অনির্ধারিত ‘বৈঠক’
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৪ ১১:৪৬ এএম
আপডেট : ০৫ জুন ২০২৪ ১১:৫২ এএম
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের অন্যতম হোতা শাহ আলমের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের ‘বৈঠকের’ ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র ‘বৈঠকের’ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, বহুল আলোচিত অর্থপাচারকারী পিকে হালদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেছেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের সঙ্গে। অনির্ধারিত এ ‘বৈঠক’ নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় আলোচনার ডালপালা ছড়াতে শুরু করেছে। নতুন কোনো তদবির কিংবা নিজের নাম আড়াল করার চেষ্টার অংশ হিসেবে এ বৈঠক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। গত সোমবার দুপুরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ভবনের চতুর্থ তলায় (লিফট-৩) অবস্থিত ডেপুটি গভর্নর-৩ খুরশীদ আলমের কক্ষে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, খুরশীদ আলম ও শাহ আলম একই ব্যাচের কর্মকর্তা। আগে থেকেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে শাহ আলম কোনোভাবে খুরশীদ আলমের মাধ্যমে কোনো সুবিধা নেওয়ার ফন্দি করছেন কি না- এমন একটা আলাপ হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে এই বৈঠকের কারণে। তাকে যদি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হতো তাহলে বৈঠকটি নির্ধারিত থাকত। সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালক অবহিত থাকতেন।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, তারাও এ বৈঠকের বিষয়ে জানতেন না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আর কখনও বাংলাদেশ ব্যাংকে আসেননি শাহ আলম। ফলে তার আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসার খবর স্বাভাবিকভাবেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বলেন, ‘এ ধরনের চিহ্নিত অপরাধীরা যখন শাস্তি পায় না এবং ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে; তখন আস্থার সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করে। বিষয়টি সত্যিই হতাশাজনক।’
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক (ইডি) শাহ আলমকে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত কারণ উদঘাটন (ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং) কমিটির প্রতিবেদনে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা অনিয়মে শাহ আলমের সম্পৃক্ততা পেয়েছে। দুদকের জেরার মুখেও পড়েছেন তিনি। এ কারণে অবসরের পর আর তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকে দেখা যায়নি। কিন্তু হঠাৎ গত সোমবার তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উপস্থিত হয়েই নতুন বিতর্কের জন্ম দেন।
জানতে চাইলে সাবেক এ নির্বাহী পরিচালক (শাহ আলম) বলেন, ‘আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ডাকা হয়নি। আমি ব্যক্তিগত কাজে গিয়েছিলাম।’
সাক্ষাতের কথা স্বীকার করে ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সে অর্থে কোনো বৈঠক হয়নি। শাহ আলম আমাদের ব্যাচের কর্মকর্তা, সাবেক সহকর্মী হিসেবে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।’
এর আগে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, পিকে হালদার ও তার সহযোগীরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে ধরনের লুটপাট চালিয়েছে; ওই সময় তাদের সহযোগিতা করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, নিয়ম-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩-এর বিভিন্ন ধারায় স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইচ্ছামতো স্বাধীনতা ও একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ছয়টি সার্কুলার জারি করে, যা ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ১৮ ধারার পরিপন্থি ও এখতিয়ারবহির্ভূত। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বেআইনি ও নজিরবিহীন উদারতাই পিপলস লিজিংসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়ন্ত্রণহীন অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নেপথ্য কারণ বলে মনে করে তদন্ত কমিটি। এমনকি পিকে হালদারের হাতে প্রতিষ্ঠানগুলো তুলে দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করতে একাধিক সার্কুলার জারি করেন শাহ আলম। ওইসব সার্কুলার ব্যবহার করেই ব্যাংক আমানত থেকেও বেশি সুদের লোভ দেখিয়ে আমানত সংগ্রহ করে মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে এবং লুটপাট করেছে পিকে হালদার।
তদন্ত প্রতিবেদনে ওই সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের তত্কালীন মহাব্যবস্থাপক ও নির্বাহী পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়েছে। দায়ীদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় শাহ আলমের নাম আসায় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, পিকে হালদারের অন্যতম সহযোগী ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাশেদুল হক আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, পিকে হালদারের ক্ষমতার উৎস ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্কালীন ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী। তিনিই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতি আড়ালে রাখার ব্যবস্থা করতেন। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের তত্কালীন মহাব্যবস্থাপক শাহ আলমকে প্রতি মাসে ঘুষ দিতে হতো ২ লাখ টাকা করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম চাপা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কর্মকর্তাদেরও নিয়মিত ৫-৭ লাখ টাকা করে দিত রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নীতি প্রণয়ন ও দেখভালের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ। ২০১৩ সাল থেকে ওই বিভাগটির মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন শাহ আলম। এরপর ২০১৭ সালে নির্বাহী পরিচালক পদে পদোন্নতি পাওয়ার পরও তিনি বিভাগটির তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। আদালতে দেওয়া রাশেদুল হকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তখনকার গভর্নর ফজলে কবির আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের দায়িত্ব থেকে শাহ আলমকে প্রত্যাহার করে নেন।