আবু বকর রায়হান
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:৫০ এএম
আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১০:৫০ এএম
আল-আমিন মাদানী। ছবি : ভিডিও থেকে নেওয়া
গাজীপুরের মালেকের বাড়ি এলাকায় মাদ্রাসা শিক্ষক আল-আমিন মাদানীর বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রী ধর্ষণ ও মোবাইলে তাদের নগ্ন ছবি ধারণের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এক অভিভাবক থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি জানাজানি হয়। এতে বলা হয়, যৌন নিপীড়নের ঘটনা ধামাচাপা দিতে পবিত্র কুরআন ছুঁইয়ে ছাত্রীদের শপথ করাতেন তিনি। স্থানীয়রা বলছেন, ঢাকার পরিমল জয়ধর, মুরাদ হোসেনের মতোই ভয়ংকর নিপীড়ক মাদানী। এর আগে বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে ইমামের চাকরিই হারিয়েছেন তিনি। পুলিশ বলছে, ছাত্রীদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মালেকের বাড়ি এলাকার শরীফপুর ওয়ার্ডের বাইতুন নাজাত হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার অভিযুক্ত ওই প্রিন্সিপালের নাম মাওলানা আল-আমিন মাদানী। দিনে ছাত্রীদের পাঠদান করে রাতে মাদ্রাসাতেই থাকতেন তিনি। শিক্ষার্থীরা জানান, ছাত্রীদের বেডরুমে ডেকে নিয়ে অশ্লীল কাজে বাধ্য করতেন প্রিন্সিপাল। পরে ঘটনা প্রকাশ না করতে পবিত্র কুরআন ছুঁইয়ে শপথ করানো হতো তাদের। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ঘটনা চেপে যেতেন। তবে সম্প্রতি এক ছাত্রী তার বাবাকে শিক্ষকের চারিত্রিক স্খলনের বিষয়ে খুলে বলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে অভিভাবকদের মধ্যে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। একে একে মুখ খুলতে থাকে অন্য ছাত্রীরাও। শিক্ষকের বিচার চেয়ে গাছা থানায় ৭ সেপ্টেম্বর অভিযোগ করেন এক অভিভাবক। অভিভাবকরা বলছেন, তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হলে আরও অনেক ছাত্রী হয়রানির শিকার হবে।
অভিযোগ দায়েরের পর পুলিশের পরামর্শে অভিযুক্ত শিক্ষককে নিয়ে ৯ সেপ্টেম্বর আলোচনায় বসেন এলাকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা। এ সময় সাত দিনের মধ্যে মাদ্রাসা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে প্রিন্সিপাল উল্টো হুমকি দিচ্ছেন বলে জানান স্থানীয়রা। শরীফপুর এলাকার সমাজ প্রধান আহমেদ আলী বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি যেহেতু একজন আলেম, তাই আমরা চেয়েছি যেন নিজেরা বিষয়টি সমাধান করতে পারি। সে লক্ষ্যে এলাকার আলেমদের নিয়ে সবাই বসি। সেখানে সাক্ষীদের কথা শুনে আমরা নিশ্চিত হই অভিযুক্ত মাদানী হুজুর দোষী। তখন তাকে মহিলা মাদ্রাসা বন্ধ করতে বলা হয়। কিন্তু তিনি তা করেননি।
গত বুধবার ঘটনাস্থলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে অভিযোগকারী তিনটি পরিবারের সদস্যদের কথা হয়। তাদেরই একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আকলিমা (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘বড় হুজুর কোনো কাজ ছাড়াই আমাকে রুমে ডেকে নেয়। তার কুপ্রস্তাবে রাজি হতে বারবার অনুরোধ করতে থাকে। একপর্যায়ে হাত ধরে টানাটানি করে। কোনো রকমে নিজেকে ছাড়িয়ে আমি রুমে আসি। তারপর আমার কাছে চার লাখ টাকা রেখে টাকার লোভও দেখানো হয়। উনি আমাকে বলেন, তোর কাছে যে টাকা আছে তা দিয়ে সারা জীবন চালিয়ে নিতে পারবি, ভেবে দেখ।’
মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়ে সরব ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরাও। প্রতিবাদ করতে গিয়ে চাকরিও হারিয়েছেন কেউ কেউ। তাদেরই একজন শিক্ষক আল মামুন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একসময় প্রিন্সিপাল হুজুরের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ছাত্রীদের সঙ্গে ওনার বিভিন্ন অপকর্ম আমি জেনে যাওয়ায় আমাকে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে আশপাশের কোথাও যেন চাকরি করতে না পারি, সন্ত্রাসীদের দিয়ে সে হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।’
এলাকাবাসী জানান, স্থানীয় বায়তুল আমান জামে মসজিদের ইমাম থাকাকালেও নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন আল-আমিন মাদানী। পরে তাকে চাকরিচ্যুত করে মসজিদ কমিটি। কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল হাশেম বলেন, প্রায় দুই বছর মসজিদের ইমাম ছিলেন তিনি। তার পর একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তখন আমাদের কাছে অভিযোগ আসে তিনি বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। ওনার স্ত্রীও একই অভিযোগ আনেন। সত্যতা যাচাই করে তাকে মসজিদ থেকে সরানো হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার স্কুলের এক শিক্ষক বলেন, ‘আমার ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিমল জয়ধর, মুরাদ হোসেনের মতো শিক্ষকদের দেখেছি। তারা নানা কৌশলে শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়ন করে আলোচিত। আমাদের মাদানীও তেমন শিক্ষক।
তিনি আরও বলেন, অভিভাবকরা বিশ্বাস করে আমাদের কাছে তাদের সন্তানদের পাঠান। কিন্তু কোনো শিক্ষক যদি ধর্মীয় গ্রন্থের শপথ করিয়ে তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করে, তবে আমাদের সম্মান থাকে কোথায়?
অভিযোগের বিষয়ে প্রিন্সিপাল আল-আমিন মাদানী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ মিথ্যা ও চক্রান্তমূলক। বর্তমানে যেহেতু পুলিশ বিষয়টি দেখছে, তাই গণমাধ্যমে তিনি বেশি কথা বলবেন না।
রাতে শিক্ষার্থীদের রুমে ডেকে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাতে একজন ছাত্রীকে রুমে আনা হয়নি। চারজন ছাত্রী ছিল। একসঙ্গে চারজনকে কুপ্রস্তাব দেওয়া যায় না। এ বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আগের ওসি বিষয়টি কীভাবে দেখেছেন তা তাদের জানা নেই। তবে তিনি বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবেন।’