প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ২৩:০৪ পিএম
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৪ ২৩:২৭ পিএম
সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনার।
সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যা মামলার আসামি মোস্তাফিজুর রহমান ও ফয়সাল আলী সাজিকে খাগড়াছড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। বুধবার (২৬ জুন) দুপুরে তাদের গ্রেপ্তারের পর হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয়েছে। আনার হত্যায় যে সাতজন সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ফয়সাল ও মুস্তাফিজ। এর মধ্যে ফয়সাল আনারকে চেতনানাশক (ক্লোরোফোম) দিয়ে অজ্ঞান করার দায়িত্ব পালন করেন, আর মুস্তাফিজ বিবস্ত্র করে বেঁধে রাখার কাজ করেন। এ দুই পেশাদার কিলার এমপি আনারকে হত্যার পর ৩০ হাজার টাকা নিয়ে দেশে ফেরেন। এরপর হিন্দু পরিচয়ে খাগড়াছড়ির পাতাল কালীমন্দিরে আত্মগোপন করেন।
অপর আসামি কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুর তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধারের জন্য ঝিনাইদহের একাধিক পুকুরে ডুবুরি নামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়েছে। কিন্তু কোনো মোবাইল উদ্ধার করতে না পেরেই প্রথম দিনের অভিযান শেষ হয়।
এমপি আনারকে অপহরণ ও হত্যা মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সন্দেহভাজন আসামিদের মধ্যে মোস্তাফিজুর ও ফয়সাল আনার খুন হওয়ার আগে গত ২ মে কলকাতায় যান। তারা দেশে ফিরে আসেন ১৯ মে। এই দুজনের বাড়ি খুলনার ফুলতলায়। খুনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী হিসেবে চিহ্নিত শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহর বাড়িও একই এলাকায়।
ডিএমপির (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের এডিসি জুনায়েদ আলম বলেন, এমপি আনার হত্যার ঘাতক দলের অন্যতম দুই পলাতক আসামি ফয়সাল ও মোস্তাফিজকে ধরতে খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে হেলিকপ্টার দিয়ে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ অভিযানের নেতৃত্ব দেন। এখন পর্যন্ত এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাতজন। তাদের মধ্যে প্রথমে গ্রেপ্তার হন, আমানুল্লাহ আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, তার ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়া ও সিলিস্তি রহমান। পরে গ্রেপ্তার হন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা গ্যাস বাবু, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু, মোস্তাফিজুর রহমান ও ফয়সাল আলী সাজি। এ ছাড়া কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন সিয়াম হোসেন ও জিহাদ হাওলাদার।
হিন্দু সেজে খাগড়াছড়ির মন্দিরে আশ্রয়
ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঘাতক দলের অন্যতম দুই পলাতক আসামি ফয়সাল ও মোস্তাফিজ নাম-পরিচয় গোপন করে খাগড়াছড়ির পাতাল কালীমন্দির এলাকায় হিন্দু সেজে লুকিয়ে ছিলেন। তারা পলাশ রায় ও শিমুল রায় নাম ধারণ করেছিলেন। হিন্দু সেজে তারা ২৩ দিন ওই কালীমন্দিরে ছিলেন। আনার হত্যার পর তারা ৩০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। সেই টাকা নিয়েই তারা কলকাতা থেকে বাংলাদেশে এসে দুর্গম পাহাড়ে আশ্রয় নেন। ওই এলাকা তাদের পরিচিত ছিল। কারণ তারা দুজনই ট্রাকচালক ছিলেন। ট্রাক চালানোর কারণে ওই এলাকার বিভিন্ন পথঘাট তাদের চেনা ছিল।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, গত মঙ্গলবার খবর পাওয়া যায়Ñ খাগড়াছড়ি দুর্গম পাহাড়ে লুকিয়ে রয়েছেন পলাতক আসামি ফয়সাল ও মোস্তাফিজ। খবর পেয়ে ডিবির একটি টিম আগেই পাহাড়ে গিয়ে অভিযান শুরু করে। পরে গতকাল তারা গিয়ে হেলিকপ্টার দিয়ে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেন।
হারুন অর রশীদ বলেন, অজ্ঞান করার জন্য এমপি আনারের নাকে ক্লোরোফোম দেন ফয়সাল। আর মোস্তাফিজ আনারকে বিবস্ত্র করে চেয়ারে বেঁধে রাখেন। কিলার শিমুল ভূঁইয়ার মূল দুই সহযোগী ছিলেন ফয়সাল ও মোস্তাফিজ।
ডিবিপ্রধান বলেন, খাগড়াছড়ির পাতাল কালীমন্দির এলাকায় হিন্দু সেজে পলাশ রায় ও শিমুল রায় নাম ধারণ করেন ফয়সাল ও মোস্তাফিজ। ছদ্মবেশে সেই কালীমন্দিরেই তারা ২৩ দিন ছিলেন। এমপি আনারকে হত্যার পর ১৯ মে ফয়সাল ও মোস্তাফিজ দেশে ফেরেন। এরপর ১৯ মে রাতে আক্তারুজ্জামান শাহীনের সঙ্গে কথা বলেন ফয়সাল ও মোস্তাফিজ। শাহীন তাদের ৩০ হাজার টাকা দেন। এরপর তারা দুর্গম পাহাড়ের ওই কালীমন্দিরে চলে যান। গ্রেপ্তার দুজনকে রিমান্ডে নিয়ে আরও তথ্য-উপাত্ত বের করা হবে।
হারুন বলেন, কলকাতার যে ফ্ল্যাটে এমপি আনারকে হত্যা করা হয়, সেই কিলিং মিশনে ছিলেন সাতজন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত শিমুল ভূঁইয়ার পরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তি হলেন ফয়সাল ও মোস্তাফিজ। হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী আক্তারুজ্জামান শাহীনকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা আমাদের এখন মূল কাজ। এ ছাড়া এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও যারা জড়িত, তাদের প্রত্যেককে আমার আইনের আওতায় আনব। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল মিলিয়ে মোট ৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
ঝিনাইদহে পুকুরে অভিযান
আনার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি গ্যাস বাবুকে নিয়ে গতকাল মোবাইলসহ আলামত উদ্ধারে ঝিনাইদহে প্রথম দিনের অভিযান শেষ করেছে ডিবি। ঝিনাইদহ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারুক আযমের নেতৃত্বে জেলেদের পুকুরে নামিয়ে অভিযান চালানো হয়। অভিযান চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঝিনাইদহ শহর কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঘিরে রাখে। ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদসহ তদন্তকারী কর্মকর্তারা ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে ঝিনাইদহ গিয়ে এই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। তবে সেখান থেকে গ্যাস বাবুর ফেলে দেওয়া তিনটি মোবাইলের একটিও উদ্ধার হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বুধবার সকালে ঝিনাইদহ জেলা কারাগার থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বরে আনা হয় জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুকে। শহরের পায়রা চত্বরের উত্তর পাশের একটি পুকুরে জেলেদের নামিয়ে মোবাইল উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে প্রাথমিক অভিযান শেষে করে শহরের স্টেডিয়াম এলাকাল অপর একটি পুকুরে অভিযান চালান তারা।
অভিযানের সময় আনার হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) ডিএমপির (ডিবি) সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান, ঝিনাইদহের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারুক আযম, পুলিশ সুপার আজিম উল আহসানসহ পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগ নেতা সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। এরপর সেখানেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তিনি। ১৮ মে পশ্চিমবঙ্গের বরানগর থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন তার বন্ধু বরানগরের বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস। ২০ মে কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে আনারকে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করার তথ্য জানায় ভারতীয় পুলিশ। এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়াদের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, ১৩ মে দুপুরেই আনারকে হত্যা করা হয়েছে।
(তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন ঝিনাইদহ ও কালীগঞ্জ প্রতিবেদক)