মেহেদী হাসান রনি, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৪ ১৬:০৪ পিএম
আপডেট : ১৭ মে ২০২৪ ১৬:০৬ পিএম
গত এক সপ্তাহের ভাঙনে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটের ছয় ও সাত নম্বর ফেরিঘাট এলাকার অন্তত তিনশ মিটার নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রবা ফটো
বর্ষা মৌসুমের আগেই ভাঙতে শুরু করেছে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট। গত এক সপ্তাহের ভাঙনে ছয় ও সাত নম্বর ফেরিঘাট এলাকার অন্তত তিনশ মিটার নদীতে বিলীন হয়েছে। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদী পাড়ের প্রায় দুইশ পরিবার। এদিকে চার বছর আগে ঘাট আধুনিকায়ন ও নদীভাঙন রোধে প্রকল্প পাস হলেও কাজ শুরু হয়নি এখনও।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বলছে, মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ অবমুক্তি না হওয়ায় আটকে আছে প্রকল্পের কাজ। তবে তাৎক্ষণিক ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. সালাহ উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নদীতে পানি বাড়তে শুরু করেছে। যে কারণে ছয় ও সাত নম্বর ঘাট এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের মাত্রা বাড়লে এই দুটি ফেরিঘাটও ভাঙন ঝুঁকিতে পড়বে। তারা বিআইডব্লিউটিএকে অনুরোধ করেছেন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে।
দৌলতদিয়ার ছয় নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় দেখা যায়, একটি বড় ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বোঝাই করে আনা বালু জিও ব্যাগে ভর্তি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ওইসব বস্তা শ্রমিকরা ভাঙনকবলিত এলাকায় ফেলছে। এ সময় সেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে জড়ো হয়েছে। তারা বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বর্ষা মৌসুমে ফেরিঘাটসহ স্থানীয় ছাত্তার মেম্বার পাড়ার দুই শতাধিক পরিবারের ঘর বিলীন হতে পারে। সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মাপাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি বড় মুদি দোকান, মাছের আড়ত ও একটি নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যালয়। নদীর পাড় থেকে মাত্র তিন-চার হাত দূরেই রয়েছে বারেক মৃধার মুদি দোকান ও পেছনে বসতবাড়ি। বারেক মৃধার চোখেমুখে একধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। কখন না জানি ভাঙন আরও বেড়ে যায়। ভাঙন বাড়লে দোকানসহ বসতভিটা বিলীন হয়ে যাবে।
বারেক মৃধা বলেন, কুশাহাটা ও বেথুরী থেকে দুই দফা ভাঙনের পর ২০ বছর ধরে ফেরিঘাট এলাকায় এসেছি। ছাত্তার মেম্বার পাড়ার ওহাব মোল্যার কাছ থেকে ৬ শতাংশ জমি বাৎসরিক ৩ হাজার টাকা লিজ (ইজারা) নিয়ে বসতি ও নদীর পাড়ে মুদি দোকান গড়েছি। ঘরে স্ত্রী, চার কন্যাসন্তান। পদ্মা সেতু চালুর আগে দোকানের আয় দিয়ে সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু সেতু চালুর পর ঘাট মরে গেছে। বেচাকেনা নেই, কোনোভাবে দিন পার করছি। দুই মেয়ে কলেজে পড়াশোনা করে। তাদের খরচ ঠিকমতো দিতে পারি না। এরপর এখন ভাঙনে সব বিলীন হলে আমাদের যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। স্থানীয় বাসিন্দা সরোয়ার মোল্যা বলেন, প্রায় ১০ দিন ধরে ঘাট এলাকা ভাঙছে। অথচ তাদের কান্না আর আকুতি কারও কাছে পৌঁছে না। যদি ভাঙন বন্ধ না হয়, তাহলে এ গ্রাম রক্ষা করা যাবে না। ছাত্তার মেম্বার পাড়ার ৬ ও ৭ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় দেড় শতাধিক পরিবারের সবাই ভাঙনের আতঙ্কে দিন পার করছেন।
বিআইডব্লিউটিএর দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালযের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গত এক সপ্তাহের ভাঙনে ছয় ও সাত নম্বর ফেরিঘাট এলাকার অন্তত তিনশ মিটার নদীতে বিলীন হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা শুরু করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে একজনকে সাব-ঠিকাদারি দিয়ে এসব বস্তা ফেলা হচ্ছে। পরে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে তা সমন্বয় করা হবে।
২০২০ সালে ঘাট আধুনিকায়ন ও নদীভাঙন রোধে পাটুরিয়া এবং দৌলতদিয়ায় আনুষঙ্গিক সুবিধাদিসহ নদীবন্দর আধুনিকায়ন শীর্ষক প্রকল্প পাস হয় একনেকে। ১ হাজার ৩৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু কাজ শুরু হয়নি চার বছরেও। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। পাটুরিয়া এবং দৌলতদিয়ায় আনুষঙ্গিক সুবিধাদিসহ নদীবন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ তারিকুল হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ অবমুক্তি না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। অর্থ বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু করা হবে। তবে কবে নাগাদ অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যেতে পারে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ তারিকুল হাসান।