এমপি আনার হত্যা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৪ ০৯:১৬ এএম
আপডেট : ২৪ জুন ২০২৪ ১১:৪৩ এএম
সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। ছবি : সংগৃহীত
সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে খুন করতে অন্যতম পরিকল্পনকারী আক্তারুজ্জমান শাহিনকে গ্রেপ্তারে কী ধরনের জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা অস্পষ্ট। ইতোমধ্যে আনারকে হত্যার ঘটনায় ৪০ দিন পার হয়ে গেলেও এ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনকারী আক্তারুজ্জামান শাহিনকে গ্রেপ্তারে কোনো সমন্বয় হয়নি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবির মধ্যে। ডিবির পক্ষ থেকে আনারকে গ্রেপ্তারে ভারতের ইন্টারপোলের মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতে একাধিকবার অনুরোধ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমপি আনার হত্যার মূল কারণ, হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে প্রভাবশালী কোনো বিশেষ চক্রের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানতে হলে শাহিনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। সেই সঙ্গে দুই দেশের পুলিশের মধ্যে মামলার তদন্ত এবং আসামিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সঠিকতা যাচাই, মূল পরিকল্পনকারী শাহিনকে গ্রেপ্তারে সমন্বয় থাকতে হবে। না হলে এ মামলার অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা থেকে যাবে। তারা মনে করছেন আনার হত্যায় সীমান্ত এলাকার স্বর্ণ চোরাচালান রুটের নিয়ন্ত্রণ, হুন্ডির অর্থ পাচারসহ একাধিক কারণ রয়েছে। আর এ হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে স্বর্ণ ও হুন্ডির অর্থ পাচারকারী চক্রের সিন্ডিকেট সক্রিয়ভাবে জড়িত। তবে শাহিনকে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ শাহিন গ্রেপ্তার হলে এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা অনেক প্রভাবশালীর নাম বেরিয়ে আসতে পারে।
ডিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং ঢাকায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। দুই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭ জন। এর মধ্যে ভারতে ২ জন এবং বাকি ৫ জন বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে মূল পরিকল্পনাকারীসহ কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেওয়া ২ কিলারসহ ৩ জন এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। মোস্তফা ও ফয়সাল নামের দুজন আনার হত্যায় সরাসরি অংশ নিয়েছিল। ওই দুজনের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পায়নি ঢাকার ডিবি পুলিশ। পশ্চিমবঙ্গের সিআইডি ওই কিলারকে গ্রেপ্তারে কী উদ্যোগ নিয়েছে সে বিষয়ে ঢাকার তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করছে না তারা (পশ্চিমবঙ্গ সিআিইডি)।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তদন্ত দুই দেশে হলেও দুই দেশের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের পর্যায়ে সমন্বয় থাকা জরুরি। একই মামলার আসামি দুই দেশে গ্রেপ্তার হয়েছে। দুই দেশের পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও দিয়েছে। এখন মূল পরিকল্পনকারী শাহিনকে গ্রেপ্তার করতে দুই দেশের পুলিশের সমন্বয় ও পারস্পরিক যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান করা প্রয়োজন। কেউ যদি তাদের তদন্তে পাওয়া তথ্য শেয়ার না করেন তাহলে বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্য উপস্থাপন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আখতারুজ্জামান শাহিনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কি না জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান বলেন, মামলার তদন্ত কাজ অনেকটা কনক্লুসিভ পর্যায়, আমরা অনেককে গ্রেপ্তার করেছি। কিছু কিছু নাম আমরা পেয়েছি তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। এ ঘটনার মাস্টারমাইন্ড শাহিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের একটা বন্দি বিনিময় চুক্তি আছে সেহেতু আমরা ভারতীয় পুলিশকে বলেছি যেন তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে আমরা টিম নিয়ে গিয়ে কথা বলেছি। এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরের এমসিবি শাখার মাধ্যমে আমরা ইন্টারপোলকে চিঠি দিয়েছি। শাহিনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা সকলেই কাজ করছি। আরও এক-দুজন আসামি বাকি রয়েছে তাদেরকে গ্রেপ্তারের জন্য চেষ্টা করছি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি করা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একটি ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ। ভারতে বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দুই দেশেই পৃথক মামলা ও আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। আমরা সাধারণত দেখি এ ধরনের মামলার তদন্তে দুই দেশের কেউই কারও সঙ্গে তথ্য শেয়ার করতে চায় না। কারণ ক্লু উদঘাটনে কে এগিয়ে থাকবে তার একটি প্রতিযোগিতা থাকে। তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সম্পর্ক তাতে আমরা এ মামলার ক্লু উদঘাটনে এবং নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ডদের গ্রেপ্তার এবং জড়িতদের নাম-পরিচয় প্রকাশে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি। দুই দেশের পুলিশের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা না থাকলে এ মামলার রহস্যভেদ করা এবং মাস্টারমাইন্ডদের শনাক্ত করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।
ডিবির ওয়ারী বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, আনারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে শরীর টুকরো করা থেকে শুরু করে মরদেহ গুম করার সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের প্রায় সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিলিং মিশনের নেতৃত্বে থাকা শিমুল ভূঁইয়া, তানভীর ভূঁইয়া এবং কথিত মডেল সিলাস্তি রহমানকে ঢাকার ডিএমপি গ্রেপ্তার করেছে।
অসুস্থতার কারণে ডিএনএ নমুনা দিতে ভারতে যেতে পারেননি ডরিন
সঞ্জীবা গার্ডেনসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানবদেহের উদ্ধার হওয়া মাংস ও হাড় এমপি আনারের কি না তা নিশ্চিত হতে এমপি আনারের ভাই ও মেয়ে ডরিনকে ডিএনএ নমুনা দিতে ভারতে যাওয়ার জন্য ভারতের বাংলাদেশে থাকা দূতাবাসের মাধ্যমে চিঠি দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি। তবে অসুস্থতার কারণে ডরিন পশ্চিমবঙ্গে যেতে পারেনি।
চাপমুক্ত থেকে তদন্ত হচ্ছে : ডিবি
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, এমপি আনার হত্যায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া নাম থেকেই দুই আওয়ামী লীগ নেতা ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি সাইদুল করিম মিন্টু ও ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল হোসেন বাবু ওরফে গ্যাস বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রয়োজনে মিন্টুকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ইতোমধ্যে আমরা আদালতে পুনরায় আবেদন করেছি মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ করার বিষয়ে।
গত ১২ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যান ঝিনাইদহ ৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। পরদিন কলকাতার নিউটাউনের সঞ্জীবা গার্ডেন নামে একটি বাড়িতে তাকে খুন করা হয়। এ খবর বের হয় ১৮ মে। তখন ঢাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ভারতেও দুজন গ্রেপ্তার হয়। ইতোমধ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুই দেশে ৫ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।