× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অতি বিরল ছোট সাতভায়লা

ড. আ ন ম আমিনুর রহমান

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৪ ০৯:১১ এএম

আপডেট : ২০ মে ২০২৪ ১৩:২৮ পিএম

চুয়াডাঙ্গার বেলগাছি গ্রামে অতি বিরল ছোট সাতভায়লা পাখি। ছবি : লেখক

চুয়াডাঙ্গার বেলগাছি গ্রামে অতি বিরল ছোট সাতভায়লা পাখি। ছবি : লেখক

১৩ জানুয়ারি ২০১৮ সালের ঘটনা। কুষ্টিয়ার পাখিপ্রেমী ব্যাংকার আবু তাহের তৎকালীন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও পক্ষী আলোকচিত্রী শবমেহেরকে সঙ্গে নিয়ে পাখি দেখার উদ্দেশ্যে গড়াই নদের পাড়ে গেল। কিন্তু বিধি বাম! পুরো এলাকা যেন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে আছে। দশ হাত দূরের কিছুও দেখা যাচ্ছে না। নদীর পাড়ে অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে ওঠা ঝোপঝাড় ও শিশু গাছের বাগানে লালগলা চুটকি (Red-throated or Taiga Flycatcher) ও সবুজ সুইচোরা (Green Bee-eater) ছাড়া তেমন কোনো পাখি চোখে পড়ল না। এমন সময় হঠাৎই কোত্থেকে ৫ থেকে ৬টি বাদামি রঙের পাখি এসে মাঠে রাখা শুকনো ধইঞ্চা গাছের গাদার ওপর বসল। প্রথম দর্শনে পাখিগুলোকে পরিচিত মনে হলেও একটু পর কেমন যেন অপরিচিত মনে হলো। পটাপট কয়েকটা ক্লিক করে তাহের ও শবমেহের বাড়ি ফিরে এলো। 

ঘটনার দিন রাতে মেসেঞ্জারে পাখির ছবিসহ আবু তাহেরের মেসেজ পেলাম। তাকে পাখিটির পরিচয় দেওয়ার পর ফেসবুকে ওর পোস্টিংয়ে পাখি পর্যবেক্ষণকারীদের মন্তব্য দেখলাম। বাংলাদেশের পাখির তালিকায় নতুন একটি পাখি সংযুক্ত করার জন্য ওদের শুভেচ্ছা জানালাম। 

ঠিক বিশ দিন পর ভাগ্নে তানভির ইয়াসির সাদমানকে সঙ্গে নিয়ে কুষ্টিয়ায় আবু তাহেরের এলাকায় হাজির হলাম। আমার আসার কথা শুনে শবমেহেরও হাজির হলো। সকালের নাশতা সেরে চারজনের টিমে বারখানা ইউনিয়নের জুগিয়ার উদ্দেশে রওনা হলাম। কিন্তু পুরো এলাকা চষেও পাখিগুলোর সন্ধান পেলাম না, যদিও ওদের অন্য দুই জাত ভাই সাতভায়লা বা সাতভাই (Striated Babbler) ও ডোরা সাতভায়লার (Jungle Babbler) দেখা পেলাম। রোদের তেজ বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিয়ে শহরের কাছে হরিপুরের দিকে চলে গেলাম। 

ঠিক এক বছর পর চুয়াডাঙ্গার প্রকৃতি ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণবিদ স্কুলশিক্ষক বখতিয়ার হামিদের ফোনে মনটা খুশিতে ভরে উঠল। একুশে ফেব্রুয়ারি রাতের বাসে চেপে প্রথমে মেহেরপুর গেলাম। মেহেরপুর পৌর কলেজ ক্যাম্পাসে অতি বিরল এক পাখির ছবি তুলে চুয়াডাঙ্গার বেলগাছির উদ্দেশে রওনা হলাম। অবশ্য বখতিয়ার হামিদ আমাকে নেওয়ার জন্য চুয়াডাঙ্গা থেকে মেহেরপুর চলে এসেছিল। ওর এই বদান্যতার কথা আমি কখনোই ভুলব না। বখতিয়ারের বাসায় দুপুরের ভূরিভোজ শেষে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে পাশের বকচর বিলে খানিকক্ষণ ঘোরাফেরা করলাম। এরপর বিল পেরিয়ে খানিকটা এগিয়ে রেললাইনের কাছে চলে এলাম। 

রেললাইনের সমান্তরালে মেঠোপথ ধরে হাঁটতে লাগলাম। পথের দু’পাশে শুধু খেজুর গাছের সারি। না বলে পারছি না, বখতিয়ারের বদৌলতে এই খেজুর গাছের রসে বানানো গুড় খাওয়ার সৌভাগ্যও আমার হয়েছে। অত্যন্ত সুস্বাদু এই গুড়। এ ছাড়াও দু’পাশের মাঠজুড়ে ধান আর ভুট্টার ক্ষেত। সবুজ আর সবুজ। কিছুক্ষণ হাঁটার পরই অতি বিরল পাখিটির বিচরণ ক্ষেত্রে চলে এলাম। খেজুর গাছগুলোতে তীক্ষ্ন নজর রাখলাম। বিকাল বেলা ওখানেই নাকি ওদের বেশি দেখা যায়। 

যা হোক, বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। বিকাল ৪টা বেজে ৩৮ মিনিট ১৮ সেকেন্ডে পাখিটি নামল; তবে খেজুর গাছে নয়, রেললাইনের পাশের ঝোপঝাড়ের একটি গাছের ন্যাড়া ডালের ওপর। আর যায় কোথায়? ক্যামেরার শাটারে ক্লিকের বন্যা বয়ে গেল। ঠিক এক মিনিট দু’সেকেন্ড পর পাখিটি উড়ে গেল। এরপর চল্লিশ মিনিট ওর কোনো দেখা নেই। ঠিক ৫টা বেজে ২০ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে সেটি আবারও এলো এবং একই জায়গায় বসল। তবে এবার থাকল ৪ মিনিট ২২ সেকেন্ড। মনপ্রাণ উজাড় করে ওর ছবি তুললাম ও ভিডিও করলাম। এরপর বহুদিন পাখিটিকে দেশের কোথাও দেখিনি। সর্বশেষ রাজশাহীর পদ্মা নদীর দশ নম্বর চরে দেখলাম ২০২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর দুপুরে দুবার।

এতক্ষণ অতি বিরল যে পাখিটির গল্প বললাম সে হলো ছোট সাতভায়লা/সাতভাই/ছাতারে পাখি। ইংরেজি নাম Common Babbler। লিওট্রিচিডি (Leiotrichidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Argya caudata (আরজিয়া কড্যাটা)। আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, কুয়েতসহ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের আবাসিক এই পাখির উপস্থিতি এদেশে সব সময়ই সন্দেহজনক ছিল। মোটামুটি পুরো ভারতে এ পাখি দেখা গেলেও ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের কাছে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের পর এদের আর বিস্তৃতি নেই। 

পাখিটির আকার ছোট থেকে মাঝারি। দেহের দৈর্ঘ্য ২০ থেকে ২৬ সেন্টিমিটার। ওজন ৩০ থেকে ৪০ গ্রাম। একনজরে দেহের পালকের রঙ বাদামি। মাথা, ঘাড় ও পিঠে এই বাদামির ওপর রয়েছে গাঢ় বা খয়েরি ছোট ছোট ডোরা। কোমরেও তাই। ডোরাবিহীন ডানার রঙ বাদামি। গলা ফ্যাকাশে সাদা। বুক-পেটসহ দেহের নিচটা ফিকে বাদামি। বুকে অল্প কিছু ডোরা আছে। লম্বা জলপাই-বাদামি লেজে হালকা ঝিরিঝিরি দাগ। চোখের মণি কালচে। ঠোঁট কালচে-বাদামি, যার গোড়া হলদে। পা ও পায়ের পাতা ফ্যাকাশে হলদে। নখর বাদামি। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম।

যেসব দেশে দেখা যায় সেখানে ছোট সাতভায়লা আবাসিক পাখি। এরা পরিযায়ী হয় না। তাই এদেশেও এরা আবাসিক পাখি, পরিযায়ী নয়। সচরাচর শুকনো ঝোপঝাড়পূর্ণ এলাকা, ঘাসবন, পাথুরে এলাকা, গ্রামীণ পরিবেশ, ক্ষেতখামার, বাগান ইত্যাদিতে বিচরণ করে। অন্যান্য ছাতারের মতো এরাও সামাজিক পাখি, সাধারণত ৬ থেকে ১১টির দলে থাকে। কখনও কখনও বড় দলেও দেখা যায়। ওড়াওড়িতে তেমন পটু নয়। সারাক্ষণ ঝোপঝাড়ের নিচে লাফিয়ে লাফিয়ে কীটপতঙ্গ ও ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী ধরে খায়। দ্রুত কিন্তু কাঁপা স্বরে ‘হুইচ-হুইচ-হুইচি-রি-রি-রি-রি----’ শব্দে ডাকে। 

সারা বছর প্রজনন করতে সক্ষম হলেও মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরেই বেশি করে। যেহেতু দলবদ্ধভাবে থাকে, তাই ৬ থেকে ১১টির দলের মাত্র এক বা দুই জোড়া পাখি বংশবৃদ্ধিতে অংশ নেয়। বাকিরা ছানাদের খাওয়াতে ও শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। প্রজননকারী স্ত্রী-পুরুষ মিলে ভূমি থেকে ০.৫ থেকে ২.৫ মিটার উচ্চতায় কাঁটাঝোপের ওপর শুকনো ঘাস ও শেকড়-বাকড় দিয়ে কাপ আকারের বাসা বানায়। বাসার ভেতরটা বেশ গভীর হয়। ডিম পাড়ে ২ থেকে ৫টি, রঙ নীল। ডিম ফোটে ১৩ থেকে ১৬ দিনে। ছানারা উড়তে শিখে ১৩ থেকে ১৮ দিনে। এরা বছরে ২-৩ বার ডিম-ছানা তোলে। আয়ুষ্কাল ৮ থেকে ৯ বছর। 

লেখক : বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা