমবায় ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসানুল গনি জানান, দুই হাজার ৩১৬ জন গ্রাহকের সাত হাজার ৩৯৮ ভরি ও ১১ আনা বন্ধকি স্বর্ণ আত্মসাৎ করা হয়েছে, এটি স্বর্ণের নিট ওজন। তবে মোট ওজন ১১ হাজার ভরির বেশি।
জানা গেছে, সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকার সময় ২০২০ সালে মহিউদ্দিন আহমেদ ব্যাংকটির ২ হাজার ৩১৬ জন গ্রাহকের গচ্ছিত রাখা স্বর্ণ বিক্রি করে দেন। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। গ্রাহকরা এসব স্বর্ণ বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছেন। ঋণ পরিশোধের পরও তারা তাদের স্বর্ণ ফেরত পাচ্ছেন না।
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানান, স্বর্ণ বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা তদন্ত শুরু করেছিল পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ। প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত থামিয়ে দেন মহিউদ্দিন আহমেদ। ২০২১ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বর্ণ বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনায় মামলা করে। মামলার এজাহারে ৯ আসামির মধ্যে মহিউদ্দিনের নাম ছিল ১ নম্বরে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগপত্র থেকে নিজের নামটিও বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মহিউদ্দিন আহমেদ আত্মগোপনে চলে গেছেন।
দুদকের মামলা সূত্রে জানা যায়, ভুয়া মালিক সাজিয়ে স্বর্ণ ফেরত নেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। পরে সেই স্বর্ণ বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখান থেকে ব্যাংকের প্রাপ্য টাকা পরিশোধ করে বাকি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর সময়ে সমবায় ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ বন্ধক রাখা স্বর্ণ নিলামে না তুলে ভুয়া মালিক সাজিয়ে বিক্রি করে দেন। চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদের ভাগনে ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার (ক্যাশ) নুর মোহাম্মদ পুরো জালিয়াতির নেতৃত্ব দেন।
দুদকের মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সমবায় ব্যাংকের সদস্য প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ কো-অপারেটিভ ক্রেডিট লিমিটেডের ৫ হাজার ৮০৩ ভরির কিছু বেশি স্বর্ণ একই কৌশলে বিক্রি করে দেন মহিউদ্দিন আহমেদ। এ ছাড়া জালিয়াতি করে ঢাকা সমবায় অফিসে বিক্রি করা হয়েছে ১ হাজার ৫৯৪ ভরির কিছু বেশি স্বর্ণ।
দুদকের মামলার এজাহারে ১ নম্বর আসামি থাকা মহিউদ্দিন আহমেদকে বাদ দিয়ে ঘটনার জন্য আটজনকে দায়ী করা হয়। তারা হলেনÑ সমবায় ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক আবদুল আলীম, সহকারী মহাব্যবস্থাপক হেদায়েত কবীর, সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. আশফাকুজ্জামান, সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার মাহাবুবুল হক, প্রিন্সিপাল অফিসার ওমর ফারুক, সিনিয়র অফিসার নুর মোহাম্মদ, সহকারী অফিসার আবদুর রহিম ও সহকারী অফিসার নাহিদা আক্তার। সমবায় ব্যাংক অভিযোগপত্রে নাম থাকা আটজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। তারা সবাই জামিনে আছেন।
জানা গেছে, মহিউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালে আরও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে সমবায় ব্যাংকের ১০ তলা একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণেও অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৩১ কোটি টাকা। তার চেয়ে পাঁচ কোটি টাকা বেশি খরচ করেন চেয়ারম্যান। বাড়তি টাকা খরচের আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ কারও কাছ থেকে অনুমোদন নেননি তিনি।
সমবায় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা না করে ২০১০ থেকে ২০১৮ সময়ে বিভিন্ন পদে ৬৩ জন আত্মীয়সহ ১৭৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেন তৎকালীন চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের নামে প্রয়োজনীয় জামানত ছাড়াই কোটি কোটি টাকা ঋণ করেছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে কর্মীদের নামে ঋণ নিয়ে তিনি তাও আত্মসাৎ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, সমবায় ব্যাংকের কর্মীরা ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত গৃহঋণ পান।
সমবায় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভুক্ত কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়। এটি বিশেষায়িত ব্যাংক, যা পরিচালিত হয় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অধীনে। সমবায় ব্যাংকে স্বর্ণ বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া যায়। প্রতি ভরি খাঁটি স্বর্ণের (খাদ বাদে) বিপরীতে এখন ৫৫ হাজার টাকা ঋণ পাওয়া যায়। সুদের হার ১৭ শতাংশ। বাড়তি ১ শতাংশ বীমা খরচ দিতে হয়। ঋণ নেওয়ার পর সুদ ও আসল টাকা পরিশোধ করে স্বর্ণ ফেরত নিতে পারেন গ্রাহকরা। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে বন্ধক রাখা স্বর্ণ নিলামে বিক্রি করা যায়।