আলাউদ্দিন আরিফ
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:১৩ এএম
আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:১৯ এএম
গণপিটুনির মতো মারাত্মক সামাজিক অপরাধ ভয়ানক রূপ নিয়েছে। অপরাধীরা দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। আইন তুলে নিচ্ছে নিজের হাতে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুসারে গত ৫ আগস্ট সরকার পতন-পরবর্তী এক মাসের বেশি সময়েই গণপিটুনিতে মারা গেছে কমপক্ষে ২১ জন। এই হিসাবকেও খণ্ডিত মনে করছেন অনেকে। তাদের মতে, গত ৫ এবং ৬ আগস্ট নিহতের সঠিক তথ্য পেলে এই সংখ্যা অনেক বাড়বে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা এবং সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের নৃশংস রূপ হিসেবেও প্রকাশ পাচ্ছে এই গণপিটুনি। আবার সামাজিক ও ধর্মীয় নানা কারণে সৃষ্ট জনরোষেরও শিকার হচ্ছেন অনেকে।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। খুলনায় ধর্মীয় বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে এক তরুণকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। রাজশাহীতে মাত্র চার দিন আগে সন্তানের পিতা হওয়া পঙ্গু এক তরুণকেও মেরে ফেলা হয়েছে। পুলিশের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব গণপিটুনির ঘটনাকে ‘সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলা যায়। তাই এসব ঘটনায় হত্যা মামলা হচ্ছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশ সঠিকভাবে কাজ করলে দেশে এই ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে সর্বস্তরের নাগরিকদেরও এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে হবে।
গত ৫ আগস্ট-পূর্ববর্তী এক মাস ভয়াবহ সংঘাত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায় দেশ। ওই সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্যের নির্বিচার গুলিতে প্রাণ হারায় কমপক্ষে ৬৩১ জন এবং আহত হয় ১৯ হাজারের বেশি মানুষ। সরকার পতনের-পরবর্তী কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণপিটুনিতে মারা গেছে বহু মানুষ। ৫ আগস্টের আগে ও পরের এসব সহিংসতার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের মানসিক ট্রমা তৈরি করে। এর মধ্যে একের পর এক লোমহর্ষক গণপিটুনির ঘটনা সেই ট্রমাকে আরও দীর্ঘ রূপ দিচ্ছে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো কৌশলে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। যারা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করবে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কে কোন দলের বা কোন মতের সেটা দেখা হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ দেশে স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গণপিটুনি, হামলা, পাল্টা হামলা, খুন-যখমসহ জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী যেকোনো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেউ দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারসহ তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
দেশের বিভিন্ন স্থানে অব্যাহত গণপিটুনির ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) রেজাউল করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সম্প্রতি গণপিটুনির যেসব ঘটনা ঘটছে, সেসব ঘটনায় ‘পরিকল্পিত হত্যার’ অভিযোগ এনে মামলা হচ্ছে। মামলাসহ সামগ্রিক ঘটনাগুলো কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণে রাখছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ ছাড়া এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণেও ইউনিট প্রধানদের নানামুখী নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর বগুড়া সদরের গোকুল ইউনিয়ন পরিষদের সামনে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিজানকে কুপিয়ে হত্যার পর ঘাতক সন্দেহে লেদো নামে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। বলা যায়, প্রকাশ্যেই খুনের বদলে খুন। সোমবার রাত ৮টার দিকে দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে এসে মিজানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। তার ঘাতক সন্দেহে রাতেই গোকুল এলাকায় স্থানীয় লোকজন লেদো নামে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিলে তিনি মারা যান। পূর্বশত্রুতার জের ধরে মিজানকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার সদ্যোজাত সন্তান ও স্ত্রীর জন্য ওষুধ আনতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের সামনে হামলার শিকার হন তিনি। ঘটনার মাত্র চার দিন আগে কন্যাসন্তানের পিতা হন তিনি। দশ বছর আগে এক সন্ত্রাসী হামলায় এক পা হারিয়েছিলেন মাসুদ। সেই হামলার অভিযোগ ছিল রাবি ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় পূর্বশত্রুতার জের ধরে দুজনকে কুপিয়ে হত্যার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের গণপিটুনিতে আবু তালেব মিয়া নামে একজন নিহত হন। টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম তিনজন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এসব ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর হজরত মুহম্মদ (সা.)-কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের দপ্তরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই গণপিটুনির শিকার হন উৎসব মণ্ডল নামে এক তরুণ। পরে সেনাসদস্যরা তাকে উদ্ধার করে প্রাণ রক্ষা করে বলে জানানো হয়েছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর ইউটিউবার আশরাফুল হোসেন ওরফে হিরো আলমকে বগুড়ার আদালত প্রাঙ্গণে কিল-ঘুষি মারার পর কান ধরে ওঠবস করানো হয়। হামলাকারীদের অভিযোগ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে গালি দেওয়ায় তাকে মারধর করা হয়েছে।
গত ১৪ আগস্ট রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকায় গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা যান সাইফ আরাফাত শরীফ ও সাইদুল ইসলাম ইয়াসিনসহ ৩ জন। তারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছিলেন। এভাবে প্রায়ই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে লোকজন মারা যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, দেশে গত সাড়ে ৬ বছরে গণপিটুনিতে কমপক্ষে ২৮৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। অধিকাংশ ঘটনায় হত্যা মামলা হলেও শাস্তি হওয়ার সংখ্যা খুবই কম।
আসকের পরিসংখ্যান মতে, চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) গণপিটুনিতে নিহত হয় ৩২ জন। তার মধ্যে রাজধানীতেই এই সংখ্যা ছিল ১৬ জন। ২০২৩ সালে ঢাকায় ২৫ জনসহ সারা দেশে ৫১ জন, ২০২২ সালে ৩৬ জন, ২০২১ সালে ২৮ জন, ২০২০ সালে ৩৫ জন, ২০১৯ সালে ৬৫ জন ও ২০১৮ সালে ৩৯ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়।
গণপিটুনি ও সামাজিক অপরাধ সম্পর্কে ‘জোরপূর্বক গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানের নিমিত্তে’ গঠিত তদন্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা রয়েছে। যেহেতু সবে একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটেছে, এখনও রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরোপুরি পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি। এ রকম একটা সময়ে দুষ্কৃতকারীরা সুযোগ নেওয়ার অপচেষ্টা করছে। তবে সরকারের উচিত শক্ত হাতে এসব বিষয় দমন ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘৫ আগস্ট পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে দেশে বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে এটা সঠিক। এই সময়ে অনেক সুযোগসন্ধানী মহল বিভিন্ন সুযোগ নেওয়ার অপচেষ্টা করছে। যেহেতু আমাদের পুলিশ বাহিনী যথাযথভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না, তাই অনেকেই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। পুলিশের উচিত এলাকাভিত্তিক অনুসন্ধান করে গণপিটুনিসহ সামাজিক অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। পুলিশ বাহিনী সঠিকভাবে তাদের কাজটা করলে গণপিটুনিতে প্রাণহানিসহ এ ধরনের সামাজিক অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পাশাপাশি সর্বস্তরের নাগরিকদেরও এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে হবে। কোনো ধরনের গুজব বা উস্কানিতে কানা দিয়ে সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।