প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৪ ১৩:১৪ পিএম
মতিউর রহমান ও এনামুল হক। ছবি কোলাজ : প্রবা
ছাগলকাণ্ডে আলোচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী-সন্তানদের সকল স্থাবর সম্পদ ক্রোকের (জব্দ) আদেশ দিয়েছেন আদালত। আদেশে যাদের স্থাবর সম্পদ ক্রোক করতে বলা হয়েছে, তারা হলেন- কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও এনবিআর সদস্য মতিউর রহমান, তার প্রথম স্ত্রী নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকি, দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিবলী, প্রথম স্ত্রীর ছেলে আহমেদ তৌফিকুর রহমান অর্ণব ও মেয়ে ফারহানা রহমান ঈপ্সিতা। তাদের নামে রয়েছে ১ হাজার ১৯ শতাংশ জমি, ৪টি ফ্ল্যাট ও প্লট।
একই দিন একই আদালত সিলেটের কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট মোহাম্মদ এনামুল হকেরও ৯ কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ১০৭ টাকার সম্পদ ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেনের আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আলাদা দুটি আদেশ দেন। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আখতারুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।
দুদক সূত্র জানায়, ক্রোক হওয়া সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে বরিশালের মুলাদী উপজেলায় মতিউরের নামে ১১৪ শতাংশ জমি, রায়পুরা উপজেলার মরজাল ইউনিয়নের মরজাল মৌজায় লায়লা কানিজের নামে ৫২২.৫২ শতাংশ জমি, আহমেদ তৌফিক অর্ণবের নামে ২৭৫.৮৭৫ শতাংশ ও ফারহানা রহমান ঈপ্সিতার নামে ১০৬.৫৬ শতাংশ জমি।
চারটি ফ্ল্যাটের মধ্যে লায়লা কানিজের নামে বসুন্ধরায় একটি ফ্ল্যাট, শাম্মী আখতার শিবলীর নামে জিগাতলায় একটি ও বসুন্ধরা আবাসিকে একটি এবং ঈপ্সিতার নামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ৫ কাঠা জমিতে বহুতল ভবন রয়েছে। ভবনের ঠিকানা লেখা হয়েছে প্লট-৫১৯, ব্লক-ডি, রোড-১। মতিউরের দ্বিতীয় স্ত্রী শিবলীর নামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এন-ব্লকের ৪৩১২ নম্বরে ৫ কাঠার একটি প্লট রয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান টিমের প্রধান মো. আনোয়ার হোসেন তার আবেদনে উল্লেখ করেন, নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মো. মতিউর রহমান দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ হুন্ডি ও আন্ডারইনভয়েসিং/ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার করে শত শত কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। অনুসন্ধানকালে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মো. মতিউর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা তাদের মালিকানাধীন স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন, যা করতে পারলে এই অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় মামলা রুজু, আদালতে চার্জশিট দাখিল, আদালত কর্তৃক বিচার শেষে সাজার অংশ হিসেবে অপরাধলব্ধ আয় হতে অর্জিত সম্পত্তি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্তকরণসহ সব উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। তাই এই অনুসন্ধান শেষে মামলা রুজু ও তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের পর আদালত কর্তৃক বিচার শেষে সরকারের অনুকূলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের সুবিধার্থে সুষ্ঠু অনুসন্ধান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা একান্ত প্রয়োজন। ক্রোক আদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় কোনো স্থাবর সম্পদ হস্তান্তর বা বিনিময় করা যাবে না। দুদকের আদেশের অনুলিপি দুদক সচিব, দুদকের পরিচালক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট, সংশ্লিষ্ট সাব রেজিস্ট্রারদের পাঠানো হয়েছে।
কাস্টমস এক্সসাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের সদ্যবিদায়ি প্রেসিডেন্ট ও সোনালী ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন মতিউর রহমান। তাকে দুটি পদ থেকেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত কোরবানি ঈদের আগে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাদিক অ্যাগ্রো থেকে মতিউরের দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলে মুশফিকুর রহমান ইফাতের ১৫ লাখ টাকায় একটি ছাগল কেনার বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরপর মতিউরের নানা অপকর্মের খবর বেরিয়ে আসতে শুরু করে। গণমাধ্যমে আসতে থাকে মতিউর পরিবারের শতকোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের কাহিনী।
তার বিরুদ্ধে উপপরিচালক আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের অনুন্ধান কমিটি গঠন করে দুদক। অনুসন্ধানে নেমে দুদক মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব ও বিও হিসাবসহ অস্থাবর সম্পদ আগেই জব্দ করা হয়েছে। এখন স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হলো। এছাড়া মতিউর এবং তার পরিবারের আরও কী কী সম্পদ আছে, সেগুলো জানার জন্য ৫৪টি দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক।
এনামুলের স্থাবর সম্পদ ক্রোক
এদিকে বৃহস্পতিবার সিলেটের কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট মোহাম্মদ এনামুল হকেরও ৯ কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ১০৭ টাকার সম্পদ ক্রোক করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিন ও পাবলিক প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজলের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই আদেশ দেন। তার বিরুদ্ধে প্রায় ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পদের মধ্যে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি-ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের ৯৫৪ নম্বরের ৩ কাঠা জমিসহ ৯ তলা ভবন, খিলক্ষেত থানার পাতিরা মৌজায় ৩৩ শতাংশ জমি, কাকরাইলে আইরিশ নূরজাহান বাণিজ্যিক ভবনে ১১৭০ বর্গফুট ও ১৮৩৫ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট, কাকরাইলে ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে ১৯০০ ও ৩৮০০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট, গাজীপুরের চান্দনায় ৫ কাঠা চালা জমি, মোহাম্মদপুরে সারা আফতাব টাওয়ারে ৪ হাজার বর্গফুট আয়তন করে দুটি বাণিজ্যিক স্পেস, সারা সন্ধানী লাইফ টাওয়ারে ১০ হাজার ৯৬৫ বর্গফুটের বাণিজ্যিক কাম আবাসিক স্পেস, বনানীর গ্লাডিয়া সাহিদা ভবনে ২৪২৮ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, বাড্ডার কাঠাল দিয়ায় ৪ কাঠা জমি রয়েছে। এসব স্থাবর সম্পদ ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তরের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া এনামুল হকের বিরুদ্ধে আগেই অনুসন্ধান ও পরে মামলা করে দুদক। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে তার সম্পদ জব্দ করা হলো।