রাজবাড়ী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৪ ১৬:২৭ পিএম
আরজিনা খাতুন। ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (মূসক মনিটরিং, পরিসংখ্যান ও সমন্বয়) দ্বিতীয় সচিব আরজিনা খাতুনের বিরুদ্ধে দুদকে দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। ছাগলকাণ্ডে আলোচনায় আসা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মতিউর রহমানের সঙ্গে ফোনালাপ ফাঁস হওয়ায় সমালোচনায় পড়েন আরজিনা।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের তালুকপাড়া গ্রামের বাড়িতে আরজিনার বাবা আহম্মদ আলী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, আমি লেখাপড়া জানি না। পেঁয়াজের ব্যবসা ও চাষাবাদ করে এক মেয়ে আরজিনা খাতুন ও দুই ছেলে মতিন ও মেহেরকে অনেক কষ্টে লেখাপড়া শিখিয়েছি। দুই ছেলে সেনাবাহিনীতে চাকরি করে। বাড়িতে একটি বিল্ডিং করি ২০১১ সালে আমার আয় দিয়ে। পরে ছেলে দুজন চাকরি পাওয়ার পর পাশাপাশি দ্বিতল ভবন করা হয়েছে। যা কিছু করেছি, সবই আমার ও ছেলেদের আয়ে। নারুয়া বাজারে প্রায় ১ শতাংশ জমি কিনে টিনের ঘর করে ভাড়া দিয়েছি। বালিয়াকান্দিতে ৬ শতাংশ জমি ও মাঠে সামান্য কয়েক পাখি জমি ক্রয় করেছি। এসবই দুই ছেলের সেনাবাহিনী থেকে মিশনে যাওয়ার টাকা ও আমার আয়ের টাকায়। আমি এখনও ব্যবসা করি। আমার ব্যবসা থেকে এখনও মাসে আয় ৬০ হাজার টাকা। এখনও আমার ঘরে ৩ লাখ টাকার পেঁয়াজ ও ২ লাখ টাকার রসুন রয়েছে। মতিউর রহমানের সঙ্গে আমার মেয়ের পেশা সূত্রে পরিচয় হয়। আমরা মতিউরের পরিবারের কাউকে চিনি না। এখন অনেক কিছুই শুনছি। তিনি আরও বলেন, দুদকে অভিযোগ দিয়েছে, তা যাচাই করে যদি মেয়ে অপরাধী হয়, তার বিচার হবে।
চাচা লোকমান হোসেন বলেন, আরজিনা খাতুনের ১৭ বছর আগে বিয়ে হয়। আমরা কোনোদিন তার স্বামীর বাসায় যেতে পারিনি। আরজিনাকে প্রতিদিনই নির্যাতন করত তার স্বামী। অনেক সময় মেরে অজ্ঞান করে রাখত, আমরা সেখানে গিয়ে চিকিৎসা করেয়েছি। নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে তাকে ডিভোর্স দিয়েছে আরজিনা। আরজিনার যে সম্পদের পাহাড়ের কথা বলা হয়েছে তা সঠিক নয়।
চাচাতো বোন তমা খাতুন বলেন, আমি তিন বছর আরজিনা আপুর বাসায় থেকেছি। তার কোনো নিজস্ব গাড়ি নেই। তার ছেলেমেয়েদের রিকশায় স্কুলে নিয়ে গিয়েছি। তিনি যে গাড়িটি ব্যবহার করেন তা সরকারি গাড়ি। আর যখন ফ্ল্যাট কেনেন তখন স্বামী-স্ত্রী মিলেই ঋণ নিয়ে কেনেন। তার ফ্ল্যাট ছাড়া কোনো সম্পদ নেই বলেও দাবি করেন।
আরজিনার ভাই সেনা সদস্য মেহের বলেন, আমরা যে সম্পদ করেছি, তা আমাদের দুই ভাইয়ের টাকায়। আমরা দুই ভাই সেনাবাহিনী থেকে মিশন করেছি। আমার বোন কোনো সহযোগিতা করেনি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (মূসক মনিটরিং, পরিসংখ্যান ও সমন্বয়) বিভাগের দ্বিতীয় সচিব আরজিনা খাতুন বলেন, আমি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমাকে টাকার জন্য স্বামী আমার শরীরে আগুন পর্যন্ত ধরিয়ে দিয়েছে। অসহ্য হয়ে তাকে ডিভোর্স দিয়েছি। আমি তার বিরুদ্ধে মামলা করেছি। এরপর থেকেই সে আমার বিরুদ্ধে দুদকে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করছে। আমার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছে। আমি সম্মান জানিয়ে বলতে চাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত হোক। আমি তার সঠিক জবাব দেব।
তিনি আরও বলেন, আমার যে ৫০০ ভরি স্বর্ণের কথা বলা হয়েছে, তা সঠিক না। কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। আমার ঢাকার ফ্ল্যাটটি ঋণ করে ক্রয় করেছি। এটাই আমার সম্পদ। আমার দুই ভাই চাকরি করে। আমার বেতনের টাকাটাও স্বামী হাতিয়ে নিয়েছে। এখন আমার ও পরিবারের ক্ষতি করছে।
এ বিষয়ে জানতে আরজিনা খাতুনের তালাকপ্রাপ্ত স্বামী আবু হেনা মো. রউফ উল আযমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
দুর্নীতি দমন কমিশনে আরজিনা খাতুনের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, আমদানি পণ্য খালাসের নামে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের থেকে হাতিয়ে নিতেন মোটা অঙ্কের টাকা। অনেক সময় পণ্য খালাসের কাজ না হলেও ফেরত দিতেন না ঘুষের টাকা। এভাবে দুর্নীতির টাকায় তিনি গড়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। একই সঙ্গে তিনি স্বর্ণ চোরাকারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশে হাতিয়েছেন প্রায় ৬ কোটি টাকার স্বর্ণ। ক্রয়মূল্য গোপন করে ঢাকার মিরপুরে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে দ্বিতীয় সচিব আরজিনা খাতুন। ফ্ল্যাটটি কিনেছেন ২ কোটি টাকায়। কিন্তু কেনার চুক্তিনামায় উল্লেখ করেছেন ১ কোটি ২১ লাখ টাকা। এ ছাড়া ফ্ল্যাট কেনার পর সেখানে ইনটেরিয়র ডিজাইনের পেছনে খরচ করেছেন ২৭ লাখ টাকা, ফ্ল্যাটের ইলেক্ট্রনিক্স ও ফার্নিচারের পেছনে ব্যয় করেছেন ৩৫ লাখ টাকা। তবে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও তা ফ্ল্যাট কেনার এক বছর পর।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, কাস্টমসের চাকরির আগে আরজিনা খাতুনের বাড়ি ছিল ২০ ফিটের একটি টিনের ঘর। ওই টিনের ঘরের একটি অংশ পার্টিশন দেওয়া ছিল। সম্প্রতি তার গ্রামের বাড়িতে ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন আলিশান বাড়ি। ফার্নিচার ও ইলেক্ট্রনিক্স খাতে ব্যয় করা হয়েছে আরও অন্তত ৩৫ লাখ টাকা। তিন কোটি টাকা ব্যয়ে তার আপন দুই ছোট ভাইয়ের নামে ৪০ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন আরজিনা। বর্তমানে সেখান থেকে ৩০ বিঘা জমি বন্ধক রাখা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় অভিযোগে।