× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

পদের প্রভাবে ক্ষমতাধর পিয়ন জাহাঙ্গীর

আলাউদ্দিন আরিফ

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৪ ১৩:৫০ পিএম

প্রধানমন্ত্রীর বহিষ্কৃত ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম। ছবি : সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রীর বহিষ্কৃত ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম। ছবি : সংগৃহীত

ওসি : স্লামালিকুম স্যার। 

জাহাঙ্গীর : ওসি সাব, তোমারে কিন্তু ভূতে পায়, আমি বলি দিছি। কুত্তার বাচ্চা, ... পুত, তোমারে ভূতে পায়। আমার লোক ঢাকায়, তুমি মামলা নিলা কেন? শুয়োরের বাচ্চা… 

ওসি : কে নিছে? কোন মামলা নিছে স্যার?

জাহাঙ্গীর : তুমি ১৫ দিনের মধ্যে ৬টা মামলা নিছো, আমি জামিন করাইতে আমার … হাডি যায়। তুমি আবার রবিবার মামলা নিছ।’ 

এই ফোনালাপ প্রধানমন্ত্রীর বহিষ্কৃত ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম ও নোয়াখালীর চাটখিল থানার ওসি আব্দুস সামাদের। এভাবেই জাহাঙ্গীর আলম অশ্রাব্য ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন পুলিশ কর্মকর্তাদেরও। প্রধানমন্ত্রীর সেই আলোচিত ব্যক্তিগত সহকারী বা ‘পিয়ন’ জাহাঙ্গীর ওরফে পানি জাহাঙ্গীর তার পদের দাপট দেখিয়ে এভাবেই থানার ওসি থেকে শুরু করে পুলিশ সুপার (এসপি) ও জেলা প্রশাসকদের পর্যন্ত ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা তদবির করে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করতেন। তার এরকম বেশ কিছু ফোনের অডিও রেকর্ড প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে সংরক্ষিত আছে। 

‘তুমি দলের লোকের বিরুদ্ধে মামলা নিতাছো শুয়োরের বাচ্চা’

একজন মাদক কারবারির বিরুদ্ধে মামলার প্রসঙ্গ নিয়ে জাহাঙ্গীর এবং ওসি আব্দুস সামাদের মধ্যে টেলিফোন রেকর্ডের বাকি অংশটুকু এমন-

‘ওসি : না স্যার। রবিবার কোনো মামলা নেইনি। 

জাহাঙ্গীর : সে ঢাকাতে, তুমি ১৫ দিনে ৬টা মামলা নিলা কেন? 

ওসি : এগুলো আগের মামলা। সে ঢাকাতে থাকা অবস্থায় কোনো মামলা নেইনি। এগুলো আগের মামলা।

জাহাঙ্গীর : কিসের আগের মামলা? তুমি একটার পর একটা মামলা নিতেছ? আমি তাকে নিয়া ঈদের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যামু। তারপর তোর বারোটা বাজায়ালামু, কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা...

ওসি : স্যার, আপনি ল্যাংগুয়েজ সুন্দর করে বলেন। স্যার, আপনি শিক্ষিত মানুষ। 

জাহাঙ্গীর : কুত্তার বাচ্চা কিসের ল্যাংগুয়েজ। তুই বাড়াবাড়ি করোস।

ওসি : স্যার, আমি কোনো বাড়াবাড়ি করি না। আপনি ল্যাংগুয়েজ সুন্দর করে বলেন, আপনার এখানে (চাটখিল থানায়) চাকরি না করলেও আমি ভাত খেতে পারব বুঝছেন। 

জাহাঙ্গীর : তুমি অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করতেছ, তুমি দলের লোকের বিরুদ্ধে মামলা নিতাছ শুয়োরের বাচ্চা। 

ওসি : এই ল্যাংগুয়েজ আপনি ব্যবহার করতে পারেন না। আমি আপনাকে এটাই বললাম স্যার। আমি এখানে চাকরি করব না (উত্তেজিত কণ্ঠ) আপনি আমাকে কুত্তার বাচ্চা বলছেন। 

জাহাঙ্গীর : (উত্তেজিত হয়ে) তুই বেটা বিএনপির সন্ত্রাসী লোক…

ওসি : আপনি আমাকে কুত্তার বাচ্চা বলছেন, আমি এখানে চাকরি করব না, আমি দেখে নিব আপনাকে।

জাহাঙ্গীর : তুই বেটা বিএনপির লোকÑ

ওসি : আমি দুইবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনছি এখানে, আমি দুইবার নির্বাচন করে দিছি। 

জাহাঙ্গীর : আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনছস? 

ওসি : হ্যাঁ আমি দুইবার দুইবার এখানে নির্বাচন করছি। 

জাহাঙ্গীর : দলের লোকের বিরুদ্ধে মামলা নেস, ইয়াবা পানি খাস...

ওসি : আমি কোনো ইয়াবা ব্যবসায়ীকে প্রশ্রয় দেই না। ইয়াবার সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা আছে এমন কোনো কথা কেউ বলতে পারবে না। 

জাহাঙ্গীর : তুই বেটা ইয়াবা বাণিজ্য করোস। 

ওসি : আমার কাছে রেকর্ড আছে আমি কোনো ইয়াবা পার্টিরে ছাড়ি না। 

জাহাঙ্গীর : ডিআই-১ আমাকে নিজে জানাইছে তুমি একটা মেয়েকে নির্যাতন করছো। সদরের, আমাকে ডিআই-১ নিজে বলছে। সেই মেয়েকে রেফ করছো। আমাকে ডিআই-১ নিজে বলছে। 

ওসি : ও বললে হবে না, আমার এসপি আছে। তদন্ত হবে, এসব মিথ্যা কথা। 

জাহাঙ্গীর : ডিআই আমাকে নিজে বলছে, আমরা পারতেছি না, আপনারা ব্যবস্থা নেন। সে একটা মেয়েকে নির্যাতন করছে। 

ওসি : ওটা তাদের ব্যাপার, এখানে পুলিশের কোনো ব্যাপার নাই। 

জাহাঙ্গীর : ডিআইজি আমাদের ফ্যামিলির লোক। সেও আমাকে বলছে। 

ওসি : ১০ জন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান আমার পক্ষে কথা বলেছে। 

জাহাঙ্গীর : তোমার পক্ষে বলছে ১০ জন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান? তারা আমার পক্ষেও বলেছে। তুমি বিএনপির পক্ষে। তুমি মেয়র মানিকের কাছ থেকে টাকা নিয়া মেয়র মানিকের পক্ষে সমস্ত রিপোর্ট দিছো। 

ওসি : আমার ওপর অপবাদ দিচ্ছেন। কে মেয়র মানিকের কাছ থেকে টাকা নিছে? প্রমাণ দেন…’

‘আমার তো লাটসাব দেখা দরকার’

ফোনে জাহাঙ্গীর আলমের কথোপকথনের আরেকটি রেকর্ডও আমাদের কাছে আছে। তাতে তাকে একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানের নাম ভাঙিয়ে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হুমকি দিতে দেখা যায়। 

এতে পিয়ন জাহাঙ্গীরকে ওই কর্মকর্তার উদ্দেশে বলতে শোনা যায় : ‘আমার সঙ্গে ফাইজলামি শুরু করছো। আমি ডিজিএফআইর আকবর ভাইরে দিয়া সোজা ধরে নিয়ে আসব। আমি একবার সোজা নিয়া ডিজিএফআইর আকবর ভাইয়ের কাছে ডুকাই দিমু। ইয়ার পরে আপনাগো যতো বাপ আছে না, কোনো বাপ আপনাগরে ছাড়াইতে পারবে না। আপনার ভাই কত বড় লাটসাবের বাইচ্চা হই গেছে সে আমার ফোন কাটি দিতে আছে। আমার তো লাটসাবকে দেখা দরকার। কথার জবাব দিচ্ছেন না কেন?’

এর উত্তরে অপর পক্ষকে শুধু বলতে শোনা যায়, ‘এসব কথা কেন হইতেছে আমি তো জানি না।’ ... ইত্যাদি ইত্যাদি। 

একনজরে জাহাঙ্গীর আলম

চীন সফর নিয়ে ১৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪০০ কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া তার পিয়নের তথ্য তুলে ধরেন। সরকারপ্রধানের এমন বক্তব্যের পর অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট। স্থগিত করা হয়েছে জাহাঙ্গীর আলম ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক লেনদেন। বহুল আলোচিত পিয়ন জাহাঙ্গীর আলম চাটখিলসহ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিল থানার খিলপাড়া ইউনিয়নে নাহারখিল গ্রামে।

জাহাঙ্গীর আলম প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে এলাকায় চাকরি-বাণিজ্য, কমিশন-বাণিজ্য, প্রাইভেট স্কুল দখল, জমি দখল, ইটভাটা দখল, টেন্ডারসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত করেন। বিপুল সম্পদের মালিকও হন। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম ব্যবহার করে হুমকি ও অনিয়মের মাধ্যমে বেশ কয়েকজনকে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত করান। জাহাঙ্গীর তার ভাগনে শিপনের মাধ্যমে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি ওসি, এসপি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী যে কারও সঙ্গেই রূঢ় আচরণ করতেন। তার কথা না শুনলে অশ্রাব্য অশ্লীল গালিগালাজ করতেন। এভাবে নিজের কাজ বাগিয়ে নিতেন জাহাঙ্গীর। 

জাহাঙ্গীর আলমের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানায়, জাহাঙ্গীর তার অর্জিত সম্পদের সামান্য অংশই দেশে বিনিয়োগ করেছেন। অধিকাংশ অর্থ পাচার করেছেন দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। দুবাইয়ের গোল্ড মার্কেটে জাহাঙ্গীরের বিনিয়োগ শতকোটি টাকার বেশি। দুবাই থেকে তিনি সোনার বার নিয়ে আসতেন। সেখান তার জুয়েলারি ব্যবসাও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এপিএস ও বিভিন্ন গোয়েন্দা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রধানের নাম ভাঙিয়ে তিনি বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ বের করে আনতেন। কেউ তার লাগেজ বা ব্যাগে হাত দেওয়ারও সাহস পেত না।

পাড়ি জমিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে

জাহাঙ্গীর আলমের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অনুসন্ধানে কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। প্রধানমন্ত্রী তার বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পরপরই তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার বড় ভাই খিলপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মীর হোসেন। জাহাঙ্গীরের সর্বশেষ স্ত্রী আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।

উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীর মোট তিনটি বিয়ে করেছেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে ঢাকার ডেমরায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন। ওই সংসারে তার এক ছেলে রয়েছে। এরপর আরও একটি বিয়ে করেন তিনিÑ যেটি ঘটে নাটকীয়ভাবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে নিয়োগ পাওয়ার সুপারিশ আনতে বাবার সঙ্গে এই নারী গিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরের কাছে। পানি জাহাঙ্গীর তাকে দেখে মুগ্ধ হন এবং চাকরি দেওয়ার ফাঁদ পেতে একপর্যায়ে বিয়ে করে বসেন। পরে সুবিধাজনক সময়ে ওই স্ত্রীকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সেই স্ত্রীর কাছে আছেন।

ক্ষমতা-প্রতিপত্তি ও সম্পদ 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, একপর্যায়ে জাহাঙ্গীর আলম সংসদ সদস্য-মন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে থাকেন। বাগিয়ে নেন নিজের এলাকা নোয়াখালীতে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদ। স্ত্রী-শাশুড়িসহ নিজের নামে-বেনামে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। ঢাকার মিরপুরে রয়েছে তার বহুতল ভবন, ধানমন্ডিতে আলিশান ফ্ল্যাট। চট্টগ্রাম কর্ণফুলী টানেলের পাশে ১০০ বিঘা জমি, নোয়াখালীর চাটখিল ও মাইজদীতে রয়েছে বহুতল ভবন ও বিঘার পর বিঘা জমি। ব্যাংক ডিপোজিট তার কয়েকশ কোটি টাকা। তিনি যখন এলাকায় যেতেন, তখন তার গাড়ির সামনে-পেছনে থাকত পুলিশের বিশেষ স্কর্ট। সেখানে তার নির্দেশেই চলত পুলিশ ও প্রশাসন। থানার ওসি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের সব রদবদল হতো তার ইশারায়। স্থানীয় এমপি থাকলেও সেখানে পানি জাহাঙ্গীরের কথাই ছিল শেষ কথা।

স্থানীয়রা জানায়, পানি জাহাঙ্গীরের বাবা ইউনিয়ন পরিষদে কেরানির চাকরি করতেন। সংসারে ছিল টানাপড়েন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাহাঙ্গীরের উত্থান অনেকের কাছে আলাদিনের চেরাগের মতো। চাটখিলে পৈতৃক ভিটায় করেছেন চারতলা বাড়ি। সামনে বিশাল গেট। বাড়ির পাশে রয়েছে ৭০০ শতক জমি। উপজেলার খিলপাড়া পূর্ববাজারে রয়েছে প্রায় কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ। জেলা শহরের মাইজদীতে রয়েছে আটতলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল ভবন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা